০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

বন্ধুত্ব হতে পারে সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি

পুষ্টিকর খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি সুস্থ জীবনের জন্য চাই বন্ধুত্বপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Nov 2026, 07:10 PM

Updated : 02 Nov 2026, 07:10 PM

দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সাধারণত পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চার ওপর জোর দেওয়া হয়।

তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করছে যে, শুধু ভালো খাবার বা ব্যায়ামই শেষ কথা নয়; বরং সুস্থ দীর্ঘায়ু পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন মানুষের সামাজিক বন্ধন এবং বন্ধুত্বের গভীরতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনের একাকিত্ব এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা শুধু মানসিক কষ্টই ডেকে আনে না, এটি সরাসরি আয়ু কমিয়ে দেওয়ার পেছনে একটি বড় পরিমাপযোগ্য শারীরিক ঝুঁকি।

যুক্তরাজ্যের বায়োমেডিক্যাল তথ্যভাণ্ডার ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর অধীনে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি মানুষের স্বাস্থ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণমূলক সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়।

ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে, জীবনধারা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট রিয়েলসিম্পল-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, যারা তীব্র সামাজিক একাকিত্ব এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন, তাদের বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী রোগ যেমন— ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, ক্যানসার বা ‘ডিমেনশা’ ছাড়া সুস্থভাবে বেঁচে থাকার গড় আয়ু অন্যান্য স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক কম।

অর্থাৎ, একাকিত্ব মানুষকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বনাম একাকিত্ব

অনেকেই এই দুটি বিষয়কে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।

তবে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘সোমাটিক ট্রমা থেরাপিস্ট’ ক্লোই বিন এবং উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার ‘কাইজার পারমানেন্টে’ প্রতিষ্ঠানের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ড্রিউ মেগ্রেন এই দুয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছেন।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: এটি মূলত একটি বাহ্যিক বা সংখ্যাগত অবস্থা। একজন মানুষ বাস্তবে অন্য মানুষের সঙ্গে কত কম সময় কাটাচ্ছেন বা যোগাযোগ রাখছেন, তা দিয়ে এটি পরিমাপ করা হয়।

নতুন কোথাও চলে যাওয়া, ব্রেইকআপ বা দূরবর্তী কাজের কারণে মানুষ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

একাকিত্ব: এটি সম্পূর্ণ একটি অভ্যন্তরীণ এবং গুণগত মানসিক অনুভূতি। চারপাশ মানুষের ভিড়ে ঠাসা থাকার পরও একজন মানুষ মনে মনে তীব্র একাকিত্বে ভুগতে পারেন, যদি তার সম্পর্কের মধ্যে গভীরতা না থাকে বা তাকে মন থেকে বোঝার মতো কোনও মানুষ না থাকে।

একাকিত্ব যেভাবে শরীরকে ধ্বংস করে

যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ‘ফ্যামিলি থেরাপিস্ট’ এবং ‘টেক রুট থেরাপি’র প্রতিষ্ঠাতা সাবা হারুনি লুরি বলেন, “মানুষের জীবনে যখন গভীর সম্পর্কের অভাব হয়, তখন তার দৈনন্দিন মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হরমোন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এই অতিরিক্ত মানসিক চাপ রাতের ঘুম নষ্ট করে, ভালো অভ্যাসগুলো ধ্বংস করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।”

এছাড়া পাশে একজন ভালো বন্ধু বা প্রিয়জন থাকলে তারা ভালো-মন্দ খেয়াল রাখেন এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার তাগিদ দেন, যা একা মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে না।

একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা দূর করার কৌশল

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একাকিত্বের এই বিষাক্ত চক্র থেকে বের হয়ে সুস্থ দীর্ঘায়ু পাওয়ার জন্য ৪টি উপায় সম্পর্কে জানান।

বিশ্বস্ত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা: রাতারাতি একাকিত্ব দূর করা সম্ভব নয়।

থেরাপিস্ট সাবা লুরির মতে, “শুরুতে নিজের পরিচিত বা বিশ্বস্ত মাত্র একজনকে একটি বার্তা পাঠানো বা ফোন দিয়ে কথা বলা শুরু করা উচিত। এমনকি নিজে যে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন, এই সত্যটি জানালেও মনের ভেতরের বড় বোঝা নেমে যায় এবং অন্য মানুষকে ভেতরে আসার পথ তৈরি হয়।”

ধারাবাহিক সামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত হওয়া: ডা. ড্রিউ মেগ্রেন পরামর্শ দেন, “মাঝেমধ্যে কোনও বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার চেয়ে নিয়মিত কোনও ছোট গ্রুপ বা শখের কাজে যুক্ত হওয়া বেশি কার্যকর।”

যেমন— কোনও নিয়মিত ব্যায়ামের ক্লাস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বই পড়ার ক্লাব বা ধর্মীয় আলোচনা সভায় প্রতি সপ্তাহে অংশ নেওয়া।

একই মানুষকে অনবরত দেখার ফলে কোনও বাড়তি চাপ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই গভীর পরিচিতি ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

সাধারণ কুশলবিনিময়ের গণ্ডি পেরোনো: শুধু ‘কেমন আছেন ধরনের হাই-হ্যালো’ বা লোকদেখানো লোকজনের সঙ্গে ‘চ্যাট’ বা গল্প করলেই একাকিত্ব কমে না।

এমন কিছু বন্ধু থাকা দরকার যাদের সামনে নিজের দুর্বলতা বা আসল অনুভূতিগুলো অকপটে এবং সততার সঙ্গে প্রকাশ করা যায়।

যদি অতীতে আঘাত পাওয়া বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ের কারণে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা হয়, তবে পেশাদার মনোবিদের সাহায্য নেওয়া উচিত।

অপরিচিতদের মৃদু অভিবাদন জানানো: থেরাপিস্ট ক্লোই বিন একটি কৌশল অবলম্বন করার পরামর্শ দেন।

কোনও কফি শপের বারিস্টা, যানবাহন চালক বা সুপারশপের ক্যাশিয়ারের সঙ্গে লেনদেনের সময় সামান্য চোখের যোগাযোগকরা, একটু হাসা বা ‘আপনার আজকের দিনটি কেমন যাচ্ছে?’— এমন মিষ্টি প্রশ্ন করা উচিত।

এই ছোট ছোট ইতিবাচক বিনিময় স্নায়ুতন্ত্রকে শিক্ষা দেয় যে, বাইরের পৃথিবীটি নিরাপদ এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা আনন্দের।

এটি অবচেতনে সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা বাড়িয়ে তোলে।

পুরনো খবর:

সম্ভাব্য সঙ্গীর মন জয় করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের কৌশল এক নয়
বন্ধুত্ব ভাঙার ৫টি স্পষ্ট লক্ষণ
হৃদ্-যন্ত্র ভালো রাখতে গভীর বন্ধুত্ব