০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

মানসিক স্বস্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করা কতটা নিরাপদ?

রাতদুপুরে মন খারাপ থাকলে চ্যাটজিপিটির কাছে পরামর্শ চাইছেন? এক্ষেত্রে বিনামূল্যে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মিলছে বটে, তবে ঝুঁকিও কম নয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Nov 2026, 05:37 PM

Updated : 07 Nov 2026, 05:38 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ এখন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই জায়গা করে নিচ্ছে। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সামলানো পর্যন্ত। বাদ যায়নি মানসিক স্বাস্থ্য বা থেরাপির জগৎও।

গভীর রাতে মন খারাপ থাকলে, দুশ্চিন্তায় দিশেহারা লাগলে বা কোনও কথোপকথন নিয়ে বারবার ভাবতে থাকলে বিনামূল্যে এবং মুহূর্তের মধ্যে পরামর্শ পাওয়ার আকর্ষণ এড়ানো কঠিন।

তবে প্রথাগত থেরাপিস্টের বিকল্প হিসেবে চ্যাটজিপিটি বা এআই চ্যাটবটের ওপর এই নির্ভরতা কতটা নিরাপদ ও কার্যকর, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

জীবনধারা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ‘থেরাপিস্টস অব নিউ ইয়র্ক’-এর নিবন্ধিত মনোবিদ ডা. জিওফ্রে গোল্ড বলেন, “বর্তমানে রোগীদের মধ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাঝের সময়ে এআই-কে একটি ‘সাউন্ডিং বোর্ড’ বা নিজের ভাবনা যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা স্পষ্টভাবেই বেড়েছে। তবে চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনের ফলে ক্ষতির অভিযোগে ইতোমধ্যে বেশ কিছু মামলা হয়েছে এবং মানসিক চিকিৎসায় এআই-এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ও নেভাডা অঙ্গরাজ্য আইনি পদক্ষেপও নিয়েছে।”

তবে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক মনোচিকিৎসক এবং ‘আনকন্ডিশনালি ওয়ার্থি’ পডকাস্টের সঞ্চালক ডা. আদিয়া গুডেনের মতে, “এআই-কে একেবারে অকেজো বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না; বরং এটির সঠিক ও সীমিত ব্যবহার উপকারী হতে পারে।”

মানসিক স্বাস্থ্যে এআই চ্যাটবট যেভাবে সাহায্য করতে পারে

তাৎক্ষণিক মন হালকা করার মাধ্যম: একজন পেশাদার থেরাপিস্ট সপ্তাহে সাধারণত একবার সময় দিতে পারেন এবং এর জন্য নির্দিষ্ট ফি প্রয়োজন হয়। বিপরীতে চ্যাটবট ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে হাতের নাগালে থাকে।

ডা. গোল্ডের মতে, “রাত ২টার সময় অস্থির চিন্তা সামলাতে বা বিব্রতকর কোনও অভিজ্ঞতার কথা বলে তাৎক্ষণিক মন হালকা করার ক্ষেত্রে এটি একটি ভার্চুয়াল আশ্রয় হিসেবে কাজ করতে পারে।”

নির্দিষ্ট মানসিক দক্ষতা অনুশীলন: ডা. গুডেন বলেন, “জটিল পারিবারিক সংকট বা চাকরি ছাড়ার মতো বড় সিদ্ধান্তের সমাধান না খুঁজে, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার নির্দিষ্ট কৌশল শিখতে এআই ব্যবহার করা কার্যকর।”

যেমন— অস্থিরতা বা ‘অ্যাংয়জাইটি’ কমাতে ৫ মিনিটের শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম অনুশীলন করা বা কৃতজ্ঞতা চর্চার জন্য ডায়েরি লেখার বা জার্নালিংয়ের বিষয়বস্তু তৈরি করে নেওয়া।

যেখানে এআই চ্যাটবট সম্পূর্ণ ব্যর্থ

বছরের পর বছর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নেওয়া একজন মানবিক পেশাদারের জায়গা চ্যাটবট কখনই নিতে পারে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মানবিক সম্পর্কের অভাব: বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, থেরাপির সাফল্যের বড় অংশই নির্ভর করে থেরাপিস্ট ও রোগীর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

ডা. গোল্ড বলেন, “স্ক্রিনের ওপাশে এমন কোনও মানুষ নেই যার নিজস্ব আবেগীয় জীবন রয়েছে।”

একজন মানবিক থেরাপিস্ট রোগীর কণ্ঠস্বরের সূক্ষ্ম পরিবর্তন এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝতে পারেন যে, মুখে ‘আমি ভালো আছি’ বললেও ভেতরে কোনও কষ্ট লুকিয়ে আছে, যা চ্যাটজিপিটির পক্ষে বোঝা অসম্ভব।

বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি: সবসময় হাতের নাগালে থাকায়, একই বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করতে পারে যে কেউ।

ডা. গুডেনের আশঙ্কা, “এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মানুষকে তার বাস্তব জীবনের বন্ধু বা পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যা পারস্পরিক বোঝাপড়ার স্বাভাবিক আনন্দ কেড়ে নেয়।”

ভুল চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ না করা: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো সাধারণত ব্যবহারকারীর সঙ্গে একমত হওয়ার প্রবণতা নিয়ে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ কোনও ঝগড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এটি ব্যবহাকারীর পক্ষ নিয়েই কথা বলবে।

ডা. গুডেন বলেন, “একজন প্রকৃত মনস্তত্ত্ববিদের কাজ হল, সহমর্মিতার সঙ্গে থেরাপি নিতে আসা ব্যক্তির ক্ষতিকর চিন্তা বা আচরণকে চ্যালেঞ্জ করা এবং পরিস্থিতির পেছনের মূল কারণ (যেমন একাকিত্ব বা নিরাপত্তাহীনতা) খুঁজে বের করা।

নিরাপদভাবে এআই ব্যবহারের ৪টি পদ্ধতি

পেশাদার থেরাপিস্টদের মতো এআই চ্যাটবটের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তাই এটি ব্যবহারে বিশেষজ্ঞরা ৪টি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।

সময়সীমা নির্ধারণ: প্রথাগত থেরাপি সেশন সাধারণত ৪৫ থেকে ৫০ মিনিটের বেশি হয় না।

ডা. গোল্ডের মতে, “চ্যাটজিপিটি বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে নেওয়া উচিত, নতুবা একই দুশ্চিন্তায় ঘুরপাক খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।”

আবেগীয় সান্ত্বনার বদলে কৌশল খোঁজা: চ্যাটবটের কাছে মানসিক সান্ত্বনা আশা না করে নেতিবাচক চিন্তা বদলানোর সুনির্দিষ্ট কৌশল জানতে চাওয়া উচিত।

তথ্যের সত্যতা যাচাই: গবেষণায় দেখা গেছে, এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বা অনুপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারে। তাই চ্যাটবটকে তার তথ্যের উৎস বা রেফারেন্স (যেমন- ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘মায়ো ক্লিনিক’) উল্লেখ করতে বলা উচিত এবং সন্দেহ হলে তা যাচাই করে নিতে হবে।

মানবিক সাহায্য নেওয়ার সঠিক সময় বোঝা: আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদকাসক্তি বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর মানসিক সংকটে কখনই এআই-এর ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত পেশাদার চিকিৎসক, ‘সাপোর্ট গ্রুপে’র সাহায্য নেওয়া আবশ্যক।

পুরনো খবর:

মাত্র ২ মিনিটের চর্চায় মস্তিষ্কে ফিরতে পারে প্রশান্তি
অলসতার চাদরে মানসিক ক্লান্তি
মানসিক চাপ থেকে ব্রণ: রেহাই পাওয়ার রয়েছে উপায়
অজান্তেই হয়ত বাড়াচ্ছেন মানসিক চাপ: এই ছোট অভ্যাসগুলো চিনে নিন
মধ্যবয়সের মানসিক সংকট সামলানোর তিন পন্থা