০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

অন্যের আচরণে কষ্ট পাওয়া বন্ধ করার ৮ উপায়

ভালো থাকতে সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে নিতে হয় না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Nov 2026, 04:14 PM

Updated : 08 Nov 2026, 04:14 PM

কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর রুক্ষ মন্তব্য, বন্ধুর নীরবতা বা পরিবারের কারও খিটখিটে মেজাজ- দৈনন্দিন জীবনে অন্যের এমন আচরণকে অনেকেই সরাসরি নিজের ওপর টেনে নেন।

একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘টেকিং থিংস পার্সোনালি’ বা সবকিছুকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করা বলা হয়।

এই অভ্যাসের কারণে মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস কমে এবং অবচেতন মন তীব্র হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করে।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অন্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াকে স্পঞ্জের মতো নিজের ভেতরে শুষে নেওয়া বন্ধ করতে না পারলে মানসিক শান্তি বজায় রাখা অসম্ভব।

মেক্সিকান লেখক, আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত ডন মিগুয়েল রুইজ, তার আলোচিত বই ‘দ্য ফোর এগ্রিমেন্টস’তে উল্লেখ করেন যে, ‘এমনকি যখন কোনও পরিস্থিতি খুব ব্যক্তিগত বলে মনে হয়, এমনকি অন্যরা যদি আপনাকে সরাসরি অপমানও করে, তবুও এর সঙ্গে আপনার কোনও সম্পর্ক নেই। তারা কী বলে, কী করে এবং কী মতামত দেয়, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তাদের নিজস্ব মনের ভেতরের বিশ্বাসের বা সমঝোতার ওপর।’  

এই তথ্য জানিয়ে মনোস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মার্কিন মনোবিদ ডা. মিশেল পি. মেইডেনবার্গ বলেন, “কোনও অবজ্ঞাকে ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া মানুষের একটি স্বয়ংক্রিয় মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া, যা নিজের ভেতরের নিরাপত্তাহীনতা এবং সমাজ বা দলের অংশ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়।”

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্নায়ুরোগ-বিশেষজ্ঞ ডা. নাওমি আইজেনবার্গার-এর পরিচালিত এক ‘এফএমআরআই’ গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক প্রত্যাখ্যান বা অবহেলা মস্তিস্কে ঠিক ততটাই তীব্র আঘাত বা বেদনা তৈরি করে, যতটা শারীরিক আঘাত তৈরি করে থাকে।

অন্যের প্রতিক্রিয়া নিজের গায়ে না মাখার ৮টি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল সম্পর্কে জানান ডা. মেইডেনবার্গ।

সবাই আপনাকে পছন্দ করবে না, এটিই স্বাভাবিক

বাস্তব জীবনে নিজেও সবাইকে সমানভাবে পছন্দ করেন না। কোনও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অনেকের সাধারণ অঙ্গভঙ্গি বা ব্যক্তিত্ব ভালো নাও লাগতে পারে।

মানুষের মস্তিস্কের প্রবণতা হল, অন্যের পছন্দকে নিজের যোগ্যতার মাপকাঠি মনে করা।

মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, কারও ব্যক্তিগত ভালোলাগা বা মন্দ-লাগা কখনও নিজের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।

অন্যের মন পড়ার অবাস্তব চেষ্টা বর্জন

মানুষ প্রায়ই নিজের কাল্পনিক চিন্তা, ভয় ও অনুমানকে নিখাদ সত্য বলে ধরে নেয়। যেমন- রাস্তায় চেনা কেউ না দেখার ভান করে চলে গেলে অবচেতন মন সিদ্ধান্ত নেয় যে, তিনি আপনাকে অবহেলা করছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক ডা. অ্যারন টি. বেকের ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি’ তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ধরনের ‘মাইন্ড রিডিং’ বা মন পড়ার ভুল চেষ্টা বাস্তবতাকে বিকৃত করে।

কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, ‘আমি যা ভাবছি তার কি কোনও বাস্তব প্রমাণ আছে, নাকি এটি আমার অনুমান?’

কড়া প্রতিক্রিয়া ও ভেতরের লড়াইয়ের প্রকাশ

কারও অতিরিক্ত রাগ, সমালোচনা বা আক্রমণাত্মক আচরণ মূলত তার নিজের ভেতরের লজ্জা, ব্যর্থতা বা মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ।

মনস্তত্ত্বের ‘প্রোজেকশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ নিজের ভেতরের ক্ষোভ বা নিরাপত্তাহীনতা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আত্মরক্ষা করতে চায়।

সমালোচনাকারীদের তীব্রতা দেখে বুঝতে হবে যে- সমস্যাটি আপনার নয়, সমস্যাটি সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের মানসিক দ্বন্দ্বের।

ক্ষতিকর শক্তি কেবল পর্যবেক্ষণ করতে হবে, শোষণ নয়

কেউ কর্কশ স্বরে কথা বললে বুক ধড়ফড় করা বা পেশি শক্ত হওয়ার মতো শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইমোশনাল কন্ট্যাজিয়ন’ বা আবেগের সংক্রমণ।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অন্যের রাগ বা খারাপ মেজাজকে নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে না দিয়ে, স্রেফ দূর থেকে একজন দর্শক হিসেবে সেটা পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

অন্যের খারাপ মেজাজ মানেই আপনার দোষ নয়

সঙ্গী বা বন্ধু হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে আমরা ভাবি, ‘আমি আবার কী ভুল করলাম?’ অথচ তার এই মন খারাপের কারণ হতে পারে কাজের ক্লান্তি, হরমোনের পরিবর্তন, পারিবারিক দুশ্চিন্তা বা তীব্র ‘স্ট্রেস’ বা চাপ।

নিজেকে অপরাধী না ভেবে বন্ধু বা সঙ্গীকে সহমর্মিতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে— ‘সব ঠিক আছে তো?’

প্রত্যাখ্যান যোগ্যতা নির্ধারণ করে না

প্রেমের সম্পর্কে, চাকরিতে বা পরিবারে প্রত্যাখ্যাত হলে মনে হয়, ‘আমি বোধহয় যথেষ্ট যোগ্য নই।’

কিন্তু প্রত্যাখ্যান মূলত দুটি মানুষের ভিন্ন চাহিদা, অমিল বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

মানুষের অবহেলা বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

প্রতিক্রিয়া থেকে সতর্ক হওয়া

অন্যের রূঢ় আচরণকে কষ্টের কারণ না বানিয়ে সেটিকে একটি জরুরি তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমে সেই ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্বতা, মূল্যবোধ এবং জীবনবোধের গভীরতা স্পষ্ট বোঝা যায়, যা ভবিষ্যতে তার সঙ্গে কেমন দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, সেটা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।

নিজের মানসিক শক্তির অপচয় রোধ

একটি সাধারণ কথা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবা বা পুরোনো চ্যাট বারবার পড়ে ‘রি-প্লে’ করার অভ্যাসকে মনস্তত্ত্বে ‘রুমিনেইশন’ বলা হয়।

এই অমূলক চিন্তা মনকে চরমভাবে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। যে বিষয় বা অন্যের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, সেটার পেছনে শক্তি নষ্ট না করে নিজের মানসিক সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি।

ডা. মিশেল মেইডেনবার্গ স্পষ্ট করে বলেন, “জীবনের বড় মানসিক স্বাধীনতা তখনই আসে যখন নিজের মনের শান্তির জন্য অন্যের আচরণের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করতে হয় না। মনে রাখতে হবে, কেউ আপনাকে রাগিয়ে দেয় না, আপনি নিজে তাদের আচরণে প্ররোচিত বা ‘ট্রিগার্ড’ হন।”

এই মনস্তাত্ত্বিক সত্য মেনে নিলে জীবন অনেক বেশি শান্ত ও সুন্দর হয়ে ওঠে।

পুরনো খবর:

মন খারাপ, নাকি অনুভূতিহীনতা? আনন্দ হারানোর কারণ হতে পারে `অ্যানহেডোনিয়া'
অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ছাড়াও ব্যক্তিত্বের রয়েছে আরও দুটি ধরন
আত্মপক্ষ সমর্থনের অতিরিক্ত প্রবণতা কমানোর উপায়