মনের কষ্ট সামলাতে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কৌশল
অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তবে নিজের প্রতি কতটা সদয় হচ্ছেন?
সাধারণত সমাজে সহানুভূতি বা ‘কমপ্যাশন’ শব্দটিকে অন্যের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো বা সাহায্য করার মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যের প্রতি দয়ালু হওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যর্থতা, জীবনের কঠিনতম সংগ্রাম বা অপূর্ণতার মুহূর্তে নিজের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
একে বলা হয় ‘সেলফ-কমপ্যাশন’ বা আত্ম-সহানুভূতি বলা হয়।
‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যারা নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন, তারা খুব সহজেই যেকোনও মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেন। আর তাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কম থাকে।
শারীরিক যত্ন ও সতেজতা নিশ্চিত করা
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিদ ও লেখক ডা. ক্রিস্টোফার জার্মার প্রতিবেদনে বলেন, “সেলফ-কমপ্যাশনের প্রথম উৎসটি শুরু হয় শরীরের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে। যখন কোনও ব্যক্তি তীব্র মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যান, তখন নিজের শরীরকে একটু আরাম বা স্বস্তি দিলে মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।”
এজন্য পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া, ক্লান্ত শরীরকে পর্যাপ্ত গভীর ঘুম বা ‘রেস্টোরেটিভ স্লিপ’-এর সুযোগ দেওয়া, নিজের হাত, পা বা ঘাড় আলতো করে মালিশ করা বা প্রতিদিন খোলা বাতাসে কিছুক্ষণের জন্য হাঁটাচলা করা উপকারী।
শরীর যখন প্রাকৃতিকভাবে ভালো বোধ করে, তখন মস্তিষ্কে ক্ষতিকর ‘কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ হ্রাস পায়।
নিজের কাছে চিঠি লেখাতে মনের শান্তি
জীবনের কোনও বড় বিপর্যয়— যেমন দীর্ঘদিনের প্রিয় সম্পর্কের বিচ্ছেদ, চাকরি হারানো বা কর্মক্ষেত্রে কোনও ব্যর্থ উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশনের পর কষ্ট লাগে। এই মানসিক জট কাটাতে থেরাপিস্টরা নিজের কাছে একটি চিঠি লেখার পরামর্শ দেন।
ডা. জার্মার বলেন, “চিঠিতে সেই বেদনাদায়ক পরিস্থিতি এবং নিজের ভেতরের কষ্টগুলোকে কোনও ধরনের লুকোছাপা বা অন্য কাউকে দোষারোপ করা ছাড়াই স্পষ্ট ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে হবে।”
নিজের মনের আবেগকে চেপে না রেখে, কাগজে লিখে প্রকাশ করলে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে গভীর মুক্তি বা ‘ক্যাথারসিস’ দেয়।
পরম বন্ধুর মতো নিজেকে অনুপ্রেরণা দেওয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটালের ডা. হাওয়ার্ড ই. লেভাইন বলেন, “মানুষ যখন নিজে কোনও ভুল বা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়, তখন সে নিজের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করে, যা চরম অবৈজ্ঞানিক।”
এই সংকট কাটাতে বিশেষজ্ঞরা চোখ বন্ধ করে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন যে— ঠিক একই ভুল বা দুঃখজনক ঘটনা যদি কোনও কাছের বন্ধুর সঙ্গে ঘটত, তবে আপনি তাকে সান্ত্বনা দিতে বা চাঙা করতে মুখ ফুটে কী কী ইতিবাচক কথা বলতেন?
“সেই একই সহানুভূতিশীল, দয়াশীল এবং আশাব্যাঞ্জক কথাগুলো নিজের অবচেতন মনের দিকে নির্দেশ করুন। নিজেকে ভালোবেসে দেওয়া এই মানসিক সমর্থন স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে ওষুধের মতো কাজ করে”, পরামর্শ দেন ডা. লেভাইন।
বিচারহীন আত্ম-সচেতনতা
‘সেলফ-কমপ্যাশন’-এর প্রধান স্তম্ভ হল ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও বর্তমান শারীরিক অবস্থাকে কোনও ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই গ্রহণ করা।
ডা. লেভাইন বলেন, “আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কোনও ক্ষোভ বা অপূর্ণতা দেখলে, সেটিকে ঘৃণা বা অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ভালো-মন্দের সম্পূর্ণ মিশ্রণটি জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে সানন্দে মেনে নিন।”
এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানসিক দীর্ঘায়ু এবং বাধার মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
