মন খারাপ, নাকি অনুভূতিহীনতা? আনন্দ হারানোর কারণ হতে পারে `অ্যানহেডোনিয়া'
কোনও কিছুতেই আর আগের মতো আনন্দ পাচ্ছেন না? সব ঠিকঠাক থাকার পরও জীবনকে অর্থহীন মনে হচ্ছে? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘অ্যানহেডোনিয়া’।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনের আবেগ ও মেজাজেও নানান রকম তারতম্য ঘটে।
বিশেষ করে শরৎ পার হয়ে যখন শীতের আমেজ শুরু হয়, দিন ছোট হতে থাকে এবং চারপাশের তাপমাত্রা কমে আসে, তখন অলসতাবশত অনেকেরই ঘরের বাইরে যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়।
এ সময়ে মাঝেমধ্যে কিছুটা মন খারাপ বা উদাসীন লাগা স্বাভাবিক। তবে এই সাময়িক উদাসীনতা যখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় এবং কোনও কিছুতেই আর বিন্দুমাত্র আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন বুঝতে হবে বিষয়টি শীতকালীন মন খারাপের গণ্ডি পার হয়ে গেছে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই তীব্র অনুভূতিহীন অবস্থার নাম, ‘অ্যানহেডোনিয়া’
জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মনোবিদরা জানান, সাধারণ দুঃখ বা মন খারাপের সঙ্গে, এই মানসিক অবস্থার তফাত রয়েছে। আর এই অবশ অনুভূতি থেকে মনকে সচল করাও সম্ভব।
অ্যানহেডোনিয়া কী এবং সাধারণ দুঃখের সঙ্গে এর পার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থা ‘লায়নফ্লাওয়ার স্টুডিও’র প্রতিষ্ঠাতা এবং নিবন্ধিত মনোবিদ এরিন বারবোসা বলেন, “অ্যানহেডোনিয়া হল এমন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যেখানে একজন মানুষ অতীতে যে কাজগুলো করতে ভালোবাসতেন বা আনন্দ পেতেন, সেগুলোতে তার ভালো লাগার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে হ্রাস পায়।”
দুঃখ বা মন খারাপ: সাধারণ দুঃখের সময় মানুষের মন খারাপ থাকলেও, সে বন্ধুদের আড্ডায় গেলে বা প্রিয় কোনও সিনেমা দেখলে সাময়িক আনন্দ পায়।
অ্যানহেডোনিয়া: এই অবস্থায় মনের ভেতর তীব্র এক ধরনের ‘শূন্যতা’ বা অবশভাব কাজ করে। শখ, বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের মানুষকে মন থেকে মূল্যায়ন করলেও, তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ভেতরের সেই চেনা সুখ বা তৃপ্তিটুকু খুঁজে পায় না।
জীবনটা কাগজে-কলমে পুরোপুরি ঠিকঠাক মনে হলেও, ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে।
এই অবশ অনুভূতি তৈরির কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যানহাটন মেন্টাল হেলথ কাউন্সেলিং’-এর মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসক নাটালি বুচওয়াল্ড বলেন, “অ্যানহেডোনিয়া মূলত মস্তিস্কের ‘রিওয়ার্ড সার্কিট্রি’ বা পুরস্কার সংক্রান্ত স্নায়বিক নেটওয়ার্কের ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ব্যবস্থাটি মানুষকে কোনও কাজের আনন্দ অনুমান করতে এবং তা উপভোগ করতে সাহায্য করে।”
আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের অতিরিক্ত কাজের চাপ, অনবরত সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেইশন এবং কৃত্রিম উপায়ে অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের তুলনা করার ফলে মস্তিস্কের এই ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’টি ক্লান্ত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
ফলে প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা সাপ্তাহিজ ছুটির দিনের পরিকল্পনাগুলোও একসময় আনন্দের বদলে রুটিন মাফিক ‘কাজের তোড়া’ বা বোঝা মনে হতে শুরু করে।
অ্যানহেডোনিয়া সামলানোর ৫টি কৌশল
এই অবস্থা থেকে নিজের মনকে পুনরায় সচল করতে মনো-চিকিৎসকরা ৫টি পন্থা সম্পর্কে জানা।
জোর করে খুশি হওয়ার মানসিক চাপ দূর করা: নাটালি বুচওয়াল্ডের মতে, “মন ভালো করার জন্য নিজের ওপর জোর করা বা অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করা বন্ধ করতে হবে। জোর করে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা উল্টো ব্যর্থতার অনুভূতি বাড়ায়।”
মেজাজ যেমনই হোক, প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজগুলোতে অংশ নেওয়া উচিত, তবে তা থেকে তাৎক্ষণিক কোনও বড় আনন্দের প্রত্যাশা না করাই শ্রেয়।
‘বিহেভিওরাল অ্যাক্টিভেশন’ বা ধীরে ধীরে কাজে ফেরা: মানসিক অবসাদ দূর করতে মনোবিজ্ঞানের কার্যকর একটি পদ্ধতি হল ‘বিহেভিওরাল অ্যাক্টিভেশন’। এর অর্থ হল, কোনও কাজের প্রতি প্রাথমিক ইচ্ছা বা প্রেরণা না থাকলেও, অতীতে ভালো লাগত এমন ছোট ছোট কাজ দৈনিক রুটিনে পুনরায় যুক্ত করা।
যেমন- পছন্দের গান শোনা, সামান্য হাঁটা, প্রিয় কোনও খাবার রান্না করা। নিয়মিত এই সুযোগগুলো তৈরি করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিস্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ আবার সচল হতে শুরু করে।
আনন্দের চেয়ে ‘যোগাযোগ ও তাৎপর্য’ খোঁজা: অনুভূতিহীনতার সময় সামাজিক মেলামেশাকেও এক ধরনের অভিনয় বা ‘করপোরেট’ দায়িত্ব মনে হতে পারে।
এরিন বারবোসা এই সময় এমন মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর পরামর্শ দেন, যার সামনে কোনও মুখোশ না পরে নিজের আসল অবশ রূপটি নিয়েই শান্ত থাকা যায়।
প্রতিদিন সকালে নিজেকে ‘আজ কী করলে আমি খুশি হব?’ এই প্রশ্ন না করে, বরং প্রশ্ন করা উচিত- ‘আজ কী করলে আমি নিজের জীবনের সঙ্গে একটু বেশি সংযুক্ত বা কানেক্টেড বোধ করব?’
সৃজনশীলতা এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য: কোনও ধরনের লাভ বা উৎপাদনশীলতার আশা না করে, শুধুই আনন্দের জন্য ছোটখাটো সৃজনশীল কাজ যেমন- বাগান করা, ডায়েরি লেখা বা ছবি আঁকার চেষ্টা করতে হবে।
পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণের জন্য প্রকৃতির খোলা বাতাসে বা সবুজের মাঝে হাঁটা জরুরি। প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়কে সচল করে মস্তিস্কের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
সাহায্য নেওয়া: অস্থিরতা বা এই শূন্যতার অনুভূতি যদি একটানা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্র বা পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং সঙ্গে ‘ডিপ্রেশন’ বা বিষণ্নতার অন্যান্য লক্ষণ প্রকাশ পায়, তবে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত হবে।
