০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা কি শুধুই রোগ, নাকি অন্য কোনও বিপদের সংকেত?

বয়স ভেদে দুশ্চিন্তার ধরন যেমন আলাদা তেমনি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কমানোর চিকিৎসাও ভিন্ন হয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Nov 2026, 06:03 PM

Updated : 02 Nov 2026, 06:02 PM

বুকের ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত ধড়ফড়ানি, হাত-পা ঘেমে যাওয়া বা সারাক্ষণ কোনও এক অজানা আশঙ্কায় ভোগা, আজকের এই ব্যস্ত যান্ত্রিক যুগে ‘অ্যাংজাইটি’ বা তীব্র দুশ্চিন্তা পরিচিত এক মানসিক অবস্থা।

অনেকেই হঠাৎ করে এই অস্থিরতায় আক্রান্ত হলে গুগলে বা ইন্টারনেট ঘেঁটে এটিকে সরাসরি একটি ‘মানসিক রোগ’ বা রোগনির্ণয়ক হিসেবে ধরে নেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভুল ধারণা।

‘অ্যাংজাইটি’ বা দুশ্চিন্তা করা আসলে কোনও রোগ নয়, বরং এটি শরীরের লুকিয়ে থাকা বড় মানসিক বা শারীরিক সমস্যার একটি প্রাথমিক ‘লক্ষণ’।

মনস্তাত্ত্বিক-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইয়েল স্কুল অব মেডিসিন’-এর সহকারী অধ্যাপক ও মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মার্ক রেগো উল্লেখ করেন, “চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, অ্যাংজাইটি হল কোনও অস্পষ্ট বা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয় এমন হুমকির প্রতি আমাদের পরিপক্ব মস্তিস্কের এক ধরনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে সমস্যা তখনই হয়, যখন এটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।”

ডা. মার্ক রেগোর মনস্তাত্ত্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বয়সভেদে দুশ্চিন্তার গতিপথ ও অন্তর্নিহিত কারণগুলো নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হল।

শৈশব বা শিশুদের অ্যাংজাইটি

শিশুদের মস্তিস্ক পূর্ণাঙ্গভাবে পরিপক্ব না হওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো দুশ্চিন্তা তাদের মাঝে কিছুটা কম দেখা যায়। তবে বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যেও এর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

লক্ষণ ও কারণ: প্রাক-বিদ্যালয়গামী শিশুদের মধ্যে সাধারণত ‘সেপারেশন অ্যাংজাইটি’ (পরিবার থেকে দূরে থাকার ভয়) বা ভূত, অন্ধকার বা পোকামাকড়ের ভয় বেশি দেখা যায়, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই কেটে যায়।

তবে শিশুর ব্যক্তিত্বের মধ্যে যদি নতুন পরিবেশ এড়ানো বা তীব্র সামাজিক ভীতি জন্ম নেয়, তবে পরবর্তী জীবনে স্থায়ী দুশ্চিন্তার বড় সংকেত হতে পারে।

এর পেছনে পারিবারিক কলহ, স্কুলের ‘বুলিং’ বা নিপীড়ন বা জিনগত ইতিহাস কাজ করে।

শিশুদের ক্ষেত্রে এই অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা অনেক সময় তীব্র রাগ বা কান্নাকাটির মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যার জন্য শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

কৈশোর বা তরুণ বয়সের অ্যাংজাইটি

কৈশোর বা টিনএজ বয়স থেকেই মস্তিস্কের দুশ্চিন্তা প্রকাশের ধরন বদলে যায় এবং এটি মূলত দুটি প্রধান উপায়ে প্রকাশ পায়— ‘জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি’, অর্থাৎ সব বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও পেশি শক্ত হওয়া। অন্যটি প্যানিক অ্যাটাক বা হঠাৎ তীব্র বুক জ্বালা, মাথা ঘোরা ও বুক ধড়ফড় করা।

লক্ষণ ও কারণ: তরুণ বয়সে প্রথমবার ‘প্যানিক অ্যাটাক’ শুরু হওয়া মানে, সেটা ‘প্যানিক ডিজঅর্ডার’ বা ‘অ্যাগোরাফোবিয়া’ (জনসমাগমে ও একা থাকার ভয়)-এর দিকে ইঙ্গিত করে।

ডা. মার্ক রেগোর মতে, “এই বয়সে প্যানিক অ্যাটাক শুরু হওয়া আসলে ‘ডিপ্রেশন’ বা তীব্র বিষণ্নতার একটি পূর্বলক্ষণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি প্যানিক অ্যাটাকের রোগী পরবর্তী সময়ে তীব্র ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন। এর ফলে তরুণদের পড়াশোনা ও সামাজিক জীবন ব্যাহত হয়।”

মধ্যবয়স বা প্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাংজাইটি

৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সিদের মধ্যে হঠাৎ নতুন করে তীব্র দুশ্চিন্তা দেখা দিলে, সেটা কোনও রোগ নয়, বরং জীবনের বড় ধরনের কোনও মানসিক ধাক্কা বা স্ট্রেসের লক্ষণ।

লক্ষণ ও কারণ: এই বয়সের অ্যাংজাইটি মূলত বিবাহবিচ্ছেদ, চাকরি হারানো, আর্থিক সংকট, হঠাৎ বড় কোনও শারীরিক অসুস্থতা বা বাবা-মায়ের মৃত্যুর মতো জীবনের চরম বাস্তব ক্ষতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেয়।

এটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি)’ নেওয়া জরুরি।

শেষ বয়স বা প্রবীণদের অ্যাংজাইটি

৫০, ৬০ বা ৭০ বছর পার হওয়ার পর, আগে থেকে এরকম কোনও লক্ষণ না থাকলে যদি নতুন অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তার লক্ষণ দেখা দেয় তবে চিকিৎসকেরা একে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।

কারণ এই বয়সের অ্যাংজাইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জৈবিক সংকেত দেয়।

লক্ষণ ও কারণ: প্রবীণ বয়সের নতুন দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতার পেছনে কোনও পারিবারিক বা জিনগত ইতিহাস থাকে না।

ডা. মার্ক রেগোর মতে, “এটি আসলে মস্তিস্কের অবক্ষয়জনিত রোগ ‘ডিমেনশা’ বা স্মৃতিভ্রমের একদম প্রাথমিক লক্ষণ। চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে, শেষ বয়সে যারা প্রথমবার তীব্র মানসিক অস্থিরতা বা বিষণ্নতায় ভোগেন, তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের পরবর্তী সময়ে ডিমেনশা বা আলঝাইমার’স রোগ ধরা পড়ে।

বিশেষ করে যাদের বয়স ৭৫ বছরের বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি মারাত্মক।

তাই বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলছেন, নিজের বা প্রিয়জনের হঠাৎ শুরু হওয়া অস্থিরতা দমনে ইন্টারনেট ঘেঁটে যত্রতত্র ওষুধ না খেয়ে, সবার আগে বয়স, জীবনযাত্রার সমস্যা এবং অন্যান্য মানসিক লক্ষণগুলো মিলিয়ে দেখা উচিত।

অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা যেহেতু শরীরের ভেতরের অন্য কোনও সংকটের অ্যালার্ম বা সংকেত, তাই একজন নিবন্ধিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের নির্দেশিকা অনুযায়ী আসল সমস্যাটি সনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়াই সুস্থ জীবন ফিরে পাওয়ার উপায় হতে পারে।

পুরনো খবর:

শরীরের ১১টি সূক্ষ্ম লক্ষণ যা অবহেলা করা বিপজ্জনক
প্রকৃতির ছোঁয়া যেভাবে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে
অস্থিরতা দূর করার উপায়