অস্থিরতা দূর করার উপায়
কারণে-অকারণে বুক ধড়ফড়ানি, অস্থিরতা বা তীব্র দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম? এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য রয়েছে ঘরোয়া কৌশল।
আজকের দ্রুতগতির যান্ত্রিক জীবনে মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস’ যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে এই মানসিক চাপ যখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন তা ‘অ্যাংজাইটি’ বা তীব্র দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।
এটি কেবল সাময়িক মানসিক অবস্থা নয়, বরং অবহেলা করলে ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন কিছু কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তাকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
শিকাগোর নিবন্ধিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জোসলিন জেলিনেক প্রতিবেদনে বলেন, “হুট করে ‘অ্যাংজাইটি’ বা ‘প্যানিক অ্যাটাক’ শুরু হলে, সামলানোর জন্য তাৎক্ষণিক কিছু কৌশল জানা থাকা দরকার, যা শরীরের উত্তেজিত স্নায়ুকে দ্রুত শান্ত করতে পারে।
দুশ্চিন্তা সামলানোর ৫টি কৌশল
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন: দুশ্চিন্তা বাড়লে হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে থাকে। এটি নিয়ন্ত্রণে ‘৪-৭-৮’ নামক শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামটি করা উচিত। এই পদ্ধতিতে ৪ সেকেন্ড ধরে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে হবে, ৭ সেকেন্ড শ্বাসটি ধরে রাখতে হবে এবং ৮ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। একটানা ৫ মিনিট এটি করলে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয়ে মন শান্ত হয়।
৩৩৩ নিয়মের ব্যবহার: এটি একটি কার্যকর কৌশল। যখন মন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন চারপাশের বাস্তবতায় মনোযোগ ফেরাতে এই নিয়ম কাজ করে।
এজন্য তাৎক্ষণিকভাবে চোখে দেখছেন এমন ৩টি জিনিস, কানে শুনছেন এমন ৩টি শব্দ এবং স্পর্শ করতে পারছেন এমন ৩টি বস্তুকে মনে মনে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রতিটিতে ১ মিনিট করে মনোযোগ দিতে হবে।
শারীরিক সক্রিয়তা: ‘অ্যাংজাইটি’ বাড়লে শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক ‘স্ট্রেস’ বা চাপের হরমোন বাড়ে। এটি কমাতে মাত্র ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের জন্য ‘স্পট স্কোয়াট’ বা ওঠবস করা, ‘পুশআপ’ বা ‘জাম্পিং জ্যাক’-এর মতো হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। এটি দ্রুত মস্তিষ্কের মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনকে চাঙা করে তোলে।
অ্যারোমাথেরাপি: ল্যাভেন্ডার, ক্যামোমাইল বা চন্দন কাঠের প্রাকৃতিক সুগন্ধ দুশ্চিন্তা কমাতে ভূমিকা রাখে। কর্মক্ষেত্রে বা শোবার ঘরে এই সুগন্ধিযুক্ত মোমবাতি বা এসেনশল অয়েল ব্যবহার করলে স্নায়ুকে শিথিল করে।
চিন্তার ধরনকে চ্যালেঞ্জ করা: দুশ্চিন্তার সময় মনে অবাস্তব নেতিবাচক চিন্তা ভর করে। চিকিৎসকদের মতে, এই সময় নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে— ‘আমি যা ভাবছি তা কি আসলেও বাস্তব কোনও তথ্য, নাকি কেবলই আমার অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া ভয়?’
দীর্ঘমেয়াদে ‘অ্যাংজাইটি’ দূর করার উপায়
চিকিৎসা সাময়িকী ‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’-এর বিভিন্ন ক্লিনিকাল গবেষণায় দেখা গেছে, সাময়িক উপশমের পাশাপাশি দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
মনোযোগ দিয়ে ডায়েরি লেখা বা জার্নালিং: ২০১৮ সালে মার্কিন চিকিৎসকদের পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন নিজের আবেগ ও চিন্তাভাবনা ডায়েরিতে লিখে রাখলে, সেটা মানসিক কষ্ট, হতাশা এবং তীব্র দুশ্চিন্তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে কোন কোন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তা বাড়ে, তাও সহজে চিহ্নিত করা যায়।
নিয়মিত মেডিটেইশন বা ধ্যান: প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট ‘মাইন্ডফুলনেস মেডিটেইশন’ বা ধ্যান করলে মস্তিষ্কের দুশ্চিন্তা প্রকাশের প্রতিক্রিয়াকে স্থায়ীভাবে পুনর্গঠন করে। যারা স্থির হয়ে বসতে পারেন না, তারা ‘ওয়াকিং মেডিটেইশন’ বা হেঁটে হেঁটে ধ্যান করতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি: বিশ্বস্ত বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে গুণগত সময় কাটালে একাকিত্ব দূর হয়।
মনোবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল সেফটি থিওরি’ অনুযায়ী, ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্ক মানুষকে যেকোনও মানসিক ধাক্কা বা ‘স্ট্রেস’ সামলানোর ক্ষেত্রে ভেতর থেকে শক্তিশালী ও সহনশীল করে তোলে।
নিয়মিত ব্যায়াম: ব্যায়ামের প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে শরীরে ‘এন্ডোরফিনস’ হরমোন বাড়িয়ে ঘুমের মান উন্নত করে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানসিক স্পষ্টতা বজায় রাখে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা
দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতার কারণে যদি দৈনিক কাজ, কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা বা পারিবারিক সম্পর্কে বাধা সৃষ্টি করে, তবে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে একজন নিবন্ধিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তীব্র ‘অ্যাংজাইটি’ বা দুশ্চিন্তার চিকিৎসায়, মনোবিদরা ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি)’ এবং প্রয়োজনভেদে ‘এসএসআরআই’ বা ‘এসএনআরআই’ ধরনের প্রেসক্রিপশন ওষুধের সাহায্যে চিকিৎসা করে থাকেন।
