শরীরের ১১টি সূক্ষ্ম লক্ষণ যা অবহেলা করা বিপজ্জনক
কোনও দৃশ্যমান আঘাত বা কাটাছেঁড়া ছাড়াই কি শরীর ও হাড়ের জোড়ে অনবরত ব্যথা হচ্ছে? এটি হতে পারে 'ক্রনিক ইনফ্লামেইশন' বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের লক্ষণ।
‘ইনফ্লামেইশন’ বা প্রদাহ বললেই সাধারণত চোখে ভেসে ওঠে শরীরের কোনও অংশ লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া বা তীব্র ব্যথা।
চিকিৎসকদের মতে, এগুলো মূলত ‘অ্যাকিউট’ বা সাময়িক প্রদাহের লক্ষণ। তবে প্রদাহ যখন ‘ক্রনিক’ বা দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়, তখন লক্ষণগুলো এতটাই সূক্ষ্ম ও অস্পষ্ট হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা বেশ কঠিন।
জীবনযাপন-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রিয়েল সিম্পল’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা, দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের এমন ১১টি সূক্ষ্ম লক্ষণের কথা জানিয়েছেন, যা অবহেলা করলে পরবর্তী সময়ে হৃদ্-যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।
ইনফ্লামেইশন বা প্রদাহ বলতে যা বোঝায়
নিউইয়র্ক টাইমস-এর ‘বেস্টসেলিং’ লেখক এবং মার্কিন চিকিৎসক ডা. উইলিয়াম ডব্লিউ লি বলেন, “ইনফ্লামেইশন আসলে ক্ষতিকারক অবস্থা নয়, বরং এটি আঘাত বা সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের একটি স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।”
কোনও কোষে ক্ষতি হলে শরীর ‘সাইটোকাইন’ নামক প্রোটিন নিঃসরণ করে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং ক্ষত নিরাময় করে। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর এই প্রদাহ কমে যায়।
তবে জীবনযাত্রার ত্রুটি এবং পরিবেশগত বেশ কিছু নেতিবাচক কারণে এই প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।
‘নেচার মেডিসিন জার্নাল’-এ প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের প্রধান কারণ হিসেবে বেশ কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
দীর্ঘস্থায়ী বা অনিয়মিত সংক্রমণ
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বা অলস জীবনযাপন
অস্বাস্থ্যকর ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ
বিষাক্ত পরিবেশগত দূষণ
অন্ত্রের অণুজীবের ভারসাম্যহীনতা
দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব বা অনিয়মিত ঘুম
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও একাকিত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে অবস্থিত ‘মেমোরিয়াল হারম্যান মেডিকেল গ্রুপ’-এর প্রাথমিক চিকিৎসা ও ক্রীড়া ওষুধ বিশেষজ্ঞ ডা. বেনেডিক্ট ইফেডি বলেন, “প্রদাহ সাধারণত তিন ধরনের হয়— অ্যাকিউট (স্বল্পমেয়াদি), সাব-অ্যাকিউট (২ থেকে ৬ সপ্তাহ স্থায়ী) এবং ক্রনিক (৬ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী)।”
দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক প্রদাহে শরীর অনবরত সাইটোকাইন তৈরি করতে থাকে, যা শরীরের সুস্থ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ক্যান্সার, অন্ত্রের রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ডিমেনশা বা স্মৃতিভ্রংশ রোগের মতো ব্যাধি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের সূক্ষ্ম লক্ষণ
অনবরত শরীর ও পেশিতে ব্যথা: চেয়ার টেবিলে কাজ করার ক্ষেত্রে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বা ভারী কাজের কোনও সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই যদি পেশি, জয়েন্ট বা পুরো শরীরে অনবরত ব্যথা অনুভূত হয়, তবে তা ক্রনিক ইনফ্লামেইশনের লক্ষণ হতে পারে।
শরীর ক্রমাগত প্রদাহজনিত কোষ তৈরি করলে, সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে এই ব্যথার সৃষ্টি করে।
ঘুমের তীব্র সমস্যা ও ক্লান্তি: দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র বা ‘সার্কেডিয়ান রিদম’ নষ্ট করে দেয়। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়মিত বা নিম্নমানের ঘুম শরীরে প্রদাহের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়, যা পরে অনিদ্রা ও চরম ক্লান্তির একটি চক্র তৈরি করে।
অতিরিক্ত মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা উদ্বেগ: ডা. উইলিয়াম লি বলেন, “ক্রনিক ইনফ্লামেইশনের ফলে নিঃসৃত সাইটোকাইনগুলো সরাসরি মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আবেগ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী নিউরোট্রান্সমিটারগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকিয়াট্রি জার্নাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে খিটখিটে মেজাজ, দ্রুত রেগে যাওয়া, অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা দেখা দেয়।
ঘনঘন অসুস্থ হওয়া: দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে শরীরের স্বাভাবিক কোষের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং সাধারণ সর্দি-কাশি বা যেকোনো ভাইরাসে ঘনঘন আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
হজমের সমস্যা ও পেটের অসুখ: অন্ত্রের ভেতরের দেয়ালটি একটি সুরক্ষাকবচ বা ‘লাইনিং’ হিসেবে কাজ করে।
ডা. লি জানান, ক্রনিক ইনফ্লামেইশন অন্ত্রের এই লাইনিংকে দুর্বল বা ছিদ্রযুক্ত করে ফেলে। ফলে ভেতরের বর্জ্য উপাদান শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে হজমের জটিলতা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করে।
হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা: প্রদাহ যখন ‘অটোইমিউন’ বা ‘নিউরোডিজেনারেটিভ’ রোগের কারণে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে, তখন স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। ফলে হাঁটার সময় বা হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হতে পারে।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা বহুমূত্র রোগের ঝুঁকি: প্রদাহজনিত সাইটোকাইন প্রোটিনগুলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ইনসুলিনের সংকেত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে ডায়াবেটিস সৃষ্টি করে।
হাত-পায়ে অবশ ভাব বা ঝিনঝিন করা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ক্লান্তি এর অন্যতম লক্ষণ।
শরীরের মাংসপেশি দুর্বল লাগা: যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিভ্রান্ত হয়ে রোগজীবাণুর পরিবর্তে নিজের সুস্থ পেশি কোষ আক্রমণ করা শুরু করে, তখন দুর্বল লাগে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘মায়োসাইটিস’ বলা হয়, যা ‘লুপাস’ বা ‘রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস’-এর মতো অটোইমিউন রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
পিঠের নিচের অংশে ও কোমরে ব্যথা: বয়স বা চোটের কারণ ছাড়াও ‘অ্যানকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস’ বা ‘সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস’-এর মতো প্রদাহজনিত সমস্যার কারণে পিঠের নিচে ও নিতম্বে তীব্র ব্যথা বা শক্ত ভাব হতে পারে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কয়েক ঘণ্টা এই সমস্যা বেশি থাকে।
ত্বকে ঘনঘন র্যাশ বা চুলকানি: শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহের বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় ত্বকের মাধ্যমে ঘটে। চিকিৎসকদের মতে, সোরিয়াসিস, লুপাস কিংবা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের তীব্রতার কারণে ত্বকে এক ধরনের লালচে ছোপ বা ক্রনিক র্যাশ দেখা দিতে পারে।
লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া: সাধারণত ঠান্ডা বা ফ্লু হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় হওয়ায় লিম্ফ নোডগুলো সাময়িকভাবে ফুলে যায়। তবে প্রদাহ সেরে যাওয়ার পরও যদি গলার বা শরীরের অন্যান্য অংশের লসিকা গ্রন্থিগুলো দীর্ঘদিন ফোলা ও কালশিটে হয়ে থাকে, তবে তা শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রদাহের ইঙ্গিত দেয়।
প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসাগত ও প্রাকৃতিক উপায়
ড. উইলিয়াম লি জানান, শরীরে প্রদাহ হচ্ছে কিনা সেটা নিশ্চিত করার জন্য সহজ রক্ত পরীক্ষা রয়েছে, যার নাম ‘সিআরপি’। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে প্রদাহের উপস্থিতি সনাক্ত করে চিকিৎসকরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেন।
এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় ৪টি পরিবর্তন এনে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
প্রচুর ফলমূল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া: উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা পলিফেনল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রদাহ কমায়। এছাড়া আঁশযুক্ত খাবার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার পুষ্টি জোগায়।
চিনি ও অ্যালকোহল পরিহার করা: প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কৃত্রিম মিষ্টি শরীরে প্রদাহের রাসায়নিক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ‘জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’-এর গবেষণা অনুযায়ী, অ্যালকোহল সরাসরি শরীরে প্রদাহজনক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
শারীরিক সক্রিয়তা ও পর্যাপ্ত ঘুম: সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের অ্যারোবিক ব্যায়াম (জোরে হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা) করা উচিত। পাশাপাশি প্রতিদিনের পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত পানি পান: পানিশূন্যতা শরীরের পেশি, রক্তসঞ্চালন ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত করে প্রদাহের জন্ম দেয়। তাই শরীরকে আর্দ্র রাখা জরুরি।
