গভীর রাতে খাওয়ার অভ্যাসে যকৃতের ক্ষতি
রাত জেগে মজার খাবার খেতে খেতে টিভি দেখতে বা ফোন ঘাঁটতে বেশ লাগে। তবে এই অভ্যাস যকৃতের জন্য মোটেই সুখের নয়।
লিভার বা যকৃত শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণে সাহায্য করে, খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদান প্রক্রিয়াজাত করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
তবে অনিয়মিত জীবনযাপন ও কিছু খাদ্যাভ্যাসের কারণে যকৃতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এর মধ্যে একটি হল নিয়মিত গভীর রাতে খাবার খাওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাতে দেরি করে খাওয়ার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। এর সঙ্গে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, যকৃতে চর্বি জমা এবং বিপাকীয় কর্মহীনতাসংশ্লিষ্ট ‘ফ্যাটি লিভার রোগ (এমএএসএলডি ‘ ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
গভীর রাতে খেলে যকৃতের ক্ষতি হওয়ার কারণ
যকৃত শরীরের স্বাভাবিক দৈনিক ছন্দ অনুসরণ করে কাজ করে। দিনের বিভিন্ন সময়ে এটি পুষ্টি উপাদান প্রক্রিয়াজাত করার ধরন পরিবর্তন করে।
রাতে দেরি করে খাবার খেলে শরীরের এই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এর প্রভাব রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ ও চর্বি বিপাকের ওপর পড়তে পারে।
রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে
যকৃতের একটি প্রধান কাজ হল, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা। প্রয়োজন অনুযায়ী এটি গ্লুকোজ জমা রাখে, রক্তে ছাড়ে অথবা তৈরি করে।
রাতের দিকে শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা দিনের তুলনায় সাধারণত কম হয়। ইনসুলিন এমন একটি হরমোন, যা রক্তের গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ফলে রাতে দেরি করে খেলে শরীরের পক্ষে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক কঠিন হয়।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
রাত করে নিয়মিত খাবার খেলে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যকৃতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে
গভীর রাতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে গবেষণায়। শরীরের স্বাভাবিক দৈনিক ছন্দ ব্যাহত হলে চিনি ও চর্বি প্রক্রিয়াজাত করার কার্যক্রমও প্রভাবিত হতে পারে।
চীনের ‘নর্থ চায়না ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’, ‘কাইলুয়ান জেনারেল হাসপাতাল’ ও ‘পিকিং ইউনিভার্সিটি পিপলস হসপিটাল’-এর গবেষক দল ‘কাইলুয়ান কোহোর্ট’-এর ৩২ হাজার ৩০ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ‘ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
‘দ্য অ্যাসোসিয়েশনস বিটুইন ইরেগুলার ব্রেকফাস্ট অ্যান্ড লেট-নাইট স্নাকিং উইথ মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ শিরোনামের গবেষণায় অনিয়মিতভাবে সকালের নাস্তা খাওয়া বা তা বাদ দেওয়া এবং গভীর রাতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে বিপাকীয় কর্মহীনতা সংশ্লিষ্ট ‘ফ্যাটি লিভার’ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া যায়।
গবেষণায় নিয়মিত সকালের নাস্তা খাওয়া এবং রাতে হালকা খাবার না খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায়, যারা কখনও সকালের নাস্তা খেতেন না এবং রাতে খাবার খেতেন, তাদের ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি ৫২ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।
তবে এই ফলাফল থেকে বলা যায় না যে, শুধু রাতে দেরি করে খাওয়ার কারণেই ফ্যাটি লিভার হয়।
গবেষণায় সকালের নাস্তা বাদ দেওয়া এবং রাতে খাবার খাওয়ার সম্মিলিত অভ্যাস বিবেচনা করা হয়েছে। এটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা হওয়ায়, এসব অভ্যাসের সঙ্গে রোগের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও সরাসরি কারণ প্রমাণ করা যায় না।
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সব সময় স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তাই ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক যকৃতের কার্যকারিতা পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করাতে পারেন।
প্রদাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে
দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর সঙ্গে যকৃতে চর্বি জমা ও প্রদাহের সম্পর্ক তৈরি হয়।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ যকৃতের কোষের ক্ষতি করতে পারে। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে যকৃতে ক্ষত তৈরি হওয়া এবং এর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাতে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাতের কাজ, অনিয়মিত ঘুম এবং খাবারের সময়ের পরিবর্তন শরীরের দৈনিক ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে শুধু রাতে কাজ করলেই যকৃতের রোগ হবে, এমন নয়।
যকৃত সুস্থ রাখতে যা করা যায়
রাতে দেরি করে খাওয়ার অভ্যাস কমাতে এবং যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কয়েকটি নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে।
রাতের খাবার সময়মতো খাওয়া: ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। খাবারে ভাত বা রুটির পাশাপাশি মাছ, ডিম, ডাল ও শাকসবজি রাখা উচিত। সুষম খাবার পেট ভরা রাখতে এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে সাহায্য করে।
অকারণে বারবার খাওয়া এড়ানো: রাতে টেলিভিশন দেখা বা মোবাইল ব্যবহার করার সময় অভ্যাসবশত খাবার খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। ক্ষুধা না থাকলে শুধু অভ্যাসের কারণে খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করা: সন্ধ্যার পর দাঁত ব্রাশ করলে রাতের খাবার শেষ করার একটি অভ্যাস তৈরি হতে পারে। এতে অপ্রয়োজনে আবার খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক করা: প্রতিদিন সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা উপকারী। রাত জেগে থাকলে অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
ক্ষুধা লাগলে হালকা খাবার বেছে নেওয়া: রাতে সত্যিই ক্ষুধা লাগলে একেবারে না খেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। অল্প পরিমাণ টক দই, সেদ্ধ ডিম বা পরিমিত বাদাম খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও তেলযুক্ত খাবারের পরিবর্তে পুষ্টিকর খাবার বেছে নিতে হবে।
সুষম খাবার ও শারীরিক পরিশ্রমের গুরুত্ব: যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু খাবারের সময় নয়, খাবারের গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।
পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা অভ্যাস গড়া উচিত। অতিরিক্ত ওজন থাকলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুষম খাবার, নিয়মিত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। গভীর রাতে নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার সঙ্গে ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই রাতের খাবার ও সকালের নাস্তা সঠিক সময়ে নিয়মিত খাওয়া এবং অকারণে বারবার খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমানো উপকারী।
তবে শুধু খাবারের সময় পরিবর্তন করলেই ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ও শরীরের ওজনের দিকেও নজর দিতে হবে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
