অতি চঞ্চল শিশুদের যা খাওয়ানো উচিত
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ, শক্তি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা ও কৌতূহল স্বাভাবিক। তবে কোনও শিশু যদি বয়স অনুযায়ী অস্বাভাবিক অস্থির থাকে, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারে, খুব বেশি ছুটোছুটি করে বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত চঞ্চলতার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কখনও এটি ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার বা (এডিএইচডি)’-এর মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
শুধু খাবার দিয়ে শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতা ভালো করা যায় না। তবে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ, শক্তি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শিশুর প্রতিদিনের খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা উচিত।
ফলমূল
শিশুর খাবারে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ফল রাখা যেতে পারে। কমলা, পেয়ারা, আমড়া, পেঁপে, কলা, আপেলসহ মৌসুমি ফল ভিটামিন, খনিজ, তরল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস। বিশেষ করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ফলকে শুধু মিষ্টি খাবারের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং প্রতিদিনের সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে দেওয়া উচিত।
ফলের জুসের পরিবর্তে আস্ত ফল খাওয়ানো ভালো। এতে খাদ্যআঁশ পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকিও কমে।
বাদাম ও বীজ
আখরোট, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, তিসি ও চিয়া বীজে স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে।
আখরোট, তিসি ও চিয়া বীজে উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসও রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে ভূমিকা রাখে।
শিশুর বয়স অনুযায়ী বাদাম গুঁড়া করে বা ছোট করে খাবারের সঙ্গে দেওয়া যেতে পারে। তবে ছোট শিশুদের পুরো বাদাম দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাই বয়স ও খাওয়ার সক্ষমতা অনুযায়ী বাদাম দিতে হবে।
দুধ ও দুধজাত খাবার
দুধ ও দুধজাত খাবার ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ভালো উৎস। শিশুর হাড় ও শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
দুধ, টক দই বা ছানা শিশুর খাবারে রাখা যেতে পারে।
তবে শিশুকে শুধু চঞ্চলতা কমানোর জন্য বেশি পরিমাণে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। বয়স, শারীরিক প্রয়োজন ও অন্য খাবারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুধ দিতে হবে।
সবুজ শাকসবজি
পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাকসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজিতে ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশ থাকে। এসব খাবার শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।
শুধু একটি সবজি না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি পালাক্রমে খাওয়ানো ভালো। শাক রান্না করে ভাত, ডাল বা মাছের সঙ্গে দেওয়া যেতে পারে।
ব্রকলি বা অন্যান্য সবজি শিশুর পছন্দ অনুযায়ী রান্না করে দেওয়া যায়।
ডিম, মাছ ও চর্বিহীন মাংস
ডিম, মাছ, মুরগির মাংস ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শিশুর বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। ডিমে প্রোটিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে। মাছ থেকেও প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি পাওয়া যায়।
এদেশের শিশুদের খাবারে ইলিশ, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া বা অন্যান্য স্থানীয় মাছ বয়স ও পরিবারের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী রাখা যেতে পারে। চর্বি কম থাকা মুরগির মাংসও ভালো প্রোটিনের উৎস।
প্রোটিন শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের পাশাপাশি মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বার্তাবাহক বা ‘নিউরোট্রান্সমিটার’ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তাই শিশুর প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা জরুরি।
যেসব খাবার কমানো উচিত
অতি চঞ্চল শিশুর খাবারে অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত না দেওয়াই ভালো। এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকতে পারে এবং এগুলো সুষম খাবারের জায়গা দখল করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, শুধু খাবার পরিবর্তন করলেই শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতা কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, নিয়মিত খাবারের সময় এবং পরিবারের ইতিবাচক পরিবেশও শিশুর আচরণ ও মনোযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর অস্থিরতা, মনোযোগের ঘাটতি বা আচরণগত সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং পড়াশোনা, ঘুম, সামাজিক সম্পর্ক বা দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেলে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজন হলে শিশুর আচরণ ও বিকাশ মূল্যায়ন করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর
