০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

ছন্দ সুরেই শিশুর পড়ালেখায় আনন্দ

আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোতে প্রমাণ মিলেছে সুর ছন্দে শেখালে শিশুর পড়ালেখায় আগ্রহ বাড়ে।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2026, 05:20 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

শৈশব মানেই এক অবাধ আনন্দের আঙিনা, কৌতূহল ও বিস্ময়ে ভরা চোখ। তবে সেই শৈশবের দোরগোড়ায় যখন কেবলই অক্ষরে চেনা শুষ্ক পড়ার টেবিল এসে দাঁড়ায়, তখন অনেক শিশুই হারিয়ে ফেলে মনের স্বতঃস্ফূর্ত সতেজতা।

কোমলমতি শিশুদের পড়ালেখায় মনোযোগী করতে এখনও অনেক পরিবার বা পাঠশালায় শাসন, ধমক বা গুরুগম্ভীর এক ভীতিকর দেয়াল গড়ে তোলার প্রাচীন রেওয়াজ চোখে পড়ে।

অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও শিশু মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ বলছে, অক্ষরের এই কঠোর শাসন শিশুর মনের সুপ্ত আলো ডানা মেলার আগেই তা নিভিয়ে দেয়।

এর বিপরীতে সংগীতের ঝংকার, কবিতার ছন্দ আর হালকা শারীরিক নৃত্যের দোলা যেন শিশুর মগজের বদ্ধ দুয়ারে এক পশলা বসন্তের হাওয়া এনে দেয়, যা স্মৃতিকে করে দীর্ঘস্থায়ী ও মেধাকে করে শাণিত।

ভয়ের প্রাচীর ও কুঁকড়ে যাওয়া মন

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড’ পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদী নিউরো-সাইকোলজিক্যাল পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভীতি ও তর্জন-গর্জনের আবহ শিশুর নরম মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ঝড়ের সৃষ্টি করে। ক্রমাগত মানসিক চাপের ফলে শরীরে ‘কোর্টিসল’ নামক হরমোনের বন্যা বয়ে যায়।

‘টক্সিক স্ট্রেস অ্যান্ড ব্রেন আর্কিটেকচার’ নামের এই পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, ক্ষতিকর ‘স্ট্রেস’ বা চাপের হরমোন মস্তিষ্কের মূল স্মৃতি কেন্দ্র ‘হিপোক্যাম্পাস’কে সংকুচিত ও অবশ করে ফেলে।

ফলে ভয়ের কারণে শিশু পড়া সাময়িক মুখস্থ করলেও অবচেতন মন থেকে তার শেখার গভীর তৃষ্ণা চিরতরে হারিয়ে যায়।

সুরের জাদুকরী ‘লুপ’ এবং ‘নর্থওয়েস্টার্ন ল্যাবরেটরি’ সমীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অডিটরি নিউরোসায়েন্স ল্যাবরেটরি’-র প্রধান স্নায়ুবিজ্ঞানী ডা. নিনা ক্রাউস, ভাষার বিকাশ ও সুরের এক গোপন মিতালী আবিষ্কার করেছেন।

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার রিভিউস নিউরোসায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র ‘মিউজিক অ্যান্ড দ্য ব্রেন’-এ যেন এক আলোর দিশা দেখানো হয়েছে।

ডা. ক্রাউসের সেই সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুরা যখন ছড়া বা গণিতের মতো বিষয় সুমধুর গানের সুরে শেখে, তখন তাদের শ্রবণ সংযোগের নিউরনগুলো এক আনন্দের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

সুরের এই জাদুকরী মায়া মগজে ‘ডোপামিন’ নামক প্রশান্তির হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা পড়ার প্রতি শিশুর এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার জন্ম দেয়।

শরীর ও মনের যুগলবন্দী: ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ গবেষণা

শুধু কানে সুরের গান শোনা নয়, এর সঙ্গে যখন ছোট্ট হাতের তালি, পায়ের মৃদু ছন্দ কিংবা নাচের মুদ্রা এসে যোগ দেয়, তখন পড়াশোনা যেন এক উৎসবের রূপ নেয়।

চিকিৎসা সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত ‘রিদমিক মুভমেন্ট অ্যান্ড কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট ইন আর্লি চাইল্ডহুড’ শীর্ষক এক গবেষণায় এর প্রমাণ মিলেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, নৃত্যের তালে তালে পড়ালে শিশুর মস্তিষ্কের ডান ও বাম—উভয় গোলার্ধ একসঙ্গে এক সুরে সুর মেলায়।

এই শারীরিক ও মানসিক যুগলবন্দী একদিকে যেমন শিশুর পেশি সঞ্চালনের ক্ষমতা বা ‘মোটোর স্কিলস’ উন্নত করে, অন্যদিকে তার মনের ক্যানভাসে শব্দার্থ বা ‘ভার্বাল মেমোরি’র ধারণক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্মৃতির গভীরে চিরস্থায়ী আসন: ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল’ পরীক্ষা

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদিত মুখপত্র ‘জার্নাল অফ এডুকেশনাল সাইকোলজি’-তে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ওপর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা চালানো হয়, যার নাম ছিল ‘দ্য ইফেক্টস অব মেলোডি অন ইনফরমেশন রিটেনশন ইন চিলড্রেন’।

এই দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, যেসব শিশুকে সাধারণ শুষ্ক নিয়মে বর্ণমালা বা নামতা তোতাপাখির মতো মুখস্থ করানো হয়েছিল, তাদের চেয়ে যেসব শিশু অ্যানিমেইশন, ছড়া ও গানের ভেলায় চড়ে পড়া শিখেছে, তারা অন্তত ৭০ শতাংশ বেশি তথ্য মনের মণিকোঠায় নিখুঁতভাবে জমিয়ে রাখতে পেরেছে।

সুরের যে নিজস্ব এক সম্মোহনী শক্তি থাকে, তা শিশুর মনে এক চিরস্থায়ী ‘অডিও-ভিজ্যুয়াল লুপ’ তৈরি করে।

আসল বিষয় হল

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম ও শিশু শিক্ষা বিভাগের গবেষক ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ ডা. বারবারা স্যান্ডল্যান্ড সেল্ফ ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, "শৈশবে শিক্ষার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আনন্দ ও কৌতূহল। শিশুদের সহজে পড়া মনে রাখাতে এবং একজন আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে মা-বাবা ও শিক্ষকদের কঠোর শাসন বর্জন করা উচিত।”

বর্ণমালা, সাধারণ জ্ঞান বা নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলো ছোট ছোট ছড়া বা গানের সুরে সাজিয়ে, উৎসবমুখর পরিবেশে উপস্থাপন করাই শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য বিজ্ঞানসম্মত কৌশল।

আরও পড়ুন

দেশি ফলের স্বাদে মিলবে পুষ্টি শিশুর পাতে

শিশুর মানসিক উন্নতিতে যা করণীয়