পানীয়তে ত্বক তাজা
হাতের কাছে থাকা সাধারণ কিছু পানীয় থেকে মিলবে ত্বক স্বাস্থ্যকর রাখার উপাদান।
ত্বকের যত্নে শুধু বাইরে থেকে ক্রিম বা প্রসাধনী ব্যবহার করলেই হয় না, শরীরের ভেতর থেকেও পর্যাপ্ত পুষ্টি ও পানি প্রয়োজন।
সুষম খাবারের পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যকর পানীয় ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে পারে।
গাজর ও বিটের রস
গাজর ও বিটে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন ‘এ’ তৈরিতে সাহায্য করে, যা ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয়।
তবে ফল বা সবজির রসকে ত্বক উজ্জ্বল করার বিশেষ ওষুধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চাইলে অল্প পরিমাণে, যেমন ১৫০ থেকে ২০০ মিলিলিটার, মাঝে মাঝে পান করা যেতে পারে।
সম্ভব হলে রসের বদলে পুরো গাজর ও বিট খাওয়া ভালো, কারণ এতে আঁশও পাওয়া যায়।
গ্রিন টি
পলিফেনল ও ক্যাটেচিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস। এর মধ্যে ‘ইজিসিজি’ অন্যতম। এসব উপাদান শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
চিনি ছাড়া দিনে দুয়েক কাপ গ্রিন টি পান করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত পান করা ঠিক নয়।
খাবারের কিছু সময় আগে বা পরে এই চা পান করলে ভালো। বিশেষ করে যাদের রক্তে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি না গ্রহণ করাই ভালো, কারণ এতে আয়রন শোষণ কিছুটা কমতে পারে।
লেবু-পানি
লেবুতে ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে, যা দেহে কোলাজেন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোলাজেন ত্বকের গঠন ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এক গ্লাস পানিতে অল্প লেবুর রস মিশিয়ে পান করা যেতে পারে। মধু যোগ করা বাধ্যতামূলক নয়। অতিরিক্ত লেবু পানিতে মেশানো উচিত নয়, বিশেষ করে যাদের গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে।
দাঁতের এনামেল রক্ষায় লেবু-পানি পান করার পর সাধারণ পানি দিয়ে মুখ কুলকুচি করা ভালো।
ডাবের পানি
ডাবের পানিতে পটাসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে। গরমে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে এটি উপকারী হতে পারে।
তবে ডাবের পানি সরাসরি ত্বক উজ্জ্বল করে বা বয়সের ছাপ কমায়. এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পরিমিত পরিমাণে পান করা যেতে পারে। যাদের কিডনির সমস্যা রয়েছে বা পটাসিয়াম নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাদের ডাবের পানি পানের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কমলার রস
কমলা ভিটামিন ‘সি’-এর ভালো উৎস। যা কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য আগেই বলা হয়েছে।
তবে কমলার রসের চেয়ে পুরো কমলা খাওয়া বেশি ভালো, কারণ এতে আঁশ পাওয়া যায় এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি কম থাকে। রস পান করলে চিনি না মেশানো এবং পরিমাণে পরিমিত রাখা উচিত।
সয়া দুধ
উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে এই দুধে। সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে এটি খাওয়া যেতে পারে। তবে সয়া দুধ পান করলেই ত্বক উজ্জ্বল বা তারুণ্যময় হয়ে যাবে, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
চিনি ছাড়া বা কম চিনি দেওয়া সয়া দুধ বেছে নেওয়া ভালো। যাদের সয়ায় অ্যালার্জি রয়েছে, তারা এটি এড়িয়ে চলতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ হল পানি পানি
ত্বক সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হল, শরীরে পর্যাপ্ত পানি থাকা। পানির ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ লাগতে পারে।
তবে শুধু বেশি পানি খেলেই ত্বক উজ্জ্বল হয়ে যাবে, এমন নয়। তৃষ্ণা অনুযায়ী পানি পান করা এবং গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম ও ঘামের পর প্রয়োজন অনুযায়ী পানি গ্রহণ করা উচিত।
ত্বক সুস্থ রাখতে আরও যেসব বিষয় খেয়াল রাখতে হয়
কোনও বিশেষ পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জীবনযাপন ঠিক রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সানস্ক্রিন ব্যবহার করা: সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের অকাল বার্ধক্য, বলিরেখা ও কালচে দাগের অন্যতম কারণ। বাইরে যাওয়ার সময় এসপিএফ ত্রিশ বা তার বেশি এবং ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উপকারী। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে।
সুষম খাবার খাওয়া: প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম, বীজ ও পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখা উপকারী। এসব খাবার থেকে ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ ও প্রোটিন পাওয়া যায়।
পর্যাপ্ত ঘুমান: পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের অভাব চোখের নিচে কালচেভাব ও ক্লান্ত চেহারা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ধূমপান ও অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা: ধূমপান ত্বকের ক্ষতি ও অকাল বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারও নিয়মিত খাওয়া উচিত নয়।
ত্বক ভালো রাখার জন্য কোনও একটি বিশেষ পানীয়কে ‘ম্যাজিক ড্রিংক’ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত পানি, সুষম খাবার, নিয়মিত ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা— এই অভ্যাসগুলোই দীর্ঘমেয়াদে ত্বক সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
