রূপচর্চায় নতুন ধারা ‘নিউট্রি-কসমেটিকস’
ত্বক সুন্দর রাখার আসল চাবিকাঠি এবার দেহের ভেতরের পুষ্টিতে।
ত্বক উজ্জ্বল ও লাবণ্যময় রাখতে কত কিছুই তো করা হয়। দামি ফেইশল, নামী ব্র্যান্ডের ডে-নাইট ক্রিম বা রকমারি সেরামের ব্যবহার তো রয়েছেই।
তবে আধুনিক বিউটি ইন্ডাস্ট্রি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরে রূপচর্চার চিরাচরিত ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। প্রসাধন সামগ্রী দিয়ে ত্বকের উপরিভাগ সাজানোর চেয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে ‘ইনসাইড-আউট বিউটি’ বা শরীরকে ভেতর থেকে পুষ্ট করে ত্বক সুন্দর রাখার কৌশল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রূপচর্চার এই নতুন ধারার নাম ‘নিউট্রি-কসমেটিকস’, যা আসলে খাওয়ার উপযোগী প্রসাধন বা বিউটি সাপ্লিমেন্ট।
সুস্থতা-বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ এবং চর্মরোগ বিজ্ঞানী ডা. হাওয়ার্ড মুরাদ ‘নিউট্রাসিউটিক্যালস ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “আমরা ত্বকে যে ধরনের ক্রিম বা সেরাম লাগাই, সেগুলো ত্বকের মাত্র ২০ শতাংশ অংশকে প্রভাবিত করতে পারে। বাকি ৮০ শতাংশ ত্বকের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রতিদিন কী খাচ্ছি, কী পান করছি এবং শরীরে কী ধরনের পুষ্টি বা সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছি তার ওপর।”
সহজ কথায়, দামি ক্রিম দিয়ে ত্বকের বাইরের দাগ ঢাকা সাময়িক সমাধান মাত্র। আসল সৌন্দর্য ও তারুণ্য ধরে রাখতে হলে কোলাজেন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার বা বিউটি পিল ব্যবহারের মাধ্যমে ভেতর থেকে পুষ্টি জোগানোই নিউট্রিকসমেটিকসের মূল চাবিকাঠি।
কোলাজেনের ভূমিকা ও বয়সজনিত পরিবর্তন
নিউট্রিকসমেটিকস দুনিয়ায় প্রচলিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত প্রধান উপাদানটি হল ‘হাইড্রোলাইজড কোলাজেন’।
কোলাজেন হল এক ধরনের বিশেষ প্রোটিন যা ত্বকের গঠন ও ইলাস্টিসিটি বা টানটান ভাব ধরে রাখতে সাহায্য করে।
সুইজারল্যান্ডের গবেষণামূলক ও নিউট্রাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান ‘হোরফ্যাগ রিসার্চ’-এর বিপণন বিভাগের সহ-সভাপতি সেবাস্তিয়ান বোরনেট প্রতিবেদনে বলেন, “বয়স ২০ বছরের কোঠা পার হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছর ‘স্ক্যাল্প’ বা মাথার ত্বক ও চামড়ার নিচে প্রাকৃতিকভাবে কোলাজেন তৈরির হার কমতে শুরু করে। ফলে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে ভাঁজ পড়া, বলিরেখা দেখা দেওয়া এবং চামড়া ঝুলে যাওয়ার মতো বার্ধক্যের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”
এই ঘাটতি পূরণ করতেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন ফর্মুলেশনে ‘ওরাল কোলাজেন’ বা খাওয়ার উপযোগী কোলাজেন পেপটাইড সাপ্লিমেন্টের চল শুরু হয়েছে।
যা বলছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণা
খাওয়ার কোলাজেন সত্যিই ত্বকের জন্য কার্যকর কি না, তা জানতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ক্লিনিকাল ট্রায়াল বা গবেষণা পরিচালনা করেছেন।
এই বছর অগাস্ট মাসে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘ডার্মাটোলজি টাইমস’-এ প্রকাশিত ১,৭২১ জন প্রার্থীর ওপর করা ২৬টি ভিন্ন ‘র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল’ বা ‘আরসিটি’ সমন্বিত মেটা-অ্যানালাইসিসে মজার তথ্য উঠে এসেছে।
আর্দ্রতা বৃদ্ধি: গবেষকদের মতে, নিয়মিত ওরাল কোলাজেন পেপটাইড গ্রহণের ফলে মাত্র ৪ সপ্তাহের মধ্যে ত্বকের শুষ্কতা দূর হয়ে ভেতরের আর্দ্রতা বা ময়েশ্চারাইজিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।।
ত্বকের ইলাস্টিসিটি ও রক্ষাকবচ মজবুত করা: এই গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক ২.৫ থেকে ৫ গ্রাম কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত ১২ সপ্তাহ (৩ মাস) গ্রহণ করলে, ত্বকের ভেতর থেকে ইলাস্টিক বা টানটান করে তোলে এবং বাইরের ধুলোবালি থেকে বাঁচতে ত্বকের নিজস্ব প্রতিরক্ষামূলক স্তরকে শক্তিশালী করে।
বলিরেখা দূর করার বিতর্ক: তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজারচলতি বিজ্ঞাপনে যেভাবে দ্রুত বলিরেখা বা ‘রিঙ্কেলস’ দূর করার দাবি করা হয়, তার শতভাগ নিঁখুত প্রমাণ এখনও মেলেনি।
এজন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং উন্নত ফর্মুলেশনের ওপর আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ভেতরের পুষ্টিতে আর কী কী প্রয়োজন?
নিউট্রিকসমেটিকস বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কোলাজেনই নয়, ইনসাইড-আউট বিউটি রুটিনে আরও কয়েকটি মূল উপাদান থাকা জরুরি।
হায়ালুরোনিক অ্যাসিড: এটি শরীরের ভেতরের কোষে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, ফলে ত্বককে দেখায় সতেজ ও প্রাণবন্ত।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও কোএনজাইম কিউ১০: এগুলো সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি এবং বায়ু দূষণ থেকে তৈরি হওয়া ফ্রি-র্যাডিক্যালের হাত থেকে ত্বকের কোষকে রক্ষা করে।
বায়োটিন ও জিঙ্ক: নখ ভেঙে যাওয়া রোধ করতে এবং চুলের গোড়া শক্ত করে চুল পড়া কমাতে এই দুটি খনিজ উপাদান অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের ধারা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
পুষ্টিবিজ্ঞান-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘নিউট্রি-ইনগ্রিডিয়েন্টস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক রূপচর্চায় এখন ‘গাট-স্কিন অ্যাক্সিস’ বা হজম প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্বকের সুস্থতার সম্পর্ক নিয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে।
পেট ভালো থাকলে ত্বকও ভালো থাকে, তাই বিউটি সাপ্লিমেন্টে এখন প্রোবায়োটিকসও যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের বিউটি সাপ্লিমেন্ট কেনার আগে অবশ্যই পণ্যের গুণগত মান, বিশুদ্ধতা এবং ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট দেখে নেওয়া উচিত।
পাশাপাশি কৃত্রিম সাপ্লিমেন্টের ওপর ১০০ ভাগ নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি যুক্ত টক ফল, সবুজ শাকসবজি, ডিম, সামুদ্রিক মাছ এবং পর্যাপ্ত পানি রাখা উচিত, যা শরীরের প্রাকৃতিক কোলাজেন উৎপাদনকে প্রাকৃতিকভাবেই সচল রাখে।
