ত্বকের যত্নে প্রসাধনী ব্যবহারের নিয়ম
দিন ও রাত হিসেবে ত্বকের নিয়মিত পরিচর্যা ও একটির সঙ্গে অন্যটি মানানসই উপকরণ বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বকের যত্নে ভালো মানের প্রসাধনীর পাশাপাশি ব্যবহারের সঠিক ক্রম জানাও জরুরি।
মুখ পরিষ্কার করার পর কোন উপাদান ব্যবহার করা ভালো, কখন আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্রিম দরকার আর কখন রোদ থেকে সুরক্ষার প্রসাধনী ব্যবহার করতে হবে— এসবের ওপরই নির্ভর করে পরিচর্যার কার্যকারিতা।
ত্বকের যত্নে একের পর এক নানান প্রসাধনী ব্যবহার বা অতিরিক্ত প্রসাধনীর বদলে বরং অল্প উপকরণ সঠিক নিয়মে ব্যবহার ত্বকের জন্য সহায়ক।
বিন্দিয়া এক্সক্লুসিভ বিউটি কেয়ারের প্রধান ও রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচির মতে, “কার্যকর ত্বক পরিচর্যার জন্য অনেকগুলো প্রসাধনী বা তীব্র কার্যকর উপাদান ব্যবহার করা জরুরি নয়। বরং নিয়মিত পরিচর্যা এবং একটির সঙ্গে অন্যটি মানানসই এমন উপকরণ বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।”
“ত্বকের ধরন, প্রসাধনীর গঠন, নির্দেশনা এবং ত্বকের সহনশীলতা বিবেচনায় রেখেই পরিচর্যার ধাপ সাজানো উচিত”, পরামর্শ দেন তিনি।
সকালে ত্বকের যত্নের সঠিক ধাপ
প্রথম ধাপ- মৃদু উপকরণে মুখ পরিষ্কার: ঘুম থেকে ওঠার পর ত্বকে জমে থাকা ঘাম, তেল এবং অন্যান্য ময়লা দূর করতে মুখ পরিষ্কার করা জরুরি। রাতে ঘুমানোর সময় বালিশের সংস্পর্শ, চুলের পরিচর্যায় ব্যবহৃত উপকরণ এবং ত্বকের স্বাভাবিক তেলও মুখে জমতে পারে।
তাই সকালে মৃদু পরিষ্কারক ব্যবহার করলে পরের প্রসাধনী সমানভাবে লাগানো সহজ হয়।
শারমিন কচির মতে, “এমন পরিষ্কারক বেছে নেওয়া ভালো, যা ত্বকের ময়লা দূর করবে, কিন্তু ত্বককে অতিরিক্ত শুষ্ক বা টানটান করে ফেলবে না। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে সুগন্ধিবিহীন ও মৃদু পরিষ্কারক উপযোগী হতে পারে।”
তবে সবার জন্য সকালে মুখ ধোয়ার প্রয়োজন বা ধরন এক রকম নয়। ত্বক খুব শুষ্ক হলে এবং রাতে ত্বকে কোনও ভারী প্রসাধনী ব্যবহার না করলে, নিজের ত্বকের অবস্থা বুঝে পরিষ্কারের পদ্ধতি ঠিক করা যায়।
দ্বিতীয় ধাপ- ত্বক বুঝে ভিটামিন সি: মুখ পরিষ্কার করে আলতোভাবে শুকিয়ে নেওয়ার পর ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই ত্বক বুঝে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান, যা পরিবেশগত কারণে ত্বকে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। আবার নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের অসম রং এবং সূক্ষ্ম রেখার দৃশ্যমানতা কমাতেও অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তবে ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত সব প্রসাধনীর উপাদান বা ঘনত্ব এক নয়। নতুন কোনও প্রসাধনী ব্যবহারের আগে নির্দেশনা জানা এবং সংবেদনশীল ত্বকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয় ধাপ- আর্দ্রতা বাড়ানোর উপকরণ: ভিটামিন ‘সি’ ব্যবহারের পর ত্বকে আর্দ্রতা বাড়ানোর উপকরণ লাগানো যেতে পারে। বিশেষ করে শীতল আবহাওয়া, বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়া এবং ঘরের ভেতর শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের কারণে ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়তে পারে। এতে সূক্ষ্ম রেখা ও ত্বকের অসমান গঠন আরও স্পষ্ট দেখাতে পারে।
এই রূপসজ্জাকরের মতে, “হালকা গঠনের আর্দ্রতা বৃদ্ধিকারী উপকরণ ক্রিমের আগে ব্যবহার করা ভালো। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে, ত্বকের নমনীয়তা ও টানটান-ভাব উন্নত করতে এ ধরনের ক্রিম দরকার। তবে একই উপাদান ব্যবহার করলেই সবার ত্বকে সমান ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।”
চতুর্থ ধাপ- ময়েশ্চারাইজার বা আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্রিম: ত্বকের ওপর আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং সুরক্ষা দেওয়া আবরণকে সহায়তা করতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা ঠিক থাকলে পানি অতিরিক্ত বেরিয়ে যাওয়া কমে এবং ত্বক আরামদায়ক অবস্থায় থাকে। তাই শুধু ত্বক নরম করার জন্য নয়, শুষ্কতা কমাতেও এই ধাপ গুরুত্বপূর্ণ।
শারমিন কচির মতে, “সেরাম ব্যবহারের পর ক্রিম লাগালে ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সুবিধা হয়। সেরাম সাধারণত হালকা গঠনের হয়, আর ক্রিম তুলনামূলক ঘন হতে পারে।”
এই পণ্য ব্যবহারের পর ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী আর্দ্রতা ধরে রাখার সহায়তা পাওয়া যায়।
পঞ্চম ধাপ- সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা
সকালের পরিচর্যার শেষ ধাপ হল, সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষার প্রসাধনী ব্যবহার। দীর্ঘদিন সূর্যের রশ্মির সংস্পর্শে থাকলে ত্বকে দাগ, বলিরেখা এবং কোলাজেনের ক্ষয় দেখা দিতে পারে।
তাই ত্বকের আগাম বার্ধক্যের লক্ষণ প্রতিরোধে নিয়মিত সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সুরক্ষাযুক্ত এবং অন্তত ৩০ মাত্রার সূর্যরশ্মি প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসাধনী বেছে নেওয়া যেতে পারে।
এটি সাজসজ্জার প্রসাধনী ব্যবহারের আগে লাগাতে হবে। বাইরে থাকলে নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর আবার ব্যবহার করতে হবে। কারণ ঘাম, পানি কিংবা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার কারণে সুরক্ষা কমে যেতে পারে।
ষষ্ঠ ধাপ- ঠোঁটের যত্ন: মুখের যত্ন নিতে গিয়ে ঠোঁটের কথা ভুলে গেলে চলবে না। কারণ ঠোঁটের ত্বক সহজেই শুষ্ক হতে পারে। ঠোঁট নরম রাখতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে বিশেষ করে শীতকালে ঠোঁট ফেটে যাওয়া বা শুষ্কতা বেড়ে গেলে সুরক্ষামূল্ক উপকরণ কাজে আসতে পারে।
তবে ঠোঁটে জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করে কিছু ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার বন্ধ করা উচিত এবং বিশেষজ্ঞর পরামর্শ দরকার।
রাতে ত্বকের পরিচর্যা যেভাবে
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ- প্রয়োজন হলে দুবার মুখ পরিষ্কার: সারাদিনের ধুলাবালি, প্রসাধনী ও সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষার উপকরণ দূর করতে রাতে মুখ সঠিকভাবে পরিষ্কার করা জরুরি।
মেইকআপ করলে, পানি প্রতিরোধী বা ওয়াটারপ্রুফ প্রসাধনী ব্যবহার বা দূষিত পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকলে সে ক্ষেত্রে দুই ধাপে মুখ পরিষ্কার করা উপকারী হতে পারে।
প্রথম ধাপে তেল বা জেল গঠনের পরিষ্কারক দিয়ে মেইকআপ, সানস্ক্রিন ও জমে থাকা ময়লা আলগা করা যায়। এরপর মৃদু জেল বা ফেনা তৈরি করে, এমন পরিষ্কারক দিয়ে মুখ ধুয়ে নেওয়া উপকারী।
এক্ষেত্রে মুখ পরিষ্কার হওয়ার পর ত্বক স্বাভাবিক ও আরামদায়ক থাকা উচিত। ধোয়ার পর ত্বক অতিরিক্ত টানটান লাগলে বুঝতে হবে পরিষ্কারকটি ত্বকের স্বাভাবিক তেলও বেশি দূর করে ফেলছে।
তবে সবার জন্য দুবার মুখ পরিষ্কার করা আবশ্যক নয়। একটি মৃদু পরিষ্কারকেই যদি মেইকআপ ও সানস্ক্রিন ভালোভাবে উঠে যায়, তাহলে দ্বিতীয়বার পরিষ্কারের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
তৃতীয় ধাপ- রাতে সূক্ষ্ম রেখা, বলিরেখা ও অসমান গঠনের জন্য যত্ন: রাতের পরিচর্যায় ত্বকের ওপর পরিবেশগত চাপের প্রভাব এবং বয়সের ছাপের দৃশ্যমানতা কমানোর বা ত্বকের সূক্ষ্ম রেখা, বলিরেখা ও অসমান গঠনের জন্য উপকরণ ব্যবহৃত করা উপকারী।
এ ধরনের প্রসাধনী মুখ পরিষ্কারের পর এবং ঘন ক্রিম ব্যবহারের আগে লাগানো যায়। তবে ত্বকের প্রয়োজন, আগে থেকে ব্যবহৃত প্রসাধনী এবং সহনশীলতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো। কারণ একই রাতে একাধিক শক্তিশালী কার্যকর উপাদান ব্যবহার করলে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
আবার গর্ভাবস্থা বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে রেটিনয়েড-সহ কিছু উপকরণ ব্যবহারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পঞ্চম ধাপ- পুষ্টি জোগানো ক্রিম: রাতের পরিচর্যার শেষ ধাপে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। দিনের তুলনায় রাতে কিছুটা ঘন ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে, বিশেষ করে ত্বক শুষ্ক হলে।
আর্দ্রতা ধরে রাখে এমন উপাদানযুক্ত ক্রিম ত্বককে কোমল রাখতে সহায়তা করতে পারে। কারণ শুষ্কতা তৈরি হলে ময়েশ্চারাইজার ত্বকের সুরক্ষামূলক আবরণ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বেশি প্রসাধনী নয়, প্রয়োজন বুঝে সঠিক ব্যবহার
শারমিন কচি বলেন, “ত্বকের পরিচর্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিততা, উপযুক্ত প্রসাধনী নির্বাচন এবং সঠিক ক্রম বজায় রাখা। সাধারণভাবে হালকা গঠনের উপকরণ আগে এবং ঘন ক্রিম পরে ব্যবহার করতে হয়ে।”
তবে সব ত্বকের জন্য একই নিয়ম কার্যকর নয়।
নতুন প্রসাধনী একসঙ্গে অনেকগুলো শুরু না করে একটি করে ব্যবহার করলে ত্বকের প্রতিক্রিয়া বোঝা সহজ হয়। জ্বালা, চুলকানি বা অস্বাভাবিক লালচেভাব দেখা দিলে, প্রসাধনী বন্ধ করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
