Published : 10 Jun 2026, 06:48 PM
ত্বক পরিচর্যার দুনিয়ায় বছরের পর বছর ধরে একটি শব্দ রাজত্ব করে আসছে, আর তা হল ‘অ্যান্টি-এইজিং’ বা বয়স ধরে রাখার প্রসাধনী।
তবে প্রসাধন সামগ্রীর মোড়ক, বিজ্ঞাপন কিংবা রূপচর্চার আলোচনায় এখন এই শব্দের দাপট কমতে শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রসাধানী প্রস্তুতকারকরা এখন ‘অ্যান্টি-এজিং’ শব্দটির বদলে, নতুন ধারা বা ‘বাজওয়ার্ড’ ব্যবহার করছে। আর তা হল ‘লনজেভিটি’ বা দীর্ঘায়ু।
সহজ কথায়, শব্দটির মাধ্যমে ত্বকের স্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদে এবং সামগ্রিকভাবে ভালো রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এই নতুন ধারণা কি সত্যিই ত্বকের বলিরেখা বা ‘ডার্ক স্পট’ দূর করতে ভিন্ন কোনো ভূমিকা রাখে, নাকি এটি কেবলই নতুন মোড়কে পুরানো পণ্য বিক্রির চতুর বাজারজাতকরণ কৌশল?
‘রিয়েলসিম্পল ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের ডার্মাটোলজি বিভাগের সহযোগী ক্লিনিকেল অধ্যাপক মোনা গোহারা এবং নিউইয়র্কের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা এই নতুন ধারার আসল রহস্য ব্যাখ্যা করেছেন।
ত্বক পরিচর্যায় ‘লনজেভিটি’ বলতে যা বোঝায়
এতদিন ‘অ্যান্টি-এইজিং’ বলতে বোঝানো হত, কেবল ত্বকে দৃশ্যমান বয়সের ছাপ, যেমন— বলিরেখা, কালচে দাগ বা চামড়া ঝুলে যাওয়া কমানোর চেষ্টা। এটি মূলত বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করত।
এর বিপরীতে, ‘লঞ্জিভিটি’ হল একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকুলোফেইশল প্লাস্টিক সার্জন রবার্ট শোয়ার্জের মতে, “অ্যান্টি-এজিং শব্দটির মধ্যে এক ধরণের পরাজয়ের সুর আছে। কারণ আপনি এমন কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন যা একদিন আসবেই। এটি পরোক্ষভাবে বার্তা দেয় যে, বৃদ্ধ হওয়া খারাপ আর তরুণ থাকাই ভালো।”
তবে ‘লনজেভিটি’র মূল লক্ষ্য বয়সকে থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক ভেতর থেকে কতটা সুস্থ ও সতেজ থাকছে তা নিশ্চিত করা। এটি কেবল ক্রিমের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার, ঘুম, ব্যায়াম ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান জড়িত।
ত্বক-বিশেষজ্ঞ মোনা গোহারা বলেন, “বিষয়টি অনেকটা শখের বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করার মতো। ত্বকের কাঠামোকে মজবুত করছেন, বাইরের ক্ষতি থেকে বাঁচাচ্ছেন, যাতে এটি দীর্ঘদিন সুন্দর ও শক্ত থাকে।”
এটি কি কেবলই ব্র্যান্ডগুলোর বাজারজাতকরণ কৌশল?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কিছুটা তো মার্কেটিং বা প্রচারণার কৌশল অবশ্যই আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘লনজেভিটি’ শব্দের একটি বড় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, যার সঙ্গে মানুষের আয়ু বা বিপাকীয় কার্যকারিতা জড়িত।
প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারক ব্র্যান্ডগুলো সেই বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতাকে ব্যবহার করে নিজেদের সেরাম বা ক্রিমের গায়ে এই তকমা সেঁটে দিচ্ছে।
তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের গ্রাহকেরা ত্বকের বলিরেখা মুছে ফেলার চেয়ে কীভাবে আগামী কয়েক দশক ধরে সুস্থ ও উজ্জ্বল ত্বক বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে বেশি ভাবছেন।
ফলে রাতারাতি ম্যাজিক খোঁজার চেয়ে তারা নিয়মিত যত্ন ও প্রতিরোধের দিকে ঝুঁকছেন।
নতুন এই ধারা অনুযায়ী ত্বকের যত্ন যেমন হওয়া উচিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, “এই চিন্তাধারার সুফল পেতে, প্রতিদিনের রুটিন পুরোপুরি বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং কিছু মৌলিক বিষয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই যথেষ্ট।
নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার: সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোলাজেন ধ্বংস করে। তাই প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করে ত্বককে সুরক্ষিত রাখা প্রথম শর্ত।
প্রমাণিত উপাদানের ব্যবহার: ত্বককে ভেতর থেকে সুস্থ রাখতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও রেটিনয়েডের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে প্রমাণিত উপাদান ব্যবহার করা উপকারী।
ত্বকের সুরক্ষাকবচ মজবুত করা: ত্বককে অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত প্রসাধনী থেকে বাঁচিয়ে কোমল, হাইড্রেইটিং বা আর্দ্রতা বজায় রাখে এমন পণ্য ব্যবহার করতে হবে।
সুস্থ জীবনধারা: পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ত্বকের দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করা যায়।
‘অ্যান্টি-এইজিং’ থেকে ‘লনজেভিটি’তে রূপান্তর কেবল শব্দের পার্থক্য নয়, এটি ভাবনারও পরিবর্তন ঘটায়। ঘড়ির কাঁটাকে জোর করে থামানোর চেষ্টার চেয়ে, বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে মেনে নিয়ে সুস্থ ও প্রাণবন্ত ত্বক বজায় রাখাই এখনকার আধুনিক ও কার্যকর রূপচর্চা।
আরও পড়ুন
গরমে চুল ও ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক উপাদান