Published : 11 Jul 2026, 02:48 PM
‘ইন্টারন্যাশনালিজম’ বা ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’ পরিভাষাটির ব্যবহার শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। এই ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে ভূমিকা রাখে ১৮৬৪ সালে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (আইডব্লিউএ), যেটি সারা বিশ্বে ‘ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল’ নামে বিশেষ পরিচিত। কার্ল মার্ক্সের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে আয়োজিত আইডব্লিউএ পরবর্তীকালে বিলীন হয়ে গেলেও ‘ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল’ শোষিত শ্রমিকদের মধ্যে ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’ তৈরির প্রথম সমাজতান্ত্রিক প্রচেষ্টা হিসেবে বড় ভূমিকা রাখে এবং সারা বিশ্বে এটি একটি জনপ্রিয় ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
ওই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা শোষিত শ্রমিকদের মধ্যে একধরনের আন্তর্জাতিক ঐক্য তৈরি করা এবং শোষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলা। বর্তমানে একটি রাষ্ট্র কীভাবে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা ও সম্পর্ক স্থাপনে কাজ করে, সেটি ব্যাখ্যার জন্য এই ধারণা ব্যবহার করা হয়—অর্থাৎ যুদ্ধে না জড়িয়েও রাষ্ট্রগুলো কীভাবে তাদের ‘কোর্স অব অ্যাকশনের’ মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের সংহতি ও অদৃশ্য রাজনৈতিক সীমারেখা নির্ণয় করে থাকে। এই ধরনের সম্পৃক্ততামূলক কার্যক্রম পর্যালোচনার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব যে, কোনো রাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের আন্তর্জাতিকতাবাদ ধারণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, কোনো দেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের চর্চা মূলত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিকতাবাদ বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি রাষ্ট্র কোন বলয়ে অবস্থান করছে। বোঝা যায় একটি রাষ্ট্রের বন্ধুত্বের বলয়ে কারা আছে এবং সেটির সীমারেখা কী।
পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত ‘সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ’ (লিগ অব নেশনস) বা ‘জাতিসংঘ’ (ইউনাইটেড নেশনস) সাংগঠনিক আন্তর্জাতিকতাবাদের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একইভাবে ইতিহাসে ‘সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালিজম’, ‘লিবারেল ইন্টারন্যাশনালিজম’ বা ‘প্যান-ইসলামিক ইন্টারন্যাশনালিজম’ প্রতিষ্ঠা হতে দেখা যায়। এই পরিভাষাগুলো দেখেই অনুমান করা যায় এই বলয়ের সীমারেখা কী, যা বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে প্রচলিত আন্তর্জাতিকতাবাদ বলা যাবে না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে জন জি. ওটস আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকদের একটি নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, তা হলো ‘পপুলার ইন্টারন্যাশনালিজম’। তিনি ‘দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে জনমতকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা ও তার সীমাবদ্ধতা’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই ধারণার প্রবর্তন করেন। এই ধারণার মাধ্যমে চলমান বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে আন্তর্জাতিকতাবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আন্তর্জাতিকতাবাদে প্রচলিত আন্তর্জাতিকতাবাদের মতো স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে না, কিন্তু সেটি দুটি বা একাধিক দেশের মধ্যে একধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে ভূমিকা রাখতে পারে। এই আলোচনার গভীরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রচলিত আন্তর্জাতিকতাবাদের বলয় ও সীমারেখা আলোচনা করা যেতে পারে।
শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদ একটি অস্পষ্ট আবরণে মোড়া। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ যেহেতু 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়' এমন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রমূলনীতি দ্বারা পরিচালিত, তাই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের বলয় নির্ণয় অত্যন্ত দুরূহ কাজ। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদ সাংগঠনিক আন্তর্জাতিকতাবাদের কাঠামোতে আবদ্ধ। অর্থাৎ জাতিসংঘ বা ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের কাঠামোয় আন্তর্জাতিকতাবাদের সীমারেখা আটকানো। যে কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের নিজস্ব বলয় ও বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠেনি। তবুও এই অস্পষ্টতার মধ্যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের কয়েকটি উপাদান লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রধানত মানবতাবাদী ও ধর্মীয়—এই দুই উপাদান দ্বারা তাড়িত। বলা যায়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় ঐক্য প্রদর্শন। একই সঙ্গে সেটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ঘটনাভিত্তিক। অর্থাৎ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ স্বপ্রণোদিত হয়ে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ঐকমত্য পোষণ করে ধর্মীয় ও মানবতাবাদী সহানুভূতির প্রকাশের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ পৃথিবীর কোথাও মুসলিম ধর্মের কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা আক্রান্ত হলে সেটিতে প্রতিক্রিয়া দেখানোকে বাংলাদেশ নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে। এছাড়াও আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক আন্তর্জাতিকতাবাদের কিছু ঝোঁক দেখা গেলেও সেটি উল্লেখযোগ্য মাত্রার নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যাপ্তি বেশ বড় হলেও সেটিকে কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক আন্তর্জাতিকতাবাদের বলয়ে ফেলা অত্যন্ত কঠিন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা ‘উদারতাবাদী’ চরিত্রের হলেও সেটির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা শূন্যের কাছাকাছি। সেখানে রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক ‘সারভাইবিলিটি’ বেশি গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ যেখানে বাজার, সেখানে অর্থনীতির সংযোগ করার চেষ্টা। এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের চেয়ে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আলোচ্য ফুটবলকেন্দ্রিক ‘পপুলার আন্তর্জাতিকতাবাদ’ বাংলাদেশের এই প্রচলিত আন্তর্জাতিকতাবাদ থেকে একদমই স্বতন্ত্র। এই আন্তর্জাতিকতাবাদ পপুলার আন্তর্জাতিকতাবাদের পূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বাংলাদেশের এই আন্তর্জাতিকতাবাদ স্বতঃস্ফূর্ত এবং পুরোপুরি রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ। একবিংশ শতাব্দীর আগপর্যন্ত এই আন্তর্জাতিকতাবাদ ছিল একপাক্ষিক। অর্থাৎ শুধুমাত্র ফুটবলের ভালোবাসায় একটি ‘অদৃশ্য সেলুলয়েড সম্প্রদায়ের’ প্রতি তাদের ধর্ম ও রাজনীতি-নিরপেক্ষ আবেগ। এই ‘পপুলার আন্তর্জাতিকতাবাদ’ শুধুমাত্র দেশীয় আবেগ হিসেবে থাকলেও ২০২২ সালে প্রথম এটি আন্তর্জাতিকতাবাদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রচারের মাধ্যমে এই ফুটবল আবেগ আন্তর্জাতিকতাবাদের মুখ লাভ করে। পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই যে, জনগণের এই একান্ত নিজস্ব ফুটবল খেলা উদযাপন বাংলাদেশ এবং লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এই আন্তর্জাতিকতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ফ্যানদের তাদের প্রিয় ফুটবল দলের পতাকা তৈরি, বড় জনসমাগম করে খেলা দেখা, খেলার জয়-পরাজয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো বা বিজয় মিছিল করাসহ নানান জনপ্রিয় উদ্যোগ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সময়ে এই ফুটবল উদযাপন কূটনৈতিক পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। ফলে দেখা যায়, শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নয়, বাংলাদেশে বিরাজমান আরও বেশ কিছু দেশের কূটনীতিকদের বাংলাদেশের ফুটবল উদযাপনকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখা যায়। এটিকে সংবাদমাধ্যমে ‘ফুটবল ডিপ্লোম্যাসি’ বলে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো ডিয়াস ফেরেস বাংলাদেশের মানুষের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা দেখে বলেছেন যে, “ফুটবল কেবলমাত্র কোনো খেলা বা প্রতিযোগিতা নয়; এটি আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক”। একইভাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বলেছেন, ফুটবল বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষকে একত্রিত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করেছে। এছাড়াও মাগুরা জেলার এক কৃষকের ৫.৫ কিলোমিটার লম্বা জার্মান পতাকা তৈরি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সব মিলিয়ে বলা যায় যে, বাংলাদেশের এই ফুটবল উদযাপন ও উন্মাদনা ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিস্তৃতিকে এককথায় ‘বহুজাতিক ফুটবল ফ্যান্ডম’ বলা যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন করা যেতে পারে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের এই ফুটবল ফ্যান্ডম কি শুধুমাত্র সামাজিক খেলোয়াড়ি লেগ্যাসি, নাকি দুই বা একাধিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য? এই প্রশ্নের আংশিক উত্তর পাওয়া যায় বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ (ইমাজিনড কমিউনিটি) তত্ত্বে। অ্যান্ডারসনের ১৯৮০-এর দশকের এই তত্ত্বের মূল কথা সরল ভাষায় বললে অর্থ দাঁড়ায়—একটি সমাজের মানুষ একে অপরকে না দেখলেও তাদের মধ্যে একধরনের কল্পিত ঐক্য থাকে এবং সেটির মাধ্যমে তারা জাতিরাষ্ট্রের মতো একটি কল্পিত সম্প্রদায় গড়ে তোলে। তিনি দাবি করেন যে, 'মুদ্রণ-পুঁজিবাদ'-এর কারণেই 'কল্পিত সম্প্রদায়' গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের এই ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। কারণ তারা কখনো আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড়কে স্বচক্ষে না দেখে বা কোনো দিন আর্জেন্টিনা ভ্রমণ না করেও নিজেদের এই কল্পিত ‘সেলুলয়েড’ সম্প্রদায়ের অংশ মনে করে। অ্যান্ডারসনের তত্ত্বমতে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের এই অদেখা ও অজানা সম্প্রদায়ের প্রতি এই অদৃশ্য টান তারা একে অপরকে 'কল্পিত সম্প্রদায়ের অংশ' ভাবার কারণেই। এতো গেল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে; আবার ‘সফট পাওয়ার’ তত্ত্বের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশের দিক থেকেও এই ফুটবল আবেগকে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ কোনো সামরিক জয় ছাড়াই, শুধুমাত্র ফুটবল নামক ‘সফট পাওয়ার’ দিয়ে এই ফুটবলের ‘সুপার পাওয়াররা’ বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয় জয় করতে পেরেছে, যা পৃথিবীতে অনন্য একটি ঘটনা। এটি বৈশ্বিক সম্প্রীতি তৈরির উল্লেখযোগ্য একটি উদাহরণ; যে সম্প্রীতিতে রাজনীতি বা ধর্মের যোগ নেই।
বাংলাদেশের প্রচলিত আন্তর্জাতিকতাবাদ যেখানে মূলত ধর্মভিত্তিক ও কিছুটা মানবতাবাদী—অর্থাৎ সমধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সহানুভূতির প্রকাশই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য—সেখানে এই নতুন আন্তর্জাতিকতাবাদ পূর্ণমাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষ, যা মূলত ফুটবল আবেগভিত্তিক। তাই বলা যায়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকতাবাদের বলয় বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যময় করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এম. টি. ইসলাম শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]