Published : 10 Jul 2026, 10:36 AM
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দাবি করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল। পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের রায়ের পরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে আইনমন্ত্রী বলেন, আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। এর আগে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি। উল্লেখ্য, বিএনপি সরকারের সময়ই এদেশে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল যা ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে বাতিল করা হয়।”
জুলাই সনদের ১৬ দফায় বলা হয়েছে: “সংবিধান সংশোধন করে অনুচ্ছেদ ৫৮খ সংশোধনপূর্বক সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ দিন পূর্বে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।”
কোন প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে, জুলাই সনদে সেটিও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জুলাই সনদে উল্লিখিত পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়া সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া যাবে না বলে নির্দেশনা রয়েছে জুলাই সনদে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের ভাষায় তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি করা হলেও সনদে এটিও বলা আছে যে, “কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেইমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।” তার মানে সর্বোচ্চ আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল করে যে রায় দিয়েছেন, সেই আলোকে এখন সংসদকে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করতে হবে। ধারণা করা যায়, সংবিধানের পরবর্তী অর্থাৎ অষ্টাদশ সংশোধনীতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করা হবে। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে আরও যেসব বিষয় যুক্ত করা হয়েছিল এবং বাহাত্তরের মূল সংবিধানের চার মূলনীতিসহ (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) যেসব বিধান ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, সেগুলো ভবিষ্যৎ কী, তা এখনও নিশ্চিত নয়। জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাবই সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত। সুতরাং এইসব সংশোধনীও জুলাই সনদের আলোকে গৃহীত হবে কি না, সেটি সংসদের এখতিয়ার। বেশ কিছু বিধান নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে এসব ইস্যুতে সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক হবে—এটিই কাম্য।
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান করা হয় ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে—যে বিধানের আলোকে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০১১ সালে এই বিধানটি বাতিল করে দেওয়ার ফলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে—যে নির্বাচনগুলো দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের কিছুদিন পরে ২০২৪ সালের ১৯ অগাস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি জনস্বার্থে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। সেটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো আপিল বিভাগের রায়ে। যদিও এই রায় পুনর্বিবেচনা বা রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে। সেখানেও যদি রায় বহাল থাকে তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালে কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু এটিও ঠিক যে, সংসদ চাইলে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানে যেকোনো পরিবর্তন আনতে পারে।
পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট পুনর্বহাল এবং সংবিধানে ৭ক ও ৭খ বাতিল। ৭ক দফা যুক্ত করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করলে কিংবা করার উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে সেটিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড। আর ৭খ দফার মাধ্যমে সংবিধানের প্রায় এক তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে ঘোষণা করে এগুলো সংশোধন অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে যদি ৭ক বাতিল করা হয় এবং সংসদ যদি এই আলোকে সংবিধান সংশোধন করে, তাহলে কি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ আবারও উন্মুক্ত হবে? সুতরাং অষ্টাদশ সংশোধনীর সময়ে এসব বিষয়ে সংসদে খোলামেলা আলোচনা হতে হবে।
যেহেতু আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি বাদ দেওয়া হয়, সুতরাং হাইকোর্ট এই সংশোধনী বাতিল করে দিলেও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরবে কি না, সেই প্রশ্নটি শুরু থেকেই ছিল। কারণ হাইকোর্ট কখনো আপিল বিভাগের রায় বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন না। যে কারণে বিষয়টি আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির প্রয়োজন ছিল। দ্বিতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে, সেটি বাতিল করে সর্বোচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছিলেন, গত বছরের নভেম্বরে রিভিউ শুনানি করে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। তার মানে একদিকে ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় পুনর্বহাল, সেইসঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পুনর্বহালের প্রক্রিয়াটি গতিশীল হয়েছে। এখন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংসদকে।
কেননা আদালতের রায় মানতে সংসদ বাধ্য কি না, তা নিয়ে বিতর্ক বেশ পুরোনো। যেমন বিচারপতিদের অপসারণ সম্পর্কিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সর্বোচ্চ আদালত যেদিন রায় দিলেন, তার তিনদিন পরে ২০১৭ সালের ৪ অগাস্ট সিলেটে এক অনুষ্ঠান শেষে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ঘোষণা দিয়েছিলেন: “আদালত যতবার এই সংশোধনী বাতিল করবে, ততবারই সংসদ এটা পাস করবে। করতেই থাকবে।” অর্থমন্ত্রী বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলেন, “দেখি জুডিশিয়ারি কতদূর যেতে পারে।” (দৈনিক যুগান্তর, ৫ অগাস্ট ২০১৮)।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মতো সার্বভৌম নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও বলা হয়নি যে জাতীয় সংসদ সার্বভৌম। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে কয়েকজন বিচারপতি এ নিয়ে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে সংসদ নয়, সার্বভৌম হচ্ছে জনগণ আর সংবিধান। রায়ে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদে কোনো আইন প্রণয়ন করলে তা পর্যালোচনা করে বাতিল করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।
কিন্তু তারপরও এটি মনে করা হয় যে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট ফিরিয়ে আনাসহ অন্যান্য বিষয় সংবিধানে কীভাবে যুক্ত করা হবে, সেই এখতিয়ার সংসদের। তবে বর্তমান সংসদ পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল ইস্যুতে আদালতের রায় যে গ্রহণ করবে, সেটি আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট। কিন্তু এই সংশোধনীতে আরও যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তার অনেক কিছুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে আদালত হয়তো পুরো সংশোধনী বাতিল করেননি। যেমন অতীতেও আদালত যখন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছেন, তখনও ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত করা ‘বিসমিল্লাহ’ বাতিল করেননি। এরশাদের আমলে গৃহীত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল করা হলেও ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত করা রাষ্ট্রধর্মের বিধান বাতিল করা হয়নি। অর্থাৎ আদালত ওই সংশোধনীগুলোর কিছু অংশ বাতিল করেছেন। কিছু অংশ বাতিল না করে সেগুলোর ওপর সিদ্ধান্ত সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এবারও তা-ই হলো। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় হবে, সেটি মোটামুটি ধারণা করাই যায়। কিন্তু সেই সরকারের ফরম্যাট কী হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এই সরকার গঠিত হবে, সেটি জুলাই সনদে উল্লিখিত বিধানের আলোকেই হবে নাকি সংসদ নতুন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করবে, তা এখনই বলা কঠিন।
পরিশেষে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়—এমন যুক্তি দেওয়া হলেও যেহেতু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়নি; যেহেতু একটি দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদের অধীনে নির্বাচন হলে সেটি প্রভাবমুক্ত হওয়া কঠিন এবং সব রাজনৈতিক দল তো বটেই, সাধারণ মানুষও নির্বাচনটি অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে বিশ্বাস করতে চায় না। ফলে যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল করে দেওয়া হয়, তখনই একটি বিরাট রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হলো বলে মনে করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা না হলে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে যে আওয়ামী লীগের পতন হতো না, সেটি অঙ্ক করে দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব।
আমীন আল রশীদ, সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: [email protected]