১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কার্বন বাণিজ্য: জলবায়ু সমাধান, নাকি সবুজ মোড়কে পুরোনো শোষণ?

বাতাস, যা ছিল পৃথিবীর সব প্রাণের অবাধ জন্মগত অধিকার, আজ তা টন হিসেবে বিক্রি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। কিন্তু এই কার্বন বাণিজ্য কি আসলেই জলবায়ু সংকটের কোনো টেকসই সমাধান নাকি সবুজ মোড়কে পুরোনো ঔপনিবেশিক শোষণেরই এক নতুন রূপ?

কার্বন বাণিজ্য: জলবায়ু সমাধান, নাকি সবুজ মোড়কে পুরোনো শোষণ?
সুন্দরবনের বনায়ন প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট বিক্রির চেয়েও জরুরি হলো প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের চিরাচরিত অধিকার রক্ষা ও জীবনযাত্রার দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

বিকাশ চন্দ্র ঘোষ বিকাশ চন্দ্র ঘোষ

Published : 09 Jul 2026, 05:22 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:37 PM

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিক্ষা’ (১৯০৮) সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ‘তপোবন’ প্রবন্ধে প্রাচীন ভারতের এক আশ্চর্য দৃশ্য এঁকেছিলেন —যেখানে ঋষি ও তাদের শিষ্যরা অরণ্যের গভীরে বসবাস করতেন, আর বন ছিল তাদের কাছে ভয়ের বা জয়ের বস্তু নয়, বরং লালনকারী প্রতিপালক। তিনি লিখেছিলেন, “বিরাট প্রকৃতির মাঝখানে যেখানে যার স্বাভাবিক স্থান সেখানে তাকে স্থাপন করে দেখলে তার অত্যুগ্রতা থাকে না।” অর্থাৎ মানুষ যখন নিজেকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু নিজের প্রয়োজনের চোখে দেখে, তখনই সংকট শুরু হয়। সোয়াশো বছর পরে আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এই কথাটি অদ্ভুত রকম প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ আমরা প্রকৃতির সঙ্গে সেই স্বাভাবিক সম্পর্কের বন্ধনকেও শেষ পর্যন্ত কর্পোরেট হিসাবের খাতায় নামিয়ে এনেছি। বাতাস, যা ছিল পৃথিবীর সব প্রাণের অবাধ ও জন্মগত অধিকার, তার একটি অংশ—কার্বন নিঃসরণের অধিকার—আজ টন হিসেবে বিক্রি হচ্ছে লন্ডন, জেনিভা ও সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক বাজারে। এই বিচিত্র বাস্তবতার নামই কার্বন বাণিজ্য।

এই ব্যবস্থার শুরু খুব বেশি দিন আগের নয়। ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে ‘কিয়োটো প্রটোকল’ গ্রহণের মাধ্যমে কার্বন বাণিজ্য প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। উন্নত দেশগুলোর জন্য নিঃসরণ কমানোর আইনি বাধ্যবাধকতা ঠিক করা হয়, আর সেই লক্ষ্য পূরণের একটি বাজারভিত্তিক উপায় হিসেবে কার্বন ক্রয়-বিক্রয়কে অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজস্ব ‘এমিশন ট্রেডিং সিস্টেম’ চালু করে একে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রূপ দেয়। তখন থেকেই বাতাসে গ্যাস ছাড়ার অধিকার একটি বৈধ আর্থিক সম্পদে পরিণত হয়।

রবীন্দ্রনাথের সেই তপোবনের ছবি বুঝতে হলে অর্থনৈতিক তত্ত্বের ইতিহাসে ফিরে তাকাতে হবে। অর্থনীতিবিদ কার্ল পোলান্যি তার ১৯৪৪ সালের গ্রন্থ ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন’-এ দেখিয়েছিলেন, আধুনিক বাজার অর্থনীতি কীভাবে জমি, শ্রম ও মুদ্রাকে—যেগুলো আসলে বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসেবে সৃষ্ট হয়নি—কৃত্রিম পণ্যে পরিণত করেছে। আজ আমরা সেই তালিকায় এক অভাবনীয় সংযোজন দেখছি—আমাদের বায়ুমণ্ডল। রবীন্দ্রনাথের তপোবনে প্রকৃতি ছিল মানুষের ‘স্বাভাবিক স্থান’; আজকের বাজারে সেই একই প্রকৃতি হয়ে উঠেছে বিচ্ছিন্ন, পরিমাপযোগ্য, বিক্রয়যোগ্য এক পণ্য।

কার্বন বাণিজ্য সাধারণত দুই ধরনের হয়। প্রথমটি ‘কমপ্লায়েন্স মার্কেট’ বা বাধ্যতামূলক বাজার—সরকার বা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ আইন করে একটি কারখানার জন্য নিঃসরণের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেয়। ধরা যাক, কোনো ইস্পাত কারখানার বার্ষিক সীমা ১০ হাজার টন কার্বন, কিন্তু সে প্রযুক্তি উন্নত করে মাত্র ৭ হাজার টন ছেড়েছে—বাকি ৩ হাজার টনের অনুমতিপত্র সে বাজারে বিক্রি করতে পারে অন্য কোনো কারখানার কাছে, যে নিজের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি ‘ভলান্টারি মার্কেট’ বা স্বেচ্ছামূলক বাজার—এখানে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, কোনো বিমান সংস্থা বা প্রযুক্তি কোম্পানি নিজেকে ‘কার্বন নিরপেক্ষ’ দেখাতে বনায়ন বা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে টাকা ঢেলে তার নিঃসরণের ‘অফসেট’ দাবি করে। দুই ক্ষেত্রেই দর্শন একই—কার্বনের একটা দাম বেঁধে দিয়ে তাকে বাজারের প্রতিযোগিতার হাতে ছেড়ে দেওয়া।

এই বাজার-নির্ভর সমাধানের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড কোজের ১৯৬০ সালের প্রভাবশালী প্রবন্ধ ‘দ্য প্রবলেম অব সোশ্যাল কস্ট’ থেকে। কোজ দেখিয়েছিলেন, সম্পত্তির অধিকার স্পষ্ট থাকলে এবং লেনদেনের খরচ কম হলে বাজার নিজেই দূষণের মতো সমস্যার দক্ষ সমাধান বের করতে পারে। কিন্তু এই তত্ত্ব একটা শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে—বাজারের সব পক্ষের দরকষাকষির ক্ষমতা মোটামুটি সমান হতে হবে, যা বাস্তবে প্রায় কোথাও পূরণ হয় না। লেখক নাওমি ক্লেইন তার ২০১৪ সালের গ্রন্থ ‘দিস চেঞ্জেস এভরিথিং’-এ দেখিয়েছেন, জলবায়ু সংকট আসলে পুঁজিবাদেরই কাঠামোগত সংকট, আর বাজার-নির্ভর এই সমাধানগুলো প্রায়ই সেই একই কাঠামোকে আরও শক্ত করে তোলে।

এই অসমতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের হিসাব দেখলে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বায়ুমণ্ডলে জমে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাসের সিংহভাগের দায় হাতে গোনা কিছু ধনী, শিল্পোন্নত দেশের। অথচ আজ এই বাজারের সুযোগে সেই দেশ ও তাদের কোম্পানিগুলো নিজেদের কারখানায় বড় কোনো পরিবর্তন না এনে, গরিব দেশের বন বা জলাভূমি থেকে সস্তায় কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেদের দায়মুক্তির সনদ জোগাড় করছে। অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি তার ২০১৩ সালের গ্রন্থ ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’-তে যে কথা বলেছিলেন—পুঁজি বেশি কেন্দ্রীভূত হলে তার ঝুঁকিও সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাঁধে গিয়ে পড়ে—কার্বন বাজার যেন তারই নতুন সংস্করণ। একসময় শোষণের পণ্য ছিল মসলা, নীল বা তুলা; আজ পণ্য হয়ে উঠেছে মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারই। একেই বলা হয় ‘সবুজ উপনিবেশবাদ’—পুরোনো ঔপনিবেশিক শোষণেরই একটি নতুন, পরিবেশবান্ধব মোড়কে মোড়ানো রূপ।

বাংলাদেশের জন্য কার্বন বাণিজ্য এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; বরং জলবায়ু নীতি, অর্থায়ন ও বাস্তব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দেশে কার্বন বাণিজ্যের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে, যখন সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকল সোলার হোম সিস্টেম ও উন্নত চুলা প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা আয় করেছিল। কিন্তু ২০২০ সালে কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সেই ধারা থেমে যায়। ২০২৪ সালে প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল-৬ অনুমোদনের পর কার্বন বাণিজ্যের সুযোগ নতুন করে ফিরে আসে। সরকার গত বছর গঠন করেছে ‘ডেজিগনেটেড ন্যাশনাল অথরিটি’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ, যা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্বন প্রকল্প অনুমোদনের কাজ দেখছে। এই কাঠামো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে দাঁড়ায়নি—কার্বন ট্রেডিং ফ্রেমওয়ার্ক এখনো চূড়ান্তকরণের পথে, আর জাতীয় কার্বন নিবন্ধন পদ্ধতি তৈরিতে বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে ২৪ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে—অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানি, আর জাপানের মিৎসুই ও সুমিতোমোর মতো বড় নাম বনায়ন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। যেমন কৃষি খাতে ধানখেতে পানি ব্যবস্থাপনা বদলে মিথেন গ্যাস কমানোর প্রকল্প, উপকূলীয় এলাকায় নতুন ম্যানগ্রোভ বনায়ন, আর সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থেকে কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনার কথাও একটি সাম্প্রতিক সরকারি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সরকার চাইছে জাতীয় জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক অংশ এই কার্বন বাণিজ্য থেকেই পূরণ করতে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন প্রস্তুতি ও কাঠামো নির্মাণের পর্যায়ে আছে—বড় আকারে বাণিজ্যিক লেনদেন এখনো শুরু হয়নি, কিন্তু নীতি ও বিনিয়োগ দুটোই দ্রুত এগোচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ১৯৯৯ সালের গ্রন্থ ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’-এর যুক্তিটা খুব প্রাসঙ্গিক—উন্নয়ন মানে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়ানো। সেই আলোয় দেখলে জলবায়ু সংকট নিছক পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানুষের মৌলিক সক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। বরেন্দ্র অঞ্চলের একজন কৃষক যখন পানির স্তর নেমে যাওয়ায় আরও গভীরে নলকূপ বসাতে বাধ্য হন, কিংবা কক্সবাজারের একজন জেলে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ বেড়ে যাওয়ায় তার চিরচেনা মাছ ধরার জায়গা হারান, তখন তাদের সেই কষ্টের সঙ্গে লন্ডন বা জেনিভার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আলোচনা কক্ষের দূরত্ব অনেক বেশি মনে হয়।

এই দূরত্ব কমানোর একটা পথ দেখিয়েছিলেন অর্থনীতিবিদ এলিনর অস্ট্রম। তার ১৯৯০ সালের গ্রন্থ ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’-এ তিনি দেখিয়েছিলেন, সর্বজনীন প্রাকৃতিক সম্পদের সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থাপনা তখনই হয়, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে স্থানীয় মানুষের হাতে, কোনো দূরের কর্তৃপক্ষের হাতে নয়। বাংলাদেশের কার্বন প্রকল্পগুলোতে এই শিক্ষা মাথায় রাখা জরুরি। সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন বা চরাঞ্চলের বনায়ন প্রকল্প যখন বিদেশি কার্বন ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেই জমিতে স্থানীয় মানুষের চিরকালের অধিকার যেন আইনি জটিলতায় হারিয়ে না যায়। নইলে সবুজ উপনিবেশবাদ শুধু তত্ত্ব থেকে বাস্তবে নেমে আসবে—পরিবেশের নামে স্থানীয় বাওয়ালী বা জেলেদের উচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর সঙ্গে আছে আরেকটি বাস্তব সমস্যা—একটা গাছ বা জলাভূমি ঠিক কতটা কার্বন ধরে রাখছে, তা নিখুঁতভাবে মাপা এখনো বিজ্ঞানের পক্ষে কঠিন। এই অনিশ্চয়তার সুযোগে বিশ্বজুড়ে অনেক প্রকল্প এমন দাবি করে, যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল—একে বলা হয় ‘ফ্যান্টম ক্রেডিট’। এই দুর্বল ক্রেডিট কিনে অনেক বড় কোম্পানি কাগজে-কলমে নিজেদের ‘কার্বন নিরপেক্ষ’ ঘোষণা দেয়, অথচ বাস্তবে তাদের নিঃসরণ একই থেকে যায়—একেই বলে ‘গ্রিনওয়াশিং’।

তবে এই সমস্যাগুলোর মানে এই নয় যে কার্বন বাজারকে পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস তার ২০১২ সালের গ্রন্থ ‘দ্য প্রাইস অব ইনইকুয়ালিটি’-তে দেখিয়েছেন, বাজার নিজে ভালো বা মন্দ নয়—তার ফলাফল নির্ভর করে কোন নিয়মে সেটা চলছে তার ওপর। ধনী দেশের জন্য কঠোর নিঃসরণ-সীমা, স্থানীয় মানুষের পূর্ণ সম্মতি ও মালিকানা, আর স্বচ্ছ নিরীক্ষা ব্যবস্থা থাকলে কার্বন বাজার জলবায়ু সংকট মোকাবিলার একটা সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে—তবে প্রধান সমাধান কখনোই নয়। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য তাই তিনটি কাজ স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রথমত, কার্বন বাজার থেকে পাওয়া অর্থকে কখনো উন্নত দেশের কাছ থেকে পাওনা জলবায়ু-ক্ষতিপূরণের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না—দুটো একেবারে আলাদা বিষয়। দ্বিতীয়ত, কোনো কার্বন প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্থানীয় মানুষের সম্মতি বাধ্যতামূলক করতে হবে, আর প্রকল্পের আয়ের বড় অংশ যেন তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়নেই খরচ হয়। তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা প্রতিটি প্রকল্পের প্রকৃত সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করবে। সৌরশক্তি চালিত সেচ পাম্প হোক বা উপকূলীয় বনায়ন—যেকোনো প্রকল্পের সাফল্যের আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রার দৃশ্যমান উন্নতি, কোনো দূরের হিসাবের খাতায় জমে ওঠা টন-সংখ্যা নয়।

শেষ পর্যন্ত পুরো বিতর্কটা একটা সহজ প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়—আমরা কি বায়ুমণ্ডলকে সত্যিকারের একটা সর্বজনীন সম্পদ হিসেবে রক্ষা করব, নাকি একে আরেকটা পণ্যে পরিণত করে পুরোনো বৈষম্যকেই নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনব? জলবায়ু সংকট কোনো গাণিতিক সমস্যা নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। এর টেকসই সমাধান বাজারের চতুর হিসাবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আর ন্যায্যতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতিতে নিহিত। রবীন্দ্রনাথ তপোবনে যে ছবি এঁকেছিলেন—মানুষ আর প্রকৃতি যেখানে একে অপরের স্বাভাবিক স্থানে থেকে সহাবস্থান করে—তা আজও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বায়ুমণ্ডলকে বাজারের পণ্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের দায়িত্ব ও বিবেকের আয়না হিসেবে দেখতে শিখলেই সেই তপোবনের কাছাকাছি ফেরা সম্ভব। সেই শেখাই ঠিক করে দেবে, কার্বন ট্রেডিং মানুষের জন্য সত্যিকারের জলবায়ু সমাধান বয়ে আনবে, নাকি কেবল বৈষম্যের আরেকটি মার্জিত আখ্যান হয়ে থেকে যাবে।

বিকাশ চন্দ্র ঘোষ সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: bikasheco@pust.ac.bd