Published : 08 Jul 2026, 10:07 AM
শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশ আজ অদ্ভুত এক দোলাচলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পদোন্নতি কিংবা এমপিও নীতিমালা নিয়ে যেমন নিয়মিত আন্দোলনের ঢেউ ওঠে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা নানা দাবিতে অবরোধ, মানববন্ধন বা ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসছে। এই রকম আন্দোলন-নির্ভরতা দিয়ে কি সত্যিই শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের দগদগে দুর্বলতাগুলো শিক্ষাকে গভীর সংকটে ফেলে দিচ্ছে?
বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের জন্মদানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র-শিক্ষকদের যৌথ আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এ দেশের ছাত্র ও শিক্ষকদের বছরের একটি বড় সময় রাজপথে কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। আপনি যদি ইন্টারনেটভিত্তিক সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে ‘শিক্ষক আন্দোলন’ কিংবা ‘ছাত্র আন্দোলন’—এই দুটি শব্দ দিয়ে সার্চ দেন, দেখবেন সেখানে কয়েক ডজন পাতা বের হবে, যেখানে শুধু শিক্ষকদের আন্দোলনের খবরই একটার পর একটা আসছে। একইভাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকেন্দ্রিক বিষয়গুলোও আপনি পাবেন। কখনো স্থায়ী চাকরির দাবিতে, কখনো এমপিওভুক্ত করার জন্য, আবার কখনো চাকরিচ্যুতদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনের খবর বছর জুড়েই চলছে। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকদের নানা দাবিদাওয়া নিয়ে এমন আন্দোলন বিশ্বের আর কয়টি সভ্য দেশে হয় তা আমি সত্যি জানি না। তবে আমাদের দেশে শিক্ষকদের ক্লাসের পরিবর্তে বারবার রাজপথে থাকার কারণে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষকদের রাজপথে নিয়ে আসার কারণে এই পেশার প্রতি সাধারণ মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ ক্রমশ কমতে শুরু করেছে।
দেখুন, শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া। শিক্ষার মূল উপাদান মূলত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই চার উপাদানের কেউ আক্রান্ত হলে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়। যে দেশগুলো শিক্ষায় এগিয়ে গিয়েছে, তারা মূলত দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার আন্দোলনের চক্রে আটকে পড়ে। একটি নতুন নীতিমালা প্রকাশ হলেই যেমন শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে, তেমনই শাসকগোষ্ঠী শিক্ষার মূল সমস্যায় হাত না দিয়ে বছরের পর বছর ধরে সমস্যাগুলো জিয়েই রাখে। ফলশ্রুতিতে, ক্লাস বন্ধ ও পরীক্ষা স্থগিত রেখে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি এক প্রকার অলিখিত দলিল হয়ে গিয়েছে। এর ফলে শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও গভীর হতাশা দেখা দিচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে আমরা এমন দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি—রাজপথ, মাইক, মানববন্ধন আর আশ্বাসনির্ভর সমাধান। কিন্তু এই ক্রমাগত আন্দোলন-নির্ভরতা আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি এভাবে শিক্ষার মান উন্নয়নের পথে এগোচ্ছি, নাকি আরও অনিশ্চয়তার জালে জড়িয়ে পড়ছি? চলুন, এইসব নিয়ে আলোচনা করা যাক।
শিক্ষায় কেন এই কৃত্রিম সংকট?
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হলে একেকটি নতুন শিক্ষাক্রম আসে, নতুন শিক্ষার নীতিমালা আসে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বুঝুক বা না বুঝুক, অধিকাংশ শিক্ষানীতিই প্রণীত হয় রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণ করে, বাস্তব চাহিদা বা গবেষণার আলোকে কোনো আলোচনা হয় না। ফলশ্রুতিতে, প্রতিটি পরিবর্তনই হয় ‘অস্থায়ী সমাধান’। এই ধরুন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হওয়া নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রমের কথা, যেখানে পরীক্ষার চাপ কমিয়ে সৃজনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু যথাযথ পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফলাফল, শিক্ষকরা হলেন বিভ্রান্ত, অভিভাবকরা হতাশ হয়ে রাস্তায় নামলেন আর শিক্ষার্থীরা থাকল মানসিক চাপে। আর এইভাবে শিক্ষার সংকটের শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে বাতিলে।
অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে থাকছে না; সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি, এমনকি একাডেমিক সিদ্ধান্তেও দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিবেচনা ঢুকে পড়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহি নেই। শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন ও ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতা–সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা হারিয়ে গেছে। ফলে শিক্ষকরা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছেন না, প্রশাসন সমস্যার সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক সমন্বয়ে ব্যস্ত। এর ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নের কাজটি পড়ে গেছে দ্বিতীয় সারিতে।
শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন নিয়ে প্রশ্ন
একটা সময় শিক্ষকতা ছিল সমাজের চোখে সবচেয়ে বড় সম্মানের প্রতীক। এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিম্ন বেতন ও অনিশ্চয়তার পেশায়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অধিকাংশ শিক্ষকের কেউই বর্তমান বেতন কাঠামো নিয়ে যেমন সন্তুষ্ট নন, তেমনি শিক্ষকদের মর্যাদার ব্যাপারে সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এই পেশাটিকে ক্রমশ ‘অবহেলার পেশা’য় পরিণত করছে।
একজন শিক্ষককে সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে হলে তার মৌলিক বেতন কাঠামো অন্যান্য সব পেশার চেয়ে বেশি হওয়া উচিত। কারণ এ দেশের কাঠামোর সবচেয়ে বড় ভিত্তি এই শিক্ষকদের কাঁধে থাকে। কিন্তু একজন শিক্ষক যখন তার বেতন দিয়ে সংসার চালাতে পারছেন না, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এমন লজ্জাজনকভাবে করা হয়, যা বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। ফলে আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত শিক্ষার প্রতিফলন ক্লাস বা পরীক্ষায় মিলছে না। এই যে ধরুন, সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের কথা, কয়েক মাস পর পর শিক্ষকদের রাজপথে আসা শিক্ষাক্ষেত্রের গভীর অচলাবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা পড়ছে। তারা বছরের পর বছর ধরে ন্যায্য বেতন কাঠামো ও পদোন্নতির সুযোগ চেয়ে আসছেন। শেষ পর্যন্ত দাবি আদায়ের উপায় হিসেবে রাজপথে নামতেই হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময় তারা কেবল প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে লবডঙ্কাই থেকে গিয়েছে। আমাদের শিক্ষানীতিতে শিক্ষককে ‘মানবসম্পদ’ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তাকে ‘জ্ঞানসৃষ্টির চালিকাশক্তি’ হিসেবে দেখা হয় না। ফলে শিক্ষকেরা রাষ্ট্রীয় নীতির প্রান্তিক ভুক্তভোগী হয়ে আন্দোলনকেই তাদের একমাত্র অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব
বাংলাদেশে শিক্ষা কাঠামোয় সবচেয়ে বড় যে অভাবটি আমরা দেখতে পাই তা হলো, ‘পরিকল্পনা’। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন থাকবে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক উন্নয়নের কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার কিংবা নীতিমালা থাকা উচিত। কিন্তু আপনি যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, আমাদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবিদেরা একটি মানসম্মত টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন। ফলশ্রুতিতে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ‘শিক্ষার অধিকার’ পূরণের মৌলিক অনুষঙ্গ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের ভিতর এক অদ্ভুত মানসিকতা গড়ে উঠেছে যে, ‘আন্দোলন না করলে কিছুই পাওয়া যায় না।’ প্রশাসনও যেন এই সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। দাবি না উঠলে পদক্ষেপ নেই; দাবি উঠলেই কিছু আশ্বাস আসবে, আন্দোলন থামবে। যার কারণে, শিক্ষার্থী হারাচ্ছে তার মূল্যবান সময়, শ্রেণিকক্ষ হারাচ্ছে মনোযোগ, আর শিক্ষা তার মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা না থাকার ফলে দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুলছে। শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিনির্মাণে বিনিয়োগ, এই কথাটি আমাদের শাসকগোষ্ঠি ভুলে যায়। কেউ কেউ আবার শিক্ষার এই মৌলিক উপাদানগুলোকে টার্গেট করে নগ্ন রাজনীতিতে মাতে। যার কারণে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা লেগে থাকে। শিক্ষার যেসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে আলোকপাত হচ্ছে তার মধ্যে বেতন-ভাতায় সামঞ্জস্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—সেটা হতে পারে শিক্ষক রাজনীতি কিংবা ছাত্র রাজনীতি। এই মূল বিষয়গুলোকে সমাধান করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা না হলে শিক্ষায় আপাতত মুক্তি নেই। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে চাই সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং মাননির্ভর বিনিয়োগ।
শিক্ষকদের শ্রেণিবৈষম্য
উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি মৌলিক বেতন কাঠামো থাকে, যে বেতন কাঠামো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। এমনকি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের যে মর্যাদা, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং কিছুটা বেশি। কারণ, তারা মনে করে, একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিকে যদি সঠিক শিক্ষাটুকু না পায়, তাহলে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন যেমন করতে পারবে না, তেমনি দেশ গঠনে সক্রিয় ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ফলে গুরুত্বের বিবেচনায় শিক্ষকদের মর্যাদা সমান। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো থেকে শুরু করে নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থায় কোনো মিল নেই। সরকারি স্কুলের একজন শিক্ষকের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার কোনো মিল নেই। ফলে স্কুল-কলেজে বছরের পর বছর শিক্ষাদান করার পরও বেতন হয় না এবং সেই এমপিওভুক্ত করার তাগিদে রাজপথকে বেছে নিতে হচ্ছে। কিন্তু কেন এমন পরিস্থিতিতে যেতে হবে, তা নিয়ে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ কিংবা যৌক্তিক আলোচনা নেই।
সমাধানের পথ কী
আন্দোলন গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু শিক্ষা গণতন্ত্রের চেয়েও বড় অনুষঙ্গ, যার বিকাশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। এখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেটি সমাধান হবে যুক্তি ও সংলাপের মাধ্যমে। শিক্ষক, প্রশাসন, শিক্ষার্থী ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার সম্পর্ক তৈরি না হলে শিক্ষাক্ষেত্র কখনো স্থিতিশীল হতে পারে না। শিক্ষকদের সমস্যাগুলো কী, তা বুঝবার জন্য শিক্ষকদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং শিক্ষামন্ত্রণালয় যদি শিক্ষকদের বিভিন্ন সময়ে দাবিদাওয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে দেখা যাবে, শিক্ষকরা আন্দোলনে নামছেন মূলত নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য। সেই সব দাবি-দাওয়ার শীর্ষে থাকে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষকদের মর্যাদা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে, শিক্ষামন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রয়োজনে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করতে পারে। এই সংলাপে সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় নেতাদের প্রতিনিধি যেমন থাকবেন, তেমনই শিক্ষাবিদেরাও থাকবেন। সবার উপস্থিতিতে একটি ইউনিফাইড মৌলিক বেতন কাঠামো তৈরি করা উচিত, যেখানে শিক্ষকদের মধ্যে বেতনবৈষম্য থাকবে না।
অনেক সময় দেখা যায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করার আগেই শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের বছরের পর বছর শিক্ষাশ্রম শোষণ করা হচ্ছে। সরকারের এমন একটি নীতিমালা থাকা উচিত, যেখানে এমপিওভুক্তি বা শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অনুমতি ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষক নিয়োগ করতে পারবে না। এমনকি শিক্ষক নিয়োগ দিলে, বেতনবিহীন কাউকে রাখা যাবে না। যদি কেউ বেতনহীন থাকার অভিযোগ করে, তাহলে সেই সব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করার মতো কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।
শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত বেতন ও অন্যান্য সুবিধা কাঠামো করা যায়, তাহলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামের সংস্কৃতি বন্ধের নীতিমালাও করা যাবে। ক্লাস ও পরীক্ষা চালু রেখেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের নীতিমালা করতে হবে, যাতে করে শিক্ষার পথযাত্রা থমকে না যায়।
শিক্ষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষককে শুধু বেতনভুক্ত কর্মচারী নয়, বরং জ্ঞানের নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। আর শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, বরং চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক বোধে সমৃদ্ধ করতে হবে। শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা ও সমাজ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা আরও সক্রিয় করতে হবে। তারা যেন কেবল বেতন-ভাতার দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রমের দিকনির্দেশনা ও জ্ঞানসৃষ্টির সংস্কারে নেতৃত্ব দেন।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]