Published : 07 Jul 2026, 02:21 PM
ঢাকার দেয়ালে একসময় হঠাৎ করেই দেখা দিত একজন মানুষ। নাম তার সুবোধ। পাশে লেখা থাকত ‘হবেকি?’
কে এঁকেছে, কেন এঁকেছে, আবার কোথায় আঁকবে—কেউ জানত না। ওই না-জানাটাই ছিল শিল্পের একটি অংশ। হয়তো ছবিগুলো যতটা শক্তিশালী ছিল, তার চেয়েও শক্তিশালী ছিল তাদের অনিশ্চয়তা। মানুষ ছবির সামনে দাঁড়াত, ছবি তুলত, বন্ধুদের দেখাত, নিজের মতো করে অর্থ খুঁজত। সংবাদমাধ্যমও লিখত, কিন্তু তখন খবরের বিষয় ছিল ছবি, শিল্পী নয়।
আজ দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নতুন কোনো ‘হবেকি?’ গ্রাফিতির দেখা পেলে তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ হয়ে যায়। কোথায় আঁকা হয়েছে, কী বোঝাতে চেয়েছে, আগের ছবির সঙ্গে সম্পর্ক কী, শিল্পী কে হতে পারেন—সবকিছু নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়। সম্প্রতি ভারতের সিকিমে দেখা পাওয়া গ্রাফিতির সুবোধও তার ব্যতিক্রম নয়। ছবিটি প্রকাশ পাওয়ার পর শিল্পকর্মের চেয়ে যেন তার উপস্থিতিই বড় খবর হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এতে কি আসলেই ‘সুবোধ’-এর লাভ হচ্ছে?
স্ট্রিট আর্টের ইতিহাস বলছে, এই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অনিশ্চয়তা। এটি গ্যালারির শিল্প নয়, যেখানে উদ্বোধন হবে, প্রেস বিজ্ঞপ্তি যাবে, তারপর দর্শক আসবে। স্ট্রিট আর্ট নিজেই দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়—হঠাৎ করে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই। এই আকস্মিকতাই তার নন্দনতত্ত্বের অংশ।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত স্ট্রিট আর্টিস্টদের একজন ব্যাঙ্কসিকে ঘিরে রহস্য আজও টিকে আছে। কারণ, তার প্রতিটি নতুন কাজকে শিল্প হিসেবেই বেশি দেখা হয়েছে, শিল্পীকে সেলিব্রিটি বানানোর প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়। সংবাদমাধ্যম অবশ্যই তার কাজ নিয়ে লিখেছে, কিন্তু ওই লেখার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিল্পকর্মের সামাজিক বা রাজনৈতিক ভাষ্য; শিল্পীর ব্যক্তিত্বকে ঘিরে এক ধরনের ব্র্যান্ড নির্মাণ নয়।
বাংলাদেশে আমরা যেন একটু ভিন্ন পথে হাঁটছি। ‘সুবোধ’ ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হয়েছে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু আইকন আর ব্র্যান্ড এক জিনিস নয়। যখন প্রতিটি নতুন কাজের আগেই আমরা শিল্পীকে উদযাপন করতে শুরু করি, তখন শিল্পকর্মের সঙ্গে দর্শকের যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা, সেটি ক্ষীণ হয়ে আসে। মানুষ ছবি দেখার আগে খবর পড়ে, ব্যাখ্যা শোনে, অর্থ গ্রহণ করে। ফলে নিজের ব্যাখ্যা তৈরির সুযোগ কমে যায়।
এর আরেকটি বিপদও আছে। রহস্য যদি অতিরিক্তভাবে প্রচারিত হয়, একসময় সেটি আর রহস্য থাকে না; সেটি হয়ে যায় বিপণনের কৌশল। তখন ‘হবেকি?’ আর একটি প্রশ্ন নয়, বরং একটি লোগো হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে। পাঠক অপেক্ষা করেন নতুন শিল্পকর্মের জন্য নয়, নতুন ‘হবেকি?’-এর জন্য। অর্থাৎ, শিল্পের জায়গা দখল করে ফেলে ব্র্যান্ড।
এটি কি শিল্পীর ইচ্ছা? আমরা জানি না। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা কি অনিচ্ছাকৃতভাবে সেটাই ঘটাচ্ছি?
শিল্পের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা শিল্পকে ছোট করে ফেলেছে। কারণ, কোনো শিল্পকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তা দর্শকের সঙ্গে একান্ত ব্যক্তিগত কথোপকথন তৈরি করতে পারে। প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ছবির সামনে দাঁড়ায়। ওই স্বাধীনতাই শিল্পের প্রাণ। যদি প্রতিবার সংবাদমাধ্যম আমাদের বলে দেয়, ‘এই ছবির অর্থ সম্ভবত এটি’, তবে শিল্পের একটি বড় অংশ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
অবশ্যই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পচর্চা নিয়ে লিখতে হবে, নথিবদ্ধ করতে হবে। ভবিষ্যতের ইতিহাসের জন্য সেটি অপরিহার্য। কিন্তু নথিবদ্ধ করা আর কিংবদন্তি নির্মাণ করা এক বিষয় নয়।
প্রচার অবশ্যই দরকার। কিন্তু যখন প্রচার শিল্পকর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন শিল্পকর্মই ছোট হতে শুরু করে। আমাদের কাজ হওয়া উচিত শিল্পকে সামনে আনা, শিল্পীকে ঘিরে রহস্যের বাজার তৈরি করা নয়।
‘সুবোধ’ কি আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রিট আর্ট প্রকল্প? নিঃসন্দেহে।
আজ থেকে অনেক দিন আগে আমিও ঢাকার একটি বাসের জানালা দিয়ে ‘হবেকি?’-এর একটি স্টেনসিল দেখি। ছবি তোলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। শহরই আমাকে থামিয়েছিল। বাসের ভেতর থেকেই ক্যামেরা বের করে কয়েকটি ছবি তুলেছিলাম। তখনও জানতাম না, এগুলো একদিন স্মৃতির দলিল হয়ে থাকবে।
এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, ওই আকস্মিক দেখাটাই ছিল শিল্পকর্মটির প্রকৃত অভিজ্ঞতা। আমি কোনো প্রদর্শনী দেখতে যাইনি, কোনো সংবাদ অনুসরণ করিনি। বরং শিল্পকর্মটিই আমাকে খুঁজে নিয়েছিল। স্ট্রিট আর্টের বোধহয় এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য; সে দর্শককে ডাক দেয় না, দর্শকের পথের ধারে নিজেই অপেক্ষা করে।
ছবিগুলোর দিকে আবার তাকালে মনে হয় না, এগুলো সংবাদ হওয়ার জন্য আঁকা হয়েছিল। কোথাও কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। দেয়ালের নিচে জমে থাকা ময়লা, ছিঁড়ে যাওয়া পোস্টার, পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ—সবকিছু মিলিয়েই এটি শহরের একটি স্বাভাবিক দৃশ্য। শিল্পকর্মটি যেন নিজেকে আলাদা করে তুলতে চায়নি; শহরের মধ্যেই মিশে থাকতে চেয়েছে।
অথচ পরে এর চারপাশে গল্প তৈরি হয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা হবেই। মানুষ অর্থ খুঁজবে, সংবাদমাধ্যম লিখবে, গবেষণা হবে। কিন্তু ওই গল্প যেন কখনো শিল্পকর্মটিকে ছাপিয়ে না যায়। কারণ, একদিন যদি আমরা দেয়ালের ছবির চেয়ে ‘হবেকি?’ নামটিকেই বেশি দেখতে শুরু করি, তবে হয়তো আমরা অজান্তেই স্ট্রিট আর্টকে স্ট্রিট থেকে সরিয়ে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করব।
কিন্তু সেই গুরুত্ব কি শিল্পকর্মের ভেতর থেকে আসবে, নাকি আমরা সংবাদ, আলোচনা আর পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তা তৈরি করব?
এই প্রশ্নটি শুধু নির্দিষ্ট শিল্প বা শিল্পীকে নিয়ে নয়। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার প্রশ্ন। আমরা কি একজন অজ্ঞাতনামা শিল্পীকে তার কাজের জন্য মনে রাখতে চাই, নাকি তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের বাজারের জন্য?
হয়তো আমাদের উচিত তাকে একটু কম ব্যাখ্যা করা, একটু কম প্রচার করা। কারণ, স্ট্রিট আর্টের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সংবাদমূল্য নয়, তার নীরবতা। সুবোধের সবচেয়ে বড় ক্যানভাস হয়তো এখনও পত্রিকার পাতা নয়, দেয়াল।
মুনতাসির মামুন লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী। যোগাযোগ: [email protected]