Published : 06 Jul 2026, 03:32 PM
‘১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ভারতের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে’—এই মতবাদে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। শিক্ষিত সমাজেও এই ধারণার বৃদ্ধি ঘটেছে আশঙ্কাজনক হারে। তারা যে এইসব ভাবনা, ধারণা ও বিশ্বাসের কথা কেবল বন্ধু-পরিজনের ব্যক্তিগত পরিসরেই প্রকাশ করেন তা নয়, রীতিমতন সোশ্যাল মিডিয়ায়, এমনকি সংবাদমাধ্যমেও বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে, তথা আওয়ামী লীগকে রাজনীতি ও জনমানুষের স্মৃতি থেকে চিরতরে মুছে দিতে গিয়ে তারা ইতিহাসের এমন সব বিপজ্জনক বয়ান সামনে আনছেন বা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন, যা আখেরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে; দেশকে অসম্মানিত করে।
একটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করতে গিয়ে বা তাদেরকে নির্মূল করতে গিয়ে নিজের দেশের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়কে কলঙ্কিত করার এই আত্মঘাতী প্রবণতা পৃথিবীর আর কোনো দেশে, আর কোনো জাতির মধ্যে আছে কি না সন্দেহ।
এটা ঠিক যে, মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জাতির মধ্যে কিছুটা বিভক্তি শুরু থেকেই ছিল। কেননা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের শতভাগ মানুষ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাষ্ট্র হোক, তা চায়নি। বরং এই দেশের আলো-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা অনেকেই এর বিরোধিতা করেছেন। তাদের কাছে এই যুদ্ধটি ছিল ‘ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব’—যার পেছনে ছিল ভারতের স্বার্থ। অর্থাৎ, পাকিস্তান ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্র হয়ে গেলে এই অঞ্চলে ভারতের আধিপত্য বিস্তার তথা পাকিস্তানকে দমন করা সহজ হবে; এই কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছে—এমন বয়ান ১৯৭১ সাল থেকেই এই দেশে চালু ছিল এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছর পরেও এই বয়ানে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা অনেক। সাম্প্রতিক নানা ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে, এই বয়ান ও মতবাদে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে; বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত যে নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা দেয়নি, সেটি হয়তো ভারতও স্বীকার করবে। কিন্তু তারা যে উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশকে সমর্থন দিক না কেন, আখেরে ওই সমর্থন বাংলাদেশের পক্ষেই গেছে। দুই পাকিস্তান এক থাকলে তা ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতো। কিন্তু মাঝখানে ভারতের বিশাল ভূখণ্ড রেখে দুই পাকিস্তান আসলে কতদিন এক বা অবিচ্ছিন্ন থাকতে পারত, সেটি বিরাট প্রশ্ন। উপরন্তু, সাতচল্লিশে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের পূর্ব অংশ তথা পূর্ববাংলার মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে নিপীড়ন, অন্যায়, অবিচার ও শোষণ চলেছে, এই দেশের মানুষ সেটা কত বছর হজম করত? সুতরাং, ১৯৭১ সালে না হলেও ১৯৭৫ সালে, না হয় ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ঠিকই স্বাধীন হয়ে যেত। তবে বিনিময়ে আরও অনেক মানুষকে প্রাণ দিতে হতো। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পক্ষে ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধে না জড়ালে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধ হয়তো আরও কয়েক বছর প্রলম্বিত হতো; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের কোনো বিকল্প ছিল না। সুতরাং, যারা বলেন বা বিশ্বাস করেন এবং অন্যকে বিশ্বাস করানোর জন্য প্রয়াস চালান যে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, বরং এদিন থেকে বাংলাদেশ মূলত ভারতের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে—তাদের এই বয়ানের পেছনে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি। স্পষ্টত পরাজিত পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বয়ান। আশ্চর্য এবং একইসঙ্গে লজ্জারও বিষয় যে, বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অনেক শিক্ষিত মানুষও এইসব বয়ান ফেরি করে বেড়ান, অথচ তারা নিজেদেরকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেন! যারা মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র বা বৃহত্তর পাকিস্তানের মুসলিম ঐক্য বিনষ্টের রাজনীতি বলে বিশ্বাস করেন, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নটি তোলার সময় হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জাতির মধ্যে বিভক্তির প্রধান কারণ, এই যুদ্ধে এই দেশের মানুষেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ বিরোধিতা করেছে—যারা পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে মূলধারার অংশ হয়েছে বা যাদেরকে মূলধারার রাজনীতিতে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সুযোগটা কারা, কখন, কোন স্বার্থে দিয়েছেন, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু নেই। এগুলো ঐতিহাসিকভাবেই মীমাংসিত।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভাজনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগেরও দায় কম নয়। মুক্তিযুদ্ধ তথা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে, বিশেষ করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের আগের কয়েক বছরে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে স্খলন হয়েছে; মুক্তিযুদ্ধকে তারা যেভাবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দলীয় সম্পদে পরিণত করেছে; স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে আওয়ামী লীগের নিজস্ব সম্পদে পরিণত করেছে এবং বঙ্গবন্ধুকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অন্য সকল জাতীয় নেতাকে তারা যেভাবে ‘মাইনাস’ করেছে—তাতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হয়েছে। তার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির উত্তরসূরি এবং ওই আদর্শে বিশ্বাসী দল ও সংগঠনগুলো মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা তথা প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছে। আর জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে তাদেরকে চিরতরে মুছে ফেলতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকেই বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে—যা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বিভাজিত জাতিকে আরও বেশি বিভাজিত করেছে।
আওয়ামী লীগের আমলে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে বা লিখলে তাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বা ‘রাজাকার’ তকমা দেওয়া হতো। ‘বৈষম্যহীন’ নতুন বাংলাদেশের স্লোগান নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও সেই একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের মানুষ। আগে যেমন বলা হতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, এখন বলা হয় জুলাইবিরোধী। আগে যেমন বলা হতো রাজাকার, এখন বলা হয় ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিস্টের দোসর। আগে যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে একটি বিরাট গোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো অন্যায়-অপকর্ম জায়েজ করার চেষ্টা করেছে—এখন একইভাবে জুলাই চেতনার ব্যবসা চলছে। তার মানে, যে পরিবর্তন ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা জনমনে তৈরি হয়েছিল, সেখানে এখনও বিরাট ঘাটতি রয়ে গেছে—যে হতাশার সুর ঝরেছে স্বয়ং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কণ্ঠেও।
গত ৪ জুলাই রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে বর্তমানে জাতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একপক্ষ এই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে পুঁজি করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ফায়দা হাসিলে লিপ্ত রয়েছে, অন্যপক্ষ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি এও বলেন যে, এখন একদিকে ফ্যাসিবাদ, অন্যদিকে মৌলবাদ। অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থান হলেও এখন মৌলবাদী তথা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো যে দেশকে নতুন করে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আইনমন্ত্রী সেটিই ইঙ্গিত করেছেন। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তার মানে, জাতি যে বিভক্ত হয়ে গেছে বা বিভাজন যে বেড়েছে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও উদ্বিগ্ন।
যেকোনো যুদ্ধ বা লড়াই-সংগ্রামে যারা পরাজিত হয়, তারা ওই সংগ্রামকে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত বলে দাবি করে; তাদের ক্ষমতাচ্যুতিকে দেশবিরোধী তৎপরতা বলে অভিহিত করে। জুলাই অভ্যুত্থানে পতনের পরে স্বভাবতই আওয়ামী লীগও সেই পথে হাঁটছে। তারাও মনে করে বা শুরু থেকেই তারা এই বয়ান ফেরি করছে যে, জুলাই আন্দোলন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন ছিল না। বরং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত বা মেটিক্যুলাসলি ডিজাইন করা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে দেশি-বিদেশি নানা শক্তি জড়িত; যাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে অকার্যকর করে দিয়ে এখানে এমন একটি শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানো, যারা নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশের হয়ে কাজ করবে।
‘১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ভারতের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে’—এই মতবাদের মতো ‘জুলাই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশকে ধ্বংসের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’—এই ধারণায় বিশ্বাসী লোকের সংখ্যাও কম নয়, বরং বাড়ছে। তার কারণ, অভ্যুত্থানের পরে দেশ সঠিক পথে এগোয়নি। বরং অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে বিভক্তি ও বিভাজন আরও বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক ভিন্নতা সহিংস রূপ পেয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন আমলে। সোশ্যাল মিডিয়া তথা সামাজিক পরিসরে মানুষের ব্যক্তিগত মত ও বিশ্বাস শত্রুতায় পর্যবসিত হয়েছে। সব ধরনের গঠনমূলক ও একাডেমিক তর্কের অবসান ঘটেছে। ভিন্নমত মানেই শত্রু এবং শত্রুকে হত্যা করা জায়েজ—এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী অধিকতর শক্তিশালী হয়েছে এবং তারা সরকারের ওপরও খবরদারি করছে। সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হেনেছে; কিন্তু সরকার এই গোষ্ঠীকে প্রতিহত করা তো দূরের কথা, আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। ফলে, জাতির মধ্যে বিভক্তি ও বিভাজন আরও বেড়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতে গিয়ে, আওয়ামী লীগকে গণমানুষের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে গিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানকে একাত্তরের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে—যে চেষ্টাটি খোদ অন্তর্বর্তী সরকারই করেছে। অর্থাৎ, একটি রাজনৈতিক দল এবং সেই দলের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নেতাদের ‘মাইনাস’ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভক্ত করে ফেলা বা ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলোকে বিতর্কিত করার এই প্রবণতা জুলাই অভ্যুত্থানে পরাজিত শক্তির বয়ানকেই মূলত প্রতিষ্ঠিত করছে।
সামাজিক পরিসর, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের পরস্পরবিরোধী আগ্রাসী অবস্থান থেকে প্রায়শই মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ—এটিই হয়তো হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রধান লড়াই। কিন্তু সেই লড়াইয়ের ভেতরে যদি ধর্ম বা ইসলাম ঢুকে যায় এবং ধর্মীয় সকল দল ও গোষ্ঠী যদি মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বাংলাদেশের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে না পারে, বরং তারাও যদি ভারত-পাকিস্তান এবং ইসলাম–অ্যান্টি-ইসলামের পুরোনো বৃত্তে খাবি খেতে থাকে—তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির বলয়ে যারা থাকবেন, তারা হেরে যাবেন; বাংলাদেশ হেরে যাবে।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: [email protected]