Published : 04 Jul 2026, 08:04 PM
বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঝেমধ্যে গ্যালারিতে দেখা মেলে এক রহস্যময় চরিত্রের। কখনো তিনি সাদা কিংবা অন্য কোনো রঙের মিহি গুঁড়ো ফুঁ দিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, কখনো হাতে ধরা পুতুল নিয়ে করছেন তুকতাক। তার পোশাক, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ মুহূর্তেই ক্যামেরার নজর কাড়ে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় হাস্যরস, মিম আর কৌতূহল। কাকতালীয়ভাবে, এমন চরিত্রের অধিকাংশই আফ্রিকার কোনো না কোনো দলের সমর্থক।
এবারের বিশ্বকাপে তেমনই আলোচনার কেন্দ্রে ঘানার 'ওঝা' নানা কোয়াকু বনসাম। গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। ম্যাচের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন সহজ একটি সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি। ম্যাচের আগে বনসাম দাবি করেছিলেন, তিনি কেইনের ওপর 'কালো জাদু' করেছেন। এর আগেও ২০১৪ বিশ্বকাপে ঘানা-পর্তুগাল ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, জাদুর মাধ্যমে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাঁটুতে চোট সৃষ্টি করেছেন।
আর্জেন্টিনা–কেইপ ভার্ডে রাউন্ড অব থার্টি টুর ম্যাচ ছিল ৪ জুলাই, মায়ামিতে। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে সহজে জেতা আর্জেন্টিনা এ ম্যাচে হারবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেই ওঝা। তিনি বলেছিলেন, ‘শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেইপ ভার্ডে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করবে।’ শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জয় পেলেও তাদের ঘাম ঝরিয়ে দিয়েছে আফ্রিকার এই দলটি। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা এর আগে সাতবার আফ্রিকার দলগুলোর মুখোমুখি হয়েছে। তবে নকআউট পর্বে এটা আফ্রিকার কোনো দলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ।
বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর সঙ্গে 'ওঝা', 'জাদুকর' কিংবা 'জুজু' নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। আফ্রিকার বহু সমাজে আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও লোকজ ধর্মীয় চর্চা এখনো সামাজিক বাস্তবতার অংশ। দল হারলে কেউ মনে করেন প্রতিপক্ষের জাদু কাজ করেছে, আবার জিতলে অনেকে বিশ্বাস করেন পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ কিংবা আধ্যাত্মিক শক্তির সহায়তা মিলেছে।
আমরা যখন 'ওঝা', 'জাদুকর' কিংবা 'জুজু' শব্দগুলো শুনি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে একধরনের হাস্যকর দৃশ্য—মন্ত্রোচ্চারণ, ধোঁয়া, তাবিজ, সূচবিদ্ধ পুতুল কিংবা গোপন আচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলো সহজেই মিমের উপাদান হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের আমরা হাস্যরসের বিষয় বানাই, তারা কি সত্যিই কেবল কুসংস্কারের প্রতিনিধি? নাকি ঔপনিবেশিক ইতিহাসই আমাদের তাদের দেখার চোখ বদলে দিয়েছে?
উপনিবেশিত মানসিকতার জানালা খুলে বাইরে তাকালে ভিন্ন এক বাস্তবতা দেখা যায়। আফ্রিকার যাদের আমরা 'ওঝা' বা 'জাদুকর' বলে চিনি, তারা সেই মহাদেশের কোটি মানুষের কাছে শুধু আধ্যাত্মিক ব্যক্তি নন; তারা ইতিহাসের ধারক, লোকজ জ্ঞানের রক্ষক, চিকিৎসক, পরামর্শদাতা এবং সর্বোপরি, 'আমরা কারা'—এই প্রশ্নের সাংস্কৃতিক উত্তর বহনকারী মানুষ। তাদের উপস্থিতি শুধু কুসংস্কারের নয়, আত্মপরিচয়েরও ভাষা।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ টোগোর তারকা ফুটবলার ইমানুয়েল আদেবায়োর একসময় দীর্ঘ ফর্মহীনতায় ভুগতে ভুগতে অভিযোগ করেছিলেন, “আমার পরিবারের লোকজন আমার ওপর জুজু করেছে।” পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, তিনি নিজ দেশের আধ্যাত্মিক গুরুদের শরণাপন্নও হয়েছিলেন। একে নিছক পাগলামি বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু ইউরোপের বিশাল শহরে একা, ইনজুরি আর ফর্মহীনতার সঙ্গে লড়তে থাকা একজন মানুষের কাছে শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন একজন 'ওঝা', যা তার কাছে চিরকালীন এক আস্থার জায়গা।
ঔপনিবেশিক শাসন আফ্রিকায় শুধু ভূখণ্ড বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি; দখল করতে চেয়েছিল জ্ঞান, বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের সংজ্ঞাও। বহু ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রশাসক ও খ্রিস্টান মিশনারি আফ্রিকার দেশীয় ধর্মবিশ্বাসকে 'অসভ্য' কিংবা 'শয়তানি' বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাও বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় ভেষজ চিকিৎসা, লোকজ জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক চর্চাকে 'কুসংস্কার' হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কোথাও কোথাও আইন করেও এসব চর্চা দমনের চেষ্টা হয়েছে। ফলে আফ্রিকার বহু সমাজে 'ওঝা' বা আধ্যাত্মিক গুরু কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন; তারা হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক।
পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী ইওরুবা। বর্তমানে তাদের প্রধান আবাস নাইজেরিয়া, বেনিন ও টোগো—যদিও পশ্চিম আফ্রিকার আরও কিছু অঞ্চলে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর রয়েছে হাজার বছরের মৌখিক জ্ঞানভাণ্ডার, ইফা কার্পাস (Ifá Corpus)। এটি শুধু ধর্মীয় আচারবিধির সংকলন নয়; দর্শন, নৈতিকতা, ইতিহাস, সমাজজ্ঞান, প্রকৃতি ও লোকজ চিকিৎসাবিদ্যাসহ বিস্তৃত জ্ঞানের এক অনন্য ভাণ্ডার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জ্ঞান সংরক্ষণ করে আসছেন ইওরুবা আধ্যাত্মিক গুরু, যাদের বলা হয় বাবালাও (Babalawo)। দূর থেকে অনেকেই যাদের 'ওঝা' বলে চেনেন।
ঔপনিবেশিক শাসন ও মিশনারি কার্যক্রম এই জ্ঞানব্যবস্থাকে প্রান্তিক করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারেনি। এখনও আধুনিক চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকা বহু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানুষ বাবালাওয়ের শরণাপন্ন হন। কারণ তিনি শুধু ভেষজ চিকিৎসার পরামর্শ দেননি; তিনি রোগীর ভাষায় কথা বলেন, তার ইতিহাস জানেন, তার বিশ্বাসকে অসম্মান করেন না। এই সম্পর্ক তাই কেবল চিকিৎসার নয়; এটি আস্থা, মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও সম্পর্ক।
বিশ শতকের শুরুতে জার্মান অধিকৃত পূর্ব আফ্রিকার টাঙ্গানিকায় বাধ্যতামূলক তুলা চাষের বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক মাজি মাজি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, তার অন্যতম প্রেরণাদাতা ছিলেন আধ্যাত্মিক নেতা কিনজিকিটিলে ন্গওয়ালে। তিনি প্রচার করেছিলেন, পবিত্র পানি বা 'মাজি' শরীরে মাখলে জার্মানদের গুলি আর কাজ করবে না। বৈজ্ঞানিক বিচারে সেই বিশ্বাস ভুল ছিল। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে সেটিই বিচ্ছিন্ন বহু জাতিগোষ্ঠীকে এক পতাকার নিচে দাঁড় করিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারালেও জার্মান ঔপনিবেশিক শাসকেরা বুঝেছিল, আফ্রিকার আধ্যাত্মিক নেতারা শুধু অলৌকিক শক্তির দাবিদার নন; তারা নেতৃত্ব, ঐক্য এবং প্রতিরোধেরও প্রতীক।
১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের ঐতিহাসিক জয় এবং ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগালের অভাবনীয় সাফল্যের পর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ এবং 'জুজু' নিয়ে জনপরিসরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে ঘানার 'ওঝা' নানা কোয়াকু বনসামকে ঘিরে যে বিতর্ক, সেটিও সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতারই অংশ।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, ফুটবল ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে জাদুবিদ্যা। আধুনিক ফুটবল নির্ভর করে খেলোয়াড়ের দক্ষতা, কোচের কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং অসংখ্য বাস্তব উপাদানের ওপর। কিন্তু কোনো সমাজ কেন একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিকে দলের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে তাকালেই চলবে না; তাকাতে হবে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের সমষ্টিগত স্মৃতির দিকেও।
বিশ্বকাপের গ্যালারিতে আফ্রিকার কোনো সমর্থক যখন 'ওঝা'র বেশে হাজির হন, তখন তিনি শুধু নিজের দলের জয় কামনা করেন না; তিনি বহন করে আনেন এমন এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যাকে দীর্ঘদিন 'কুসংস্কার' বলে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছে। তার উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, উপনিবেশ শুধু ভূখণ্ড দখল করেনি; মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের ভাষাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল।
তাই বিশ্বকাপের গ্যালারিতে দেখা সেই মানুষটিকে নিয়ে হাসাহাসি করার আগে একবার থেমে ভাবা যেতে পারে। 'ওঝা' 'বিশেষ ক্ষমতা'র অধিকারী কি না, তার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু তিনি যে একটি সভ্যতার স্মৃতি, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা—সে সত্যটি অস্বীকার করা কঠিন। একজন 'ওঝা' তাই জাদুর চেয়েও বড়; তিনি স্মৃতি, তিনি প্রতিরোধ, তিনি মর্যাদা।
জয় প্রকাশ সরকার লেখক ও সাংবাদিক। ই-মেইল: [email protected]