Published : 03 Jul 2026, 07:17 PM
বিশ্বকাপ ফুটবল একসময় ছিল ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ। শুধু মাঠে নয়, ফুটবল ছিল ভূরাজনীতি, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরও প্রতিচ্ছবি। যে দেশগুলো পৃথিবী শাসন করেছে, দীর্ঘদিন ফুটবলও শাসন করেছে তারাই। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের বিস্তার যেমন বিশ্বের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, তেমনি ফুটবলের মানচিত্রও দীর্ঘদিন ছিল ইউরোপকেন্দ্রিক। সেই সাম্রাজ্য একচ্ছত্র হতো, যদি না ফুটবলকে শৈল্পিক করে তুলত লাতিন আমেরিকা।
২০২৬ বিশ্বকাপ এবার সেই পরিচিত গল্পের বাইরে এসে অন্য গল্প লিখতে শুরু করেছে৷ প্রথমত, চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি টানা দ্বিতীয়বারের মতো মূল পর্বে আসতে পারেনি। বাকি পরাশক্তিদের মধ্যে জার্মানি দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে। নেদারল্যান্ডসকে থামিয়ে দিয়েছে মরক্কো। ইংল্যান্ড জিতেছে ঠিকই, কিন্তু ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত স্বস্তি পায়নি। বেলজিয়ামকে ঘাম ঝরাতে হয়েছে সেনেগালের বিপক্ষে। স্পেন ও পর্তুগালের সামনেও অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। ফ্রান্স ছাড়া ইউরোপের আর কোনো দলকেই আগের মতো অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছে না।
এগুলো কি কেবল কয়েকটি অঘটন? হয়তো না। বরং এগুলো একটি দীর্ঘ পরিবর্তনের দৃশ্যমান লক্ষণ। লাতিন আমেরিকার সঙ্গে মাঠের ফুটবলে শক্তিমত্তা ভাগাভাগি হলেও, ফুটবলের অর্থনীতিতে ইউরোপ এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘ডেলয়েট ফুটবল মানি লিগ ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ২০টি ক্লাবের মোট আয় ১১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই তালিকার প্রায় সব ক্লাবই ইউরোপের। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য কয়েক মৌসুম মিলিয়ে ১২ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। স্পেনের লা লিগা, জার্মানির বুন্দেসলিগা, ইতালির সিরি আ এবং ফ্রান্সের লিগ ওয়ান মিলিয়ে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ প্রতিবছর আনুমানিক ২০ থেকে ২২ বিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে।
বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক স্টেডিয়াম, সর্বোচ্চ বেতনের খেলোয়াড়, সেরা কোচ এবং সবচেয়ে উন্নত স্পোর্টস সায়েন্সের অবকাঠামো এখনও ইউরোপেই কেন্দ্রীভূত। তবু বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব আর আগের মতো একচেটিয়া সাফল্যে রূপ নিচ্ছে না।
উয়েফার আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ প্রতিবছর আনুমানিক ২০ থেকে ২২ বিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে। এই টাকার সমপরিমাণ অর্থনীতি রয়েছে বিশ্বের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের। অথচ বিশ্বকাপে সেই অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিফলন আর আগের মতো দেখা যাচ্ছে না।
তবে ইউরোপের প্রকৃত শক্তি শুধু অর্থ ছিল না; ছিল জ্ঞান। উন্নত কোচিং, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, ম্যাচ বিশ্লেষণ, পুষ্টিবিজ্ঞান, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও আধুনিক একাডেমি ছিল তাদের একচ্ছত্র সম্পদ। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োর ভাষায়, এ ছিল এক ধরনের 'সাংস্কৃতিক পুঁজি'। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে সেই পুঁজি আর ইউরোপের একার নেই।
আজ মরক্কোর কোচও একই ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করেন, জাপানের ফুটবলারও একই ধরনের স্পোর্টস সায়েন্সের সুবিধা পান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রও একই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খেলোয়াড় তৈরি করছে। প্রযুক্তির বিস্তার ও জ্ঞানের অবাধ প্রবাহ ইউরোপের দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে বৈশ্বিক সম্পদে পরিণত করেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে আরেকটি গভীর রাজনৈতিক ইতিহাস। উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো শুধু ভূখণ্ড দখল করেনি; তারা শিক্ষা, প্রশাসন, ভাষা, সংস্কৃতির পাশাপাশি খেলাধুলাকেও উপনিবেশে নিয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশরা ভারত, আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ফুটবল পরিচয় করিয়ে দেয়। ফরাসিরা পশ্চিম আফ্রিকায়, পর্তুগিজরা মোজাম্বিক ও অ্যাঙ্গোলায়, বেলজিয়ানরা কঙ্গোতে ফুটবলকে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, একদিন সেই খেলাই উপনিবেশিত জনগণের আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার ভাষা হয়ে উঠবে।
আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাস তাই শুধু ক্রীড়ার ইতিহাস নয়, আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাসও। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ছিল প্রতিষ্ঠিত ফুটবল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিরোধ। ২০০২ সালে সেনেগাল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। ২০২২ সালে মরক্কো প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস লেখে। ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, সেই সাফল্য আর বিচ্ছিন্ন কোনো বিস্ময় নয়।
বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার আরেকটি কারণ লুকিয়ে আছে ইউরোপের নিজের সাফল্যের মধ্যেই। গত তিন দশকে ইউরোপ এমন একটি ক্লাবভিত্তিক ফুটবল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার তুলনা ক্রীড়াজগতে খুব কমই আছে। কিন্তু এই সাফল্যের একটি মূল্যও আছে।
আজকের ইউরোপীয় তারকা ফুটবলারদের অনেকে বছরে ৬০ থেকে ৭০টি ম্যাচ খেলেন। ক্লাব, জাতীয় লীগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ঘরোয়া কাপ ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ, সব মিলিয়ে তাদের মৌসুম প্রায় শেষই হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ম্যাচ খেললে শুধু চোটের ঝুঁকিই বাড়ে না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও মানসিক সতেজতাও কমে যায়। অন্যদিকে মরক্কো, জাপান, সেনেগাল কিংবা ডিআর কঙ্গোর মতো দলগুলোর জন্য বিশ্বকাপই চার বছরের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। ফলে প্রস্তুতিতে ব্যবধান দ্রুত কমে এসেছে।
আধুনিক ফুটবলের আরেকটি আকর্ষণীয় বৈপরীত্য হলো: ইউরোপের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই আসলে ইউরোপেই তৈরি। মরক্কো, সেনেগাল, নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, ঘানা কিংবা আলজেরিয়ার সেরা খেলোয়াড়দের বড় অংশ ইউরোপের ক্লাবে খেলেন। একই চিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও। একসময় ইউরোপ যাদের কাছ থেকে প্রতিভা নিয়েছিল, আজ তারাই সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের দেশের হয়ে ইউরোপের বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।
ক্যামেরুনের কিংবদন্তি ফুটবলার রজার মিলা, লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ, আইভরি কোস্টের দিদিয়ের দ্রগবা, সেনেগালের সাদিও মানে, মিশরের মোহাম্মদ সালাহ, মরক্কোর আশরাফ হাকিমি, আমেরিকার ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক প্রমুখ ফুটবলার প্রমাণ করেছেন যে প্রতিভার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। তাদের অধিকাংশই ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে গড়ে উঠেছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে সেই অভিজ্ঞতাকেই নিজেদের দেশের শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।
এই প্রবণতাকে গবেষকেরা বলেন 'রিভার্স নলেজ ট্রান্সফার'; অর্থাৎ জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আর একমুখীভাবে ইউরোপে প্রবাহিত হচ্ছে না; বরং ইউরোপে অর্জিত অভিজ্ঞতা ফিরে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের ফুটবলে। আমরা বাংলায় যাকে ‘গুরু মারা বিদ্যা’ বলি।
একসময় বিশ্বকাপে আফ্রিকার দল জিতলেই সেটিকে 'আপসেট' বলা হতো। এখন সেই ভাষা বদলাতে শুরু করেছে। কারণ শক্তির ব্যবধান সত্যিই কমে এসেছে। একইভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, উজবেকিস্তান কিংবা সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন ফুটবল শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে।
অর্থাৎ ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে বহু-মেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। বিশ্বকাপে অর্থ নয়, পরিকল্পনা জেতে; বাজেট নয়, দলগত বিশ্বাস জেতে; আর অনেক সময় ইতিহাসের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ক্ষুধা। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে। মরক্কো, সেনেগাল, জাপান কিংবা ডিআর কঙ্গোর মতো দলগুলো আর ইউরোপকে ভয় পায় না। তারা ইউরোপ ও লাতিন ফুটবলারদের প্রতিদিনই ক্লাব ফুটবলে মোকাবিলা করে। তাদের কৌশল জানে, দুর্বলতা জানে, মানসিকতাও বোঝে। ফলে ইউরোপীয় জার্সির অতীতের আভিজাত্য এখন আর ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে না। আবার, ইউরোপ-পর্ব শেষ করে অনেক ফুটবলার যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যপ্রাচ্যে নাম লেখাচ্ছেন, যা এ লীগগুলোতেও ফুটবলের বৈশ্বিক মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি করে স্থানীয় খেলোয়াড়দের গুণগত মান বৃদ্ধি করছে।
আগামী এক বা দুই দশকের মধ্যে আফ্রিকার কোনো দেশ বিশ্বকাপ জিতবে; এমন সম্ভাবনাকে এখন আর রোমান্টিক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একইভাবে এশিয়ার কোনো দেশ নিয়মিত সেমিফাইনালে খেলবে, এটিও আর অবাস্তব নয়।
ফুটবলের ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয়, কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। একসময় দক্ষিণ আমেরিকা বিশ্ব শাসন করেছে, পরে ইউরোপ করেছে। এখন শুরু হয়েছে আরও প্রতিযোগিতামূলক, আরও ভারসাম্যপূর্ণ এক নতুন যুগ।
সম্ভবত এ কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপকে শুধু একটি টুর্নামেন্ট হিসেবে নয়, বিশ্ব ফুটবলের নতুন ভূরাজনীতির সূচনা হিসেবেও মনে রাখা হবে। ইউরোপের আধিপত্য ভেঙে পড়েনি, কিন্তু তা এখন আর একচ্ছত্র নয়। সিংহাসনের দাবিদার বেড়েছে। আর এটাই হয়তো ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর পরিবর্তন, শেষ পর্যন্ত খেলাটি সত্যিই সবার হয়ে উঠছে।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]