Published : 26 Jul 2026, 12:00 PM
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ইতিহাসে তৈরি পোশাক শিল্প নিঃসন্দেহে অনন্য অধ্যায়। গত চার দশকে এই শিল্প রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্পায়নের সম্প্রসারণ এবং দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রেখে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখন নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে দ্রুত রূপান্তর ঘটছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্তব্য—পোশাক শিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক গন্তব্য—একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিম্ন ও মধ্যপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন থেকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর মূল্যসংযোজিত শিল্পের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেক, ইলেকট্রনিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস (বিইএআর) সম্মেলন-২০২৬ উদ্বোধন করার সময় প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবেই বলেছেন, কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয় ও ডিজিটাল সেবায় বাংলাদেশের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সেমিকন্ডাক্টরও আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে। তিনি সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান যথাসময়ে এসেছে, কারণ উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প কখনোই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে গড়ে ওঠে না; এটি গড়ে ওঠে সমন্বিত জাতীয় ইকোসিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে।
বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টরকে প্রায়ই আধুনিক সভ্যতার ‘মস্তিষ্ক’ বলা হয়। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, চিকিৎসা প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ডেটা সেন্টার, শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে ক্ষুদ্র একটি চিপ। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আজ শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়; প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম ভিত্তি।
এই শিল্পের বৈশ্বিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (SIA) এবং ওয়ার্ল্ড সেমিকন্ডাক্টর ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস (WSTS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বিক্রি প্রায় ৭৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং স্মার্ট উৎপাদন প্রযুক্তির বিস্তার আগামী দশকেও এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, এখন যে দেশ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার অবস্থান হবে অনেক বেশি শক্তিশালী।
করোনা মহামারীর সময় বিশ্বব্যাপী চিপ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, একটি ক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর চিপের ঘাটতি কীভাবে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিতে পারে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ‘CHIPS and Science Act’, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘European Chips Act’, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও সিঙ্গাপুরের বিশাল বিনিয়োগ কর্মসূচি প্রমাণ করেছে যে, সেমিকন্ডাক্টর এখন কেবল শিল্পনীতি নয়; ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি খনিজ সম্পদ নয়; মানবসম্পদ। প্রতিবছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রায় ২০ হাজারের বেশি কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স প্রকৌশলে স্নাতক বের হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বহু বাংলাদেশি প্রকৌশলী বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। এই বৈশ্বিক মেধা-নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল সম্পদ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই মেধাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দেশের উন্নয়নে যুক্ত করার মতো নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি?
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ইতোমধ্যে দেশে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইসি ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন, এমবেডেড সিস্টেম ও ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (EDA) সেবায় কাজ করছে। প্রায় সাত শতাধিক প্রকৌশলী এই খাতে কর্মরত এবং ২০২৪ সালে এ খাত থেকে প্রায় ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এই আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী, কিন্তু অসম্ভব নয়—যদি তা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশ মানেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিপ উৎপাদন কারখানা নির্মাণ। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি চিপের বাস্তবচক্রে রয়েছে নকশা, সার্কিট ডিজাইন, সফটওয়্যারভিত্তিক যাচাই, পরীক্ষণ, প্যাকেজিং, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা এবং উৎপাদন পরিকল্পনাসহ বহু ধাপ। এসবের অনেকগুলোই জ্ঞাননির্ভর, কিন্তু অতিমাত্রায় মূলধননির্ভর নয়। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য প্রথম ধাপে আইসি ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, প্যাকেজিং, এমবেডেড সিস্টেম এবং গবেষণাভিত্তিক প্রকৌশল সেবায় বিশেষায়িত হওয়াই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল।
এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্বের যেসব দেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, ন্যানোপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও এমবেডেড সিস্টেম নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু গবেষণার সঙ্গে শিল্পের বাস্তব চাহিদার সংযোগ এখনো সীমিত। গবেষণাগার থেকে শিল্পে প্রযুক্তি স্থানান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া উদ্ভাবন অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে না।
জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বিইএআর সম্মেলনের মতো উদ্যোগ তাই নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, শিক্ষার্থী এবং নীতিনির্ধারকদের এক প্ল্যাটফর্মে আনা উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেম তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও সময়োপযোগী। কারণ, এই খাতে অভিজ্ঞ মানবসম্পদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি হতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পগুলোর একটি। এখানে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চমানের গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, দক্ষ প্রকৌশলী, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিপুল বিনিয়োগ। তাই কেবল সম্মেলন আয়োজন বা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করলেই এই শিল্প গড়ে উঠবে না। প্রয়োজন সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগ, গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। এই অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর কিংবা বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা যে কোনো সময় রপ্তানিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে রপ্তানি বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে, উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশ ধীরে ধীরে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগোতে পারবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বিরল সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। দেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা, তরুণ প্রকৌশলীদের সক্ষমতা, প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতাকে যদি একই সুতোয় গাঁথা যায়, তবে আগামী এক দশকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি মূল্যশৃঙ্খলে একটি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম বড় ভিত্তি নির্মাণ করেছে। আগামী দিনের উন্নয়নের দ্বিতীয় ভিত্তি যদি জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন, উচ্চপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, তাহলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সেখানে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন, সেটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব, উদ্ভাবনমুখী শিল্প সংস্কৃতি। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শুধু পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি মূল্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।
খালিদুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: [email protected]