৪৭-এর পাকিস্তানপ্রত্যাখ্যান ও ৭১-এর বাংলাদেশবিরোধিতা: জামায়াতের রাজনৈতিক স্ববিরোধ
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘অনৈসলামিক’ আখ্যা দেওয়া জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে কীভাবে সেই কাঠামোর রক্ষক হলো?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি নতুন প্রবণতা লক্ষণীয়—সেটি হলো ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ১৯৪৭-এর দেশভাগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা। বলা হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মই হতো না। এই আখ্যানের মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমকক্ষ বা তার চেয়েও বেশি স্বীকৃতিযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। এই আখ্যানের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, যে দলটি আজ নিজেকে পাকিস্তান-আদর্শের উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করছে, সেই জামায়াতে ইসলামী এবং এর প্রতিষ্ঠাতা মওলানা সাইয়িদ আবুল আ’লা মওদুদী ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনেরই প্রবল আদর্শিক বিরোধী ছিলেন।
লাহোর প্রস্তাব, জামায়াতের জন্ম ও প্রাথমিক অবস্থান
লাহোর প্রস্তাব, যা পরবর্তীতে 'পাকিস্তান প্রস্তাব' (Qarardad-e-Pakistan) নামে পরিচিতি পায়, তাতে ভারতের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে (উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় জোন) 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ' (independent states) গঠনের ইঙ্গিত ছিল। লাহোর প্রস্তাবের মূল খসড়া তৈরি করেছিলেন পাঞ্জাবের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী স্যার সিকান্দার হায়াত খান। জিন্নাহ কৌশলগতভাবে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হককে (যিনি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন না) দিয়ে প্রস্তাবটি পেশ করান—যাতে দাবিটি শুধু পাঞ্জাবকেন্দ্রিক না থেকে সর্বভারতীয় ও বাংলার সমর্থনযুক্ত হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ উত্থাপিত মূল প্রস্তাবের পাঠ্যে 'পাকিস্তান' শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি, তবে এই প্রস্তাবই পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি বা দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। লাহোর প্রস্তাব পেশের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের কোনো প্রশ্ন নেই, কারণ তখন সংগঠনটির অস্তিত্বই ছিল না।
মওদুদী জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪১ সালের ২৬ অগাস্ট লাহোরে। তবে শুধু লাহোর প্রস্তাবের আগে নয়, জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই মওদুদী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য বিরোধিতা করছিলেন। মওদুদী ৩১ বছর (১৯৪১-১৯৭২) ধরে দলটির নেতৃত্ব দেন। এর ফলে, শুরুতে যা কেবল তাত্ত্বিক মতপার্থক্য বলে মনে হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক সংঘাতের রূপ নেয়।
মুসলিম লীগকে ‘জামায়াতে জাহিলিয়াত’ আখ্যা
মুসলিম লীগ যে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে মওদুদী—লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার আগে থেকেই—আদর্শিক আপত্তি ক্রমাগত উত্থাপন করছিলেন। ১৯৩৯ সালের নভেম্বরে নিজের সম্পাদিত পত্রিকা ‘তরজুমানুল কুরআনে’ (Tarjuman-ul-Qur’an) মওদুদী লেখেন যে, মুসলিম লীগের শীর্ষ থেকে নিচ পর্যন্ত কারো চিন্তাভাবনায় ইসলামি ধারা নেই। মুসলিম স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের কৌশলকে তিনি ‘ইসলামের অবমাননা’ বলেছিলেন। ডিসেম্বর সংখ্যায় তিনি লেখেন, ‘ইসলাম যদি কোনো আন্দোলনের নাম হয়, তবে এর নেতৃত্ব তাদেরই হাতে থাকা উচিত যাদের সেই আন্দোলন সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়া রয়েছে... আপনাদের নেতাদের দিকে তাকান—‘কায়েদ-এ-মিল্লাত’ ও ‘আমির-এ-লশকর’-এর দিকে লক্ষ্য করুন। সারা বিশ্ব জানে যে, প্রথমোক্ত ব্যক্তির (জিন্নাহ) ইসলামি মূলনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই।’ মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র (মুসলিম কা হুকুমত) দাবিকে তিনি প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্র (ইসলাম কি হুকুমত) প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে আলাদা করে দেখতেন এবং এই কারণে ১৯৩৯ সালের জুলাই সংখ্যায় মুসলিম লীগকে তিনি 'জামায়াতে জাহিলিয়াত' (অজ্ঞতার দল) আখ্যা দেন। উল্লেখ্য, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের পূর্ববর্তী অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগকে 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' বলা হয়।
লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর ১৯৪০ সালের মে-জুন সংখ্যায় তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে লেখেন—ব্রিটিশ ভারতের অবসানের পর মুসলিমদের জন্য গঠিত পৃথক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রাক-ইসলামি যুগে ‘মানাত’ মূর্তির বদলে ‘লাত’ মূর্তি স্থাপনের সঙ্গে তুলনীয়। তার ভাষায়, প্রস্তাবিত পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বদলে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক জনসার্বভৌমত্বের নীতিতে গড়ে ওঠে, তবে সেই রাষ্ট্র হবে অপবিত্র—তিনি একে ব্যঙ্গ করে 'নাপাকিস্তান' (Na-paki-stan) বলে অভিহিত করেন এবং একে অমুসলিম-শাসিত ভারতীয় অঞ্চলের চেয়েও বেশি নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন। এমনকি পাকিস্তানকে ভবিষ্যতের ইসলামি রাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার একটি প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবেও তিনি মানতে রাজি ছিলেন না।
মওদুদীর যুক্তি ছিল, গণতন্ত্র মানবসার্বভৌমত্বকে সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বের ঊর্ধ্বে বসায়, তাই তিনি ভবিষ্যতের 'গণতান্ত্রিক পাকিস্তান' ধারণাকে মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং গণতন্ত্রকে পশ্চিমা ধারণা হিসেবে দেখতেন। তিনি জাতীয়তাবাদকেও ইউরোপীয় ধারণা বলে সমালোচনা করতেন এবং মনে করতেন, ইসলামে একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই সদস্যপদের মানদণ্ড—জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। কুরআন কোনো 'জাতি' ধারণা স্বীকার করে না, বরং 'হিযব' বা মতাদর্শগত দলের কথা বলে—এই যুক্তিতে তিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার বিরোধিতা করেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির নির্বাচন বর্জন ও গণতন্ত্রকে 'হারাম' ফতোয়া
১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সীমিত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (এআইএমএল)-এর ফলাফল ছিল শোচনীয়, বিপরীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। মুসলিম লীগ কোনো একক প্রদেশেই নিজ শক্তিতে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়—এমনকি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সিন্ধু প্রদেশেও।
এরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে। এ নির্বাচন ছিল ব্রিটিশ ভারতের ভবিষ্যতের জন্য দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতা: অখণ্ড ভারত বনাম দেশভাগ (ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র)।
ফলাফলে প্রকৃত তাৎপর্য ছিল প্রাদেশিক নিম্নকক্ষের নির্বাচনের মধ্যে:
হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে: প্রত্যাশিতভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস মাদ্রাজ, বোম্বে, সংযুক্ত প্রদেশ, বিহার এবং কেন্দ্রীয় প্রদেশের মতো অঞ্চলে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলিতে (১৯৪৭ সালে যে প্রদেশগুলো নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়): মুসলিম লীগ ভূমিধস জয়লাভ করে, মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত ৪৯৪টি আসনের মধ্যে ৪৩৯টি (প্রায় ৮৯%) আসন দখল করে।
এই ফলাফল ছিল জিন্নাহর অনস্বীকার্য ম্যান্ডেট। তিনি এখন বৈধভাবে দাবি করতে পারতেন যে, ভারতের মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি তিনি এবং মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে বিপুল ভোট দিয়েছে।
৯ বছর আগে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুলভাবে জয়লাভের পর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে, সেখানে মুসলিমদের অধিকার চরমভাবে উপেক্ষিত হয় এবং এককভাবে মুসলিম সংস্কৃতি ও সত্তাকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। কিন্তু ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে মুসলিম লীগের জয় প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা একটি অখণ্ড ভারতে হিন্দু আধিপত্যকে ভয় পেয়েছিল এবং মুসলিম লীগকে তাদের রক্ষক হিসেবে দেখেছিল। এটি দ্বি-জাতি তত্ত্ব—আরো স্পষ্টভাবে বললে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগকে—অনিবার্য করে তুলেছিল।
মওদুদীর বিরোধিতা কেবল বাগাড়ম্বরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন ঘটেছিল। ১৯৪৬ সালের যে নির্বাচন ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির গণতান্ত্রিক ট্রিগার, সেই নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করেনি; বরং নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়েই তারা আপত্তি তুলেছিল। মওদুদী ঘোষণা করেন যে, গণতান্ত্রিক নীতিতে গঠিত সংসদীয় ব্যবস্থায় ভোট দেওয়া বা সদস্য হওয়া হারাম।
জামায়াতে ইসলামী অংশ না নিলেও প্রখ্যাত আলেম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী ইসলামী দল 'জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ' ঐ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এছাড়া ‘নিখিল ভারত আজাদ মুসলিম কনফারেন্সে’র মতো রাজনৈতিক মঞ্চের সাথী সাইয়িদ আতাউল্লাহ শাহ বুখারির নেতৃত্বাধীন ‘মজলিস-ই-আহরার-ই-ইসলাম’ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছিল। এই দুই দল ও আলেম সমাজ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান সৃষ্টির ধারণার তীব্র বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলে উপমহাদেশের মুসলিমরা বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়বে; তাই তারা পাকিস্তান আন্দোলনের সরাসরি বিরোধিতা করে অখণ্ড ভারতের আদর্শকেই সমর্থন করেছিলেন।
পক্ষান্তরে, ‘জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেওবন্দি উলামাদের একটি বড় অংশ নিয়ে ‘জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম’ নামে একটি নতুন দল গঠনকারী মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানী নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণায় অংশ নেন।
লক্ষণীয়, ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ যেদিন 'পাকিস্তান দিবস' পালন করে, সেদিনই একাধিক মুসলিম সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘নিখিল ভারত আজাদ মুসলিম কনফারেন্স’ একে 'হিন্দুস্তান দিবস' হিসেবে পালন করে—আর জামায়াতে ইসলামীও এই 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' কর্মীদের বিরোধিতা করে।
দেশভাগ-পরবর্তী রূপান্তর: বিরোধী থেকে 'অভিভাবক'
এখানেই আসল স্ববিরোধিতা স্পষ্ট হয়।
মাওলানা মওদুদী ১৯৩৮ সালের দিকে ব্রিটিশ ভারতের হায়দ্রাবাদ ছেড়ে পাঞ্জাবের পাঠানকোটে এসে বসবাস শুরু করেন (আল্লামা ইকবালের আমন্ত্রণে এবং দারুল ইসলাম ট্রাস্ট পরিচালনার দায়িত্বে)। ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর দলটির প্রথম কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরও স্থাপিত হয় পাঠানকোট শহরের এই 'দারুল ইসলাম'-এ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগপর্যন্ত তিনি ভারতীয় অঞ্চলেই বসবাস করতেন এবং সেখান থেকেই তার দল পরিচালনা করতেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে পাঞ্জাবের পাঠানকোট ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মওদুদী পাঠানকোট থেকে হিজরত করে পাকিস্তানে চলে যান; লাহোরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান পুনর্গঠিত করে এর সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।
যে নেতারা ও আলেমরা একসময় পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিলেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তারাই নিজেদের নতুন রাষ্ট্রের 'নৈতিক অভিভাবক' হিসেবে পুনরায় উপস্থাপন করতে শুরু করেন।
এই ইতিহাস স্পষ্ট করে দেয়—জামায়াতে ইসলামীর 'পাকিস্তান-আদর্শের রক্ষক' পরিচয়টি মূলত দেশভাগ-পরবর্তী এক কৌশলগত পুনর্গঠন, ১৯৪৭-পূর্ব প্রকৃত অবস্থান নয়।
১৯৭১: ধারাবাহিক বিরোধিতা
জামায়াতে ইসলামীর এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ১৯৭১ সালেও অব্যাহত ছিল, যদিও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তারা জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে জামায়াত ১৫১ জন প্রার্থী দিয়েছিল এবং সারা পাকিস্তানে মাত্র ৪টি আসন জয়ী হয়েছিল; তবে সবগুলোই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে একটিও নয়। প্রাদেশিক পরিষদেও মাত্র ৪টি আসনে জয়ী হয়—তন্মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১টি (৩০০ আসনের মধ্যে)।
তারা মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার জন্য রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠন করে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা ও নারী নির্যাতনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে; তখন মওদুদীই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রধান (আমির)। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তান চলে যান এবং সেখানে 'পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি' গঠন করে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা চালান। এর জের ধরে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে তার নাগরিকত্ব বাতিল করে। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে জামায়াত দীর্ঘদিন প্রকাশ্য রাজনীতি করতে পারেনি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তারা পুনরায় রাজনীতি করার সুযোগ পায়। ১৯৭৯-৮০ সালে তারা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ নামে পুনর্গঠিত হয়, শুরুতে আড়াল থেকে যার নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন গোলাম আযম এবং ১৯৯৪ সালে নাগরিকত্বও ফিরে পাওয়ার পর অবশ্য প্রকাশ্যে আসেন। ২০২৪-এ ক্ষমতাচ্যুত সরকার ১ অগাস্ট বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে; তবে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ২৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে।
উন্মোচিত দ্বিচারিতা
জামায়াতে ইসলামী জন্মলগ্ন থেকেই ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে স্ববিরোধিতায় লিপ্ত। চিত্রটি দাঁড়ায় এরকম—মওদুদীর প্রতিষ্ঠিত দল জামায়াতে ইসলামী ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আন্দোলনকে 'অনৈসলামিক জাতীয়তাবাদ' বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে হারাম ফতোয়া দিয়েছিল এবং জিন্নাহর দলকে 'অজ্ঞতার দল' আখ্যা দিয়েছিল। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর একই দল নিজেকে সেই রাষ্ট্রের আদর্শিক উত্তরাধিকারী হিসেবে জাহির করে এবং ১৯৭১ সালে যখন সেই রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার লড়াই করছিল, তখনো তারা বিরোধী পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল—এবার পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে।
সুতরাং আজ যখন ১৯৪৭-এর 'মাহাত্ম্য' বেশি করে বয়ান করার আহ্বান আসে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে, তখন এই ঐতিহাসিক তথ্য স্মরণ রাখা জরুরি: যে দল আজ ১৯৪৭-কে মহিমান্বিত করছে, সেই দলই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।
বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: গবেষক ও লেখক। ই-মেইল: baizid.romana@gmail.com
