মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: শুধু সুদের হার নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নীতি
শুধু সুদের হার বাড়িয়ে কি নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব? বাজার ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা কী বলছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; মানুষের আয়, সঞ্চয়, ভোগব্যয়, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে তা সরাসরি যুক্ত। কয়েক মাস ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর সাম্প্রতিক সময়ে এর গতি কিছুটা কমলেও স্বস্তির পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অগাস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, জুলাইয়ে যা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে এলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলে গড় মজুরি বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, মূল্যস্ফীতি কমানোর পরবর্তী ধাপেও কি শুধু সুদের হার প্রধান হাতিয়ার থাকবে? নাকি প্রয়োজন হবে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয়?
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ বাড়ালে ব্যাংকঋণের খরচ বাড়ে, ঋণের চাহিদা কমে, ভোগ ও বিনিয়োগের গতি ধীর হয় এবং অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদার চাপ কমতে পারে। ফলে পণ্যের দাম বৃদ্ধির গতি কমার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে উচ্চ সুদ সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশও গত কয়েক বছরে এই পথ অনুসরণ করেছে। তবে অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মূল্যস্ফীতির কারণ যখন শুধু অতিরিক্ত চাহিদা নয়, তখন সুদের হার দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছিল। তখন খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন বড় ভূমিকা রেখেছিল। অর্থাৎ বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু ঋণের সুদ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
২০২৬ সালের বাস্তবতাতেও একই ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেপ্টেম্বরে নীতিসুদ অপরিবর্তিত রেখেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। এর পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামো ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবেচনা করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানেই সুদের হারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমাতে পারে না, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, পরিবহন ব্যয় কমাতে পারে না, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে পারে না। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখন প্রয়োজন সমন্বিত নীতি।
প্রথমত, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ, ন্যায্য মূল্য এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য দরকার। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, হিমাগার, গুদাম, পরিবহন ও বাজারসংযোগ উন্নত করা গেলে উৎপাদন মৌসুমে দাম পড়ে গিয়ে কৃষকের ক্ষতি এবং অন্য সময়ে সরবরাহ কমে গিয়ে ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত মূল্যচাপ—দুই সমস্যাই কমানো সম্ভব।
ভারতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দেশটির সাধারণ মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে আসে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ১ দশমিক ৭৬ শতাংশে পৌঁছে। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত, ভালো কৃষি উৎপাদন, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং খাদ্যপণ্যের স্বাভাবিক বাজার সরবরাহ এই নিম্ন মূল্যস্ফীতিতে সহায়তা করেছিল। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, খাদ্যের দাম কমাতে শুধু সুদের হার নয়, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশের অনেক খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ও দেশে সরবরাহ ঘাটতি হলে দ্রুত আমদানির সুযোগ না থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সহজ করা, শুল্ক ও কর কাঠামো পরিস্থিতি অনুযায়ী সামঞ্জস্য করা এবং বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থার জট কমানো জরুরি।
তৃতীয়ত, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সেই বাড়তি ব্যয় উৎপাদন ও পরিবহনের মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের বিনিময় হার ব্যবস্থার সংস্কার এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
চতুর্থত, রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমানোর চেষ্টা করবে, অথচ সরকারি ব্যয় অকার্যকরভাবে বাড়তে থাকবে—এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। কর আদায়ের পরিধি বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং উৎপাদনশীল সরকারি ব্যয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া তাই জরুরি।
ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত সুদের হার বাড়িয়েছিল। পরে মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে সুদ কমানোর পথেও এগিয়েছে। তবে দেশটির অভিজ্ঞতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি নয়, সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলা এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
পঞ্চমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা মুদ্রানীতির কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। মার্চ ২০২৬ সালে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সুদের হার বাড়ালে উৎপাদনশীল উদ্যোক্তার ঋণ ব্যয় বাড়তে পারে, অথচ দুর্বল ব্যাংকের কাঠামোগত সমস্যা থেকে যেতে পারে। তাই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকের সুশাসন, মূলধন শক্তিশালীকরণ এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ষষ্ঠত, উৎপাদন ও বিনিয়োগের ধারাও সচল রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এতটা সংকুচিত করা ঠিক হবে না, যাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানিমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বজায় রাখা প্রয়োজন।
সপ্তমত, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে হবে। অগাস্টে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত আয় এখনও চাপের মধ্যে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য সহায়তা, কৃষি সহায়তা এবং কর্মসংস্থান কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি কমাতে দ্রুত সুদের হার বাড়ানো হয়েছিল। পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ, বিনিময় হার ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের উন্নতি ভূমিকা রেখেছে। তুরস্কে উচ্চ সুদের পাশাপাশি বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: মূল্যস্ফীতির স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ সাধারণত একক নীতির ফল নয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই প্রয়োজন নীতির সমন্বিত প্রয়োগ। মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করবে, রাজস্বনীতি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে, বাণিজ্যনীতি প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সহজ করবে, কৃষিনীতি খাদ্য উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করবে এবং আর্থিক খাতের সংস্কার ঋণপ্রবাহকে আরও কার্যকর করবে।
মূল্যস্ফীতি কমানোর সাফল্য শুধু ভোক্তা মূল্যসূচকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। মানুষের আয় দিয়ে আগের তুলনায় বেশি পণ্য কেনা যাচ্ছে কি না, শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়ছে কি না, কৃষক উৎপাদনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন কি না এবং উদ্যোক্তা বিনিয়োগের পরিবেশ পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে তাই কঠিন ভারসাম্যের কাজ। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, কিন্তু উৎপাদন থামিয়ে নয়; চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কিন্তু বিনিয়োগ শ্বাসরুদ্ধ করে নয়; আর্থিক শৃঙ্খলা আনতে হবে, কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল করে নয়।
সুদের হার সেই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু সুদের হারের ওপর নির্ভরশীল করলে সাফল্য সীমিত থাকবে। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার, সরকারি ব্যয়, ব্যাংকিং খাত, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষাকে একই নীতিচক্রের মধ্যে আনতে হবে।
খালিদুর রহমান: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ইমেইল: khalid_sust@yahoo.com
