সংবিধান সংশোধনে দুই-তৃতীয়াংশের ফাঁদ: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি জনস্বার্থ?
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠকে সাংবাদিকদের মূল প্রস্তাব ও শঙ্কাগুলো কী ছিল? অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন এড়ানো ও জনস্বার্থ রক্ষার তাগিদ তুলে ধরে লিখেছেন আমীন আল রশীদ।
২০১০-১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর যে প্রক্রিয়া ছিল—যেভাবে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং ওই সময়ে বিশেষ কমিটি যেভাবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত নিয়েছিল; যেভাবে বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল এবং এর সমালোচনা করেছে—এবারও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে।
২০১০ সালের ২১ জুলাই বিশেষ কমিটি গঠনের সময় তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির কাছে নাম চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখনকার বিরোধী দল বিএনপি কারো নাম দেয়নি। বরং তারা কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল। এরপর কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিএনপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিটিকে পাল্টা চিঠি দিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া লিখেছিলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের জন্য যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা দূরভিসন্ধিমূলক।’
এবারও সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হলেও বিরোধী দল তাতে নাম দেয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়ায় তারা অনুপস্থিত। এবারও বিশেষ কমিটি সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত নিচ্ছে, তাদের কথা শুনছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২৯ সেপ্টেম্বর বিকালে সংসদ ভবনে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার শীর্ষ ব্যক্তি এবং টেলিভিশনের টকশোতে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন—এরকম বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করে বিশেষ কমিটি। এটি ছিল বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক।
বৈঠকে ২০১০-১১ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে বলা হয়, তখনও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বিচারপতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিল, তাদের মতামত নিয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ সুপারিশই কমিটি গ্রহণ করেনি। যেমন ২০১১ সালের ৩ মে বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যে বৈঠক হয়, সেখানে রেহমান সোবহান, আকবর আলি খান, আসিফ নজরুল, বদিউল আলম মজুমদারসহ প্রায় ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে বহাল রাখা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, রাষ্ট্রধর্ম বাতিলসহ নানা সুপারিশ করেন।
পরদিন অর্থাৎ ৪ মে বিশেষ কমিটি বৈঠক করেছিল জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকদের সঙ্গে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের অনেকেই সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং তারাও অনেক সুপারিশ করেন। কিন্তু ৩০ মে বৈঠকে সবার মতামত উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বিশেষ কমিটি। ফলে এবারও ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না, সাংবাদিকদের মধ্যে সেই প্রশ্ন ছিল। এর জবাবে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ এবং কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেন, তারা অতীতের মতো শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য বিশিষ্টজনদের মতামত নিচ্ছেন না; বরং তারা বিবেচনায় নেওয়ার জন্যই মতামত নিচ্ছেন। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা এবং এর গঠন প্রক্রিয়া কী হবে—সেটি এখনও কমিটি ঠিক করতে পারেনি জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সংসদ সদস্য পদ বাতিল সম্পর্কিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনে বিএনপি তথা সরকারি দলের যে সুপারিশ—কেবল আস্থা বিল, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নের বাইরে অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা ভোটদানে স্বাধীন থাকবেন—সেই জায়গায়ও সাংবাদিকদের কাছে সুনির্দিষ্ট মতামত চেয়েছে কমিটি।
শুরু থেকেই বিরোধী জোট সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় ২০১০-১১ সালের মতো পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী জোটকে যুক্ত রাখার পরামর্শ দেন সাংবাদিকরা। জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়; তারা শুধু বিরোধী দলকে আহ্বান জানাতে পারেন, সাড়া দেওয়ার দায়িত্ব বিরোধী জোটেরই। তবে বিরোধী দল যাতে সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে, সেজন্য তাদেরকে অনুরোধ জানাতে সাংবাদিকদের প্রতিও অনুরোধ জানান কমিটির সভাপতি।
আলোচনায় সাংবাদিকদের অনেকে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা উচ্চকক্ষ গঠন না করার পরামর্শ দেন। তাদের যুক্তি হলো, সংসদে প্রাপ্ত আসন অথবা ভোটের অনুপাত—যেকোনো প্রক্রিয়ায় ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে এবং সেটি সমাজের নানা শ্রেণিপেশা ও গোষ্ঠীর মধ্য থেকে নির্বাচিত করা হলে নাগরিক সমাজের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়বে। উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার লোভে শিক্ষক-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী এবং এনজিও ব্যক্তিত্বদের মধ্যে দলবাজি বেড়ে যাবে। তার মধ্য দিয়ে দেশের সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ আরও দুর্বল হবে। সাংবাদিকরা মনে করেন, সরকারকে সঠিক পথে রাখতে তথা তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে একটি শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার পরামর্শ অনেকেই দিয়েছেন। কিন্তু সেই ভারসাম্য বলতে আসলে কী বুঝায় এবং ভারসাম্য আনতে গিয়ে দ্বৈত শাসন চালু হয় কি না, তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে, সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতেই মূলত সর্বময় ক্ষমতা থাকে। সেখানে রাষ্ট্রপতির কাছে ঠিক কোন কোন ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং সেই ক্ষমতা দিতে গিয়ে দ্বৈত শাসনের মতো অবস্থা তৈরি হয় কি না, সে বিষয়ে খেয়াল রাখারও পরামর্শ দেয়া হয়।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তথা ভোটের রাজনীতির জন্য সংবিধানের যে ধর্মীয়করণ করা হয়েছিল, সেখান থেকে বের হওয়ার একটা পথ বের করা যায় কি না, এমন প্রস্তাবও কেউ কেউ দিয়েছেন।
আরেকটা বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। সেটি হলো, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধানে যেকোনো পরিবর্তন আনা যায়। যেমন আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল বলে ২০১১ সালে তারা সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। ওই সময়ে তাদের মূল টার্গেট ছিল বাহাত্তরের মূল সংবিধানের চার মূলনীতিসহ অন্যান্য বিধানগুলো ফিরিয়ে আনা—যেগুলো পরবর্তীতে পরিবর্তন করা হয়েছিল। যদিও বাহাত্তরের মূল সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম না থাকলেও পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের সাহস আওয়ামী লীগ দেখায়নি। কারণ তারা জানতো, এটা করলে ভোট কমে যাবে।
এবার বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে একইভাবে সংবিধানের অনেক মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন আনতে চায়। তারা মূলত সংবিধানকে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়—এ কথাও তাদের তরফে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ চেয়েছিল বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে; এবার বিএনপি চাচ্ছে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে—যেখানে বাহাত্তরের মূলনীতি পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে আবার কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলে তখন কি আবারও সংবিধান পরিবর্তন করা হবে? অর্থাৎ বিএনপি এবার যে পরিবর্তনগুলো আনবে, সেগুলো কি ভবিষ্যতে আবারও বদলে যাবে?
বাস্তবতা হলো, প্রতিবারই সংশোধনীর সময় সরকারি দল জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলে। যেমন বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ৪ আগস্ট দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে। এদিন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, জনপ্রত্যাশা, জুলাই সনদ এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হবে। অর্থাৎ এখানে বিষয় তিনটি: ১. জনপ্রত্যাশা, ২. জুলাই সনদ এবং ৩. বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার। জুলাই সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহার লিখিত ডকুমেন্ট এবং এগুলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত হলেও জনপ্রত্যাশার বিষয়টি বিতর্কিত। কেননা এ পর্যন্ত যে ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, তার প্রতিবারই এই জনপ্রত্যাশার দোহাই দেয়া হলেও অধিকাংশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং ক্ষমতাসীন দলের অভিপ্রায়ই প্রাধান্য পেয়েছে।
ফলে এবার সংবিধান সংশোধনে যে বিশেষ কমিটি হলো, তারা অতীতের মতো দলীয় স্বার্থে নয়, বরং সত্যিই দেশ ও মানুষের স্বার্থে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবে—এই প্রত্যাশা জনমনে আছে। সেই সঙ্গে জনগণের অভিপ্রায় বলে বিএনপি নিজেদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে না; বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করে, এমন কোনো বিধান তারা সংবিধানে যুক্ত করবে না, এটিই প্রত্যাশা। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সংশোধন তথা পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবিধানের অনেক বিধান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়। তবে অবশ্যই সেটি হতে হবে জনস্বার্থে; ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে নয়, ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেখানে সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য ৩৫টি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে শুরুতেই বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে এবার বিশেষ কমিটিকে সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় জুলাই সনদ এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকে বিবেচনায় রাখতে হবে—সেই সঙ্গে অবশ্যই জনস্বার্থ। অর্থাৎ এই তিনটির সমন্বয় ঘটানোই হবে বিশেষ কমিটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইল: aminalrasheed@gmail.com
