২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ছেলেদের কাঁদতে নেই’, এই কথাই কি তাদের খুনি বানাচ্ছে?

স্মার্টফোনের জন্য কাছের বন্ধুকে খুন করার মতো ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়।

‘ছেলেদের কাঁদতে নেই’, এই কথাই কি তাদের খুনি বানাচ্ছে?

ছবি: ওপেনএআই

সানজিদা শাহরিয়া সানজিদা শাহরিয়া

Published : 21 Sep 2026, 02:29 PM

Updated : 21 Sep 2026, 02:39 PM

স্মার্টফোনের জন্য কাছের বন্ধুকে খুন করার মতো ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। আমাদের নতুন প্রজন্মের একটি অংশ কেন এমন ভয়ংকর পথ বেছে নিচ্ছে? এর পেছনে কাজ করছে লিঙ্গভিত্তিক মানসিক জটিলতা, অস্তিত্বের সংকট, জনসংখ্যার প্রবল চাপ এবং ডিজিটাল ভোগবাদের এক বিষাক্ত মিশ্রণ। বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণ করা হলো।

গোপালগঞ্জে আইফোন ও টাকার লোভে সিয়াম মোল্লাকে খুন করেছে তারই বন্ধুরা। কুমিল্লায় মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়ে আর ঘরে ফেরেনি অপ্রতীম। বরগুনায় মোবাইল কেনার টাকা জোগাড় করতে না পেরে বন্ধু রহিমকে হত্যা করেছে এক কিশোর। ঘটনাগুলোর স্থান ও পাত্র আলাদা হলেও অপরাধের ধরন একই—শিকার হচ্ছে কাছের মানুষ, আর এর পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছে প্রযুক্তিপণ্য। যদিও অভিযুক্তদের বিচার চলছে এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী বলা যায় না, তবে এই প্রবণতা রীতিমতো উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশে ছেলেরা সাধারণত আক্রমণাত্মক আচরণ, মাদকাসক্তি বা হিংসার মতো বাহ্যিক সমস্যাগুলোতে বেশি ভোগে। অন্যদিকে মেয়েরা ভোগে ভেতরের মানসিক যন্ত্রণায়—যেমন বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও আত্মপীড়নে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সি ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে ছেলেদের হার (১৩ দশমিক ৭ শতাংশ) মেয়েদের (১১ দশমিক ৫ শতাংশ ) তুলনায় বেশি।

২০২৫ সালের এক গবেষণায় (খাতুন ও অন্যান্য) দেখা গেছে, ময়মনসিংহ বিভাগের ১৫ থেকে ২১ বছর বয়সি কিশোরদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং উদ্বেগের হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ; যা মূলত ছেলেদের মাঝেই বেশি। ঢাকার স্কুলগামী কিশোরদের মধ্যেও বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার প্রায় ৮১ শতাংশের ওপরে।

এর একটি বড় কারণ হলো—আমাদের সমাজে ছেলেদের শেখানো হয় আবেগ লুকিয়ে রাখতে এবং তথাকথিত ‘পুরুষত্বের মুখোশ’ পরে থাকতে। ‘ছেলেরা কাঁদে না’ বা ‘ছেলেরা ভয় পায় না’—সমাজের এই অলিখিত নিয়মগুলো তাদের সাহায্য চাওয়ার পথ সংকুচিত করে দেয়। চলতি বছর ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম মানসিক সহায়তা চেয়ে থাকে। ফলে ভেতরে জমতে থাকা যন্ত্রণা একসময় চরম আকার ধারণ করে, যার সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটে কাছের বন্ধুর ওপর।

এই প্রজন্মের সংকটের মূলে রয়েছে অস্তিত্বের সংকট—জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ খুঁজে না পাওয়ার এক বিরাট শূন্যতা। দেশের বিপুল জনসংখ্যার চাপে এই শূন্যতা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যা সাড়ে ১৭ কোটির বেশি; যার প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছায়, কিন্তু তারা উপযুক্ত কাজ পায় না।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২২ সালের তথ্যমতে, দেশের ৪১ শতাংশ তরুণ পড়াশোনা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। ২০২৩ সালে দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ, যা বিশ্ব গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা স্নাতকদের বেকারত্বের হারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

গবেষণা বলছে, এই তরুণরা ক্যারিয়ারের ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, মৃত্যুর ভয় এবং নিজের পরিচয় নিয়ে চরম সংকটে ভুগছে। ‘ভলান্টাস’-এর ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সূচকে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণদের জীবনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের বড্ড অভাব। জীবনের এই লক্ষ্যহীনতা থেকেই তাদের মধ্যে চরম নেতিবাচকতা (শূন্যবাদ), আত্মমগ্নতা (নার্সিসিজম) ও হিংসার প্রতি প্রবল আকর্ষণ জন্ম নেয়।

অস্তিত্বের এই শূন্যতার মাঝে একটি স্মার্টফোনই যেন হয়ে ওঠে সমাজে নিজেকে প্রমাণের একমাত্র উপায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চটকদার বিজ্ঞাপন আর ব্র্যান্ডের নেশা তরুণদের মগজ ধোলাই করে বোঝায়—‘দামি ফোন না থাকলে তোমার কোনো দাম নেই।’ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটের অন্ধকার জগৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের একটা বড় অংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত এবং তাদের অনেকেই নারীদের প্রতি বিকৃত মানসিকতা পোষণ করে। অতিরিক্ত ইন্টারনেট ও গেমিং আসক্তি, অনলাইন জুয়া এবং রাত জেগে ছোট ছোট ভিডিও দেখার কারণে তরুণদের ভালো-মন্দের বিচারবোধ লোপ পাচ্ছে।

মাদকের টাকা জোগাড় করার সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে উঠেছে দামি মোবাইল ছিনতাই। র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে সারা দেশে ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে; তাদের মোবাইল ফোন ঘেঁটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে অপরাধের পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মনোবিজ্ঞান বলছে, বন্ধুর হাতে দামি জিনিস দেখলে সেই বন্ধুই নিজের ব্যর্থতার জীবন্ত আয়না হয়ে ওঠে। মানুষের অবচেতন মনের আদিম প্রবৃত্তি তখন বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং এখনই পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। অন্যদিকে, ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের নৈতিকতার চেয়ে ‘শক্ত হওয়ার’ শিক্ষা বেশি দেওয়ায় তাদের বিবেক বা নৈতিক সত্তা থাকে দুর্বল। ফলে তাদের বাস্তববোধ সঠিক পথ হারায়। তখন মানুষের ভেতরের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি বা মৃত্যু-তাড়না বাইরের দিকে ধাবিত হয়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ঈর্ষা শুধু জিনিসটা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং যে আয়না নিজের ব্যর্থতা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাকে ধ্বংস করার ইচ্ছাও তৈরি করে। তখন বন্ধু আর বন্ধু থাকে না; হয়ে ওঠে ব্যর্থতার আক্রোশের শিকার।

এই সংকট থেকে উত্তরণে শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ, সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন এবং একটি সমতাপূর্ণ সমাজ। বিপুল এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে তরুণদের জন্য অর্থবহ কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

সবার আগে ছেলেদের শেখাতে হবে—কীভাবে কাঁদতে হয়, মন খারাপ হলে কীভাবে সাহায্য চাইতে হয় এবং আবেগ প্রকাশ করতে হয়। তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া পুরুষত্বের মিথ্যা মুখোশ খুলে ফেলতে হবে। তা না হলে, আমাদের সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্ধুত্বকে বাঁচাতে হলে সবার আগে জীবনের অর্থকে বাঁচাতে হবে।