কোন বই বিপজ্জনক, কে ঠিক করছে?
আমরা একটি বইয়ের বিপজ্জনকতা নির্ধারণ করছি কী দিয়ে—লেখকের বর্তমান রাজনৈতিক প্রতীকী পরিচয় নাকি বইটির বিষয়বস্তু, ঐতিহাসিক মূল্য এবং সামাজিক কাজ দিয়ে?
একটি বই নিষিদ্ধ নয়। তবু সেটি বিক্রি করতে গিয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্রে হট্টগোল হলো, শাটার নামল, দুই কর্মীকে নিয়ে যাওয়া হলো পুলিশ ফাঁড়িতে। অন্যদিকে আল-কায়েদা ও আইএসের নেতা ও মতাদর্শীদের লেখা বা বক্তব্যভিত্তিক এমন প্রকাশনা ঢাকার দোকান, অনলাইন বিপণি এবং সরকারি ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত বইমেলা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার কোনো কোনোটিতে বেসামরিক মানুষ হত্যা, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোয় নাশকতা এবং রাষ্ট্র অস্থিতিশীল করার পক্ষে বক্তব্য থাকার কথা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দুটি ঘটনা এক নয়; এক করে দেখানোও উচিত নয়। কিন্তু একই সময়ের ঢাকায় পাশাপাশি এরকম ঘটনা ঘটলে একটি অস্বস্তিকর বুদ্ধিবৃত্তিক অসংগতি চোখ এড়ায় না।
আমরা একটি বইয়ের বিপজ্জনকতা নির্ধারণ করছি কী দিয়ে—লেখকের বর্তমান রাজনৈতিক প্রতীকী পরিচয় দিয়ে, নাকি বইটির বিষয়বস্তু, ঐতিহাসিক মূল্য এবং সামাজিক কাজ দিয়ে?
শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে জরুরি। বইটির গুরুত্ব শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মর্যাদা দিয়ে শুরু বা শেষ করার প্রয়োজন নেই। বরং বইটিকে লেখকের পরবর্তী ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে খানিকটা দূরে সরিয়ে রাখলেই এর আকর্ষণ আরও পরিষ্কার হয়।
কারণ বইটি খুললে পাঠক ১৯৭১ সালের সম্পূর্ণ নির্মিত কোনো জাতীয় নায়ককে শুরুতেই পান না; পান একজন মানুষকে রাজনৈতিকভাবে তৈরি হতে।
এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪০-এর দশকের শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী। তার রাজনীতিতে মুসলিম লীগ আছে, পাকিস্তানের আকাঙ্ক্ষা আছে, দেশভাগ আছে। এরপর ওই পাকিস্তানের ভেতরেই ভাষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক ক্ষমতা ও বৈষম্যের প্রশ্ন ক্রমে বড় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ একই রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে পাকিস্তান চাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকারের রাজনীতি, দুটিই আছে।
একে অসংগতি মনে হয় শুধু তখনই, যখন আমরা ইতিহাসকে শেষ পৃষ্ঠা থেকে পড়তে শুরু করি।
আমরা জানি ১৯৭১ সালে কী ঘটেছে। ফলে পেছনে তাকিয়ে অনেক সময় এমন একটি ইতিহাস বানাই, যেন ১৯৪৭ থেকেই সবাই জানতেন গল্পটি কোথায় গিয়ে শেষ হবে; যেন পাকিস্তান ছিল কেবল ভুল একটি স্টেশন, আর স্বাধীন বাংলাদেশ ছিল আগে থেকেই লেখা চূড়ান্ত গন্তব্য।
বাস্তব ইতিহাস এত সুবোধ ছিল না।
পূর্ব বাংলার বিপুলসংখ্যক মুসলিম জনসাধারণের কাছে পাকিস্তান একসময় বাস্তব রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল। বাংলাদেশের জন্ম বুঝতে হলে তাই শুধু জানতে হবে না কেন বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল; জানতে হবে, পাকিস্তান প্রথমে কেন আকর্ষণীয় হয়েছিল এবং মাত্র দুই দশকের মধ্যে ওই রাষ্ট্রই কেন পূর্ব বাংলার একটি বড় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কল্পনার জন্য অপর্যাপ্ত হয়ে গেল।
এই প্রশ্নের ভেতরে ভাষা আন্দোলন আছে, কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক আছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে, প্রতিনিধিত্বের সংকট আছে, সাংস্কৃতিক পরিচয় আছে। সবচেয়ে বেশি আছে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন।
মানুষ জন্মের সময় একটি জাতীয়তাবাদ পকেটে নিয়ে আসে না। ইতিহাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়, বদলায়, কখনো ভেঙেও যায়।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী ওই পরিবর্তন দেখার একটি উৎস। একমাত্র উৎস নয়, প্রশ্নাতীত উৎসও নয়।
স্মৃতিকথা আদালতের সাক্ষ্য নয় যে প্রতিটি বাক্য প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে; ধর্মগ্রন্থও নয় যে বিশ্বাস করতেই হবে। স্মৃতি বেছে নেয়, কিছু ভুলে যায়, কিছু ঘটনাকে পরে পাওয়া রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোয় নতুন অর্থ দেয়। ইতিহাসবিদের কাছে সেটিই গবেষণার বিষয়।
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয়তাবাদের পরিবর্তন বোঝার উপাদান হিসেবে পড়া হয়েছে। অন্য গবেষণায় শেখ মুজিবের স্মৃতিকথাকে বদরুদ্দীন উমরসহ ভিন্ন স্মৃতিবয়ানের পাশে রেখে দেখা হয়েছে; কোথায় স্মৃতি মেলে, কোথায় বিরোধ তৈরি হয়, কীভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজের অতীতকে নির্মাণ করেন। ইতিহাসচর্চার সৌন্দর্য এখানেই, একটি কণ্ঠের পাশে আরেকটি কণ্ঠ রাখা যায়; একটির সঙ্গে আরেকটির তর্ক করানো যায়।
একটি কণ্ঠ সরিয়ে দিলে ইতিহাস নিরপেক্ষ হয় না। তথ্যভান্ডারটি শুধু একটু দরিদ্র হয়।
বর্তমান রাজনীতি যখন ঐতিহাসিক উৎসের মালিকানা নিতে শুরু করে, তখন সমস্যাটি আরও গভীর। তখন একটি বই হাতে নিয়ে প্রথম প্রশ্ন হয় না, ‘এটি থেকে কী জানা যায়?’; প্রশ্ন হয়ে যায়, ‘এটি কার বই?’
১৯৪০-এর দশকের শেখ মুজিবকে ২০২৬ সালের দলীয় বিভাজনের মধ্যে আটকে পড়তে হয়। আজকের আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন বা বিরোধিতা দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন তরুণ কর্মীকে বোঝার চেষ্টা করতে হয়। এতে বর্তমান রাজনীতি হয়তো সহজ হয়, ইতিহাস হয় না।
এই কারণেই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়া বইটি সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি অস্বস্তিকর। পড়লে দেখা যায় ইতিহাসে মানুষ বদলায়, রাজনৈতিক প্রকল্প ব্যর্থ হয়, পরিচয় পুনর্গঠিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যও ইতিহাসের বাইরে কোনো চিরস্থায়ী বিষয় নয়।
স্লোগানের এই ঝামেলা নেই। স্লোগানের বড় সুবিধা, তার পাদটীকা লাগে না। ইতিহাসের দুর্ভাগ্য, তার লাগে।
এরপর অন্য বইয়ের তাকটির দিকে তাকানো যাক। ঢাকা স্ট্রিমের অনুসন্ধানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলায় অন্তত দশটি প্রকাশকের স্টলে আল-কায়েদা, আইএস ও সংশ্লিষ্ট জিহাদি সংগঠনের নেতা ও মতাদর্শীদের লেখা বা বক্তব্যভিত্তিক বাংলা প্রকাশনা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে পরীক্ষিত কিছু বইয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যা, অবকাঠামোয় নাশকতা এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার পক্ষে বক্তব্য থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, বিষয়টি তাদের জানা ছিল না এবং আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট বই পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই তথ্য থেকে ‘উগ্রপন্থির লেখা মানেই নিষিদ্ধ করতে হবে’, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া আরেক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য হবে।
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণা করতে হলে আল-কায়েদার দলিলও পড়তে হবে। ফ্যাসিবাদের মূল চরিত্র বুঝতে ফ্যাসিবাদীদের লেখা পড়তে হয়। রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গবেষককে সহিংসতার পক্ষের যুক্তিও পরীক্ষা করতে হয়।
কিন্তু সংরক্ষণ আর প্রচার এক বিষয় নয়। গবেষণার উপকরণ হিসেবে কোনো লেখা রাখা এবং বেসামরিক মানুষ হত্যার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাকারী বক্তব্যকে সাধারণ ধর্মীয় জ্ঞানের বইয়ের মতো বাজারজাত করা একই সামাজিক কাজ নয়।
লেখকের পরিচয়ের পাশাপাশি তাই তিনটি বিষয় জরুরি; লেখাটি কী বলছে, কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং কোন পরিসরে কী উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে।
আর এই মাপকাঠি দুই দিকেই প্রয়োগ করা দরকার।
শেখ মুজিব লিখেছেন বলেই একটি বই ঐতিহাসিকভাবে সত্য হয়ে যায় না; আবার শেখ মুজিব লিখেছেন বলেই সেটি ২০২৬ সালের দলীয় রাজনীতির নিষিদ্ধ বস্তুতেও পরিণত হয় না। একইভাবে আল-কায়েদার কারও নাম প্রচ্ছদে থাকাই একমাত্র বিশ্লেষণ নয়; ভেতরের বক্তব্য সহিংসতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা বা বৈধতা দিচ্ছে, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আমাদের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে যেন উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে হট্টগোল হলো। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইউপিএল বলেছে বইটি নিষিদ্ধ নয়; অন্য প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে জানানো হয়েছে, বইটি আর বিক্রি না করার শর্তে দুই কর্মীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে সহিংস জিহাদি মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত প্রকাশনা সরকারি প্রতিষ্ঠানের বইমেলা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পর আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলছেন, তারা জানতেন না। অনুসন্ধানের পর কিছু অনলাইন বিক্রেতা সংশ্লিষ্ট বই সরিয়ে নিলে তাদের বয়কটের ডাকও আসে; ঢাকা স্ট্রিম জানিয়েছে, প্রতিবেদন সরানোর দাবিতে তারা হুমকিও পেয়েছে।
বাংলাদেশের বিপদ শনাক্ত করার যন্ত্রটির ক্যালিব্রেশন নিয়ে তাই কথা বলা দরকার।
কারণ একটি সমাজ কোন বই পছন্দ করে, সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, কোন বইয়ের সামনে গিয়ে সে জরুরি ব্রেক টানে, সেটিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে এমন একটি স্মৃতিকথা, যেটি দিয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি অংশ নিয়ে তর্ক করা যায়; অন্যদিকে এমন প্রকাশনা, যার কিছুতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষ হত্যা ও রাষ্ট্র অস্থিতিশীল করার পক্ষে যুক্তি আছে।
প্রথমটির সঙ্গে দ্বিমত করার সবচেয়ে ভালো উপায় আরও ইতিহাস পড়া। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে প্রয়োজন বিষয়বস্তু, প্রচারের ধরন, আইন এবং সহিংসতায় প্ররোচনার প্রশ্নটি কঠোরভাবে পরীক্ষা করা।
দুটোর জন্য একই উত্তর প্রয়োজন নেই। কিন্তু দুটোর ক্ষেত্রেই বইটি খুলে পড়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ আকাশ থেকে পড়েনি। তার আগে পাকিস্তানের আকাঙ্ক্ষা ছিল, ওই আকাঙ্ক্ষার সংকট ছিল, ভাষা আন্দোলন ছিল, যুক্তফ্রন্ট ছিল, কেন্দ্র ও প্রদেশের সংঘাত ছিল, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য ছিল, মুসলমান পরিচয় ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে দীর্ঘ বোঝাপড়া ও পুনর্গঠন ছিল।
এই ইতিহাসের কোনো একটি উৎসকে দলীয় মালিকানায় দিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা কোনো দলের নয়। ক্ষতি আমাদের নিজেদের বোঝাপড়ার।
একটি পরিণত সমাজের ইতিহাসভান্ডার বাধ্যগত হয় না। সেখানে পরস্পরবিরোধী স্মৃতি থাকে, অস্বস্তিকর দলিল থাকে, ভুলও থাকে, আত্মপক্ষসমর্থনও থাকে। পাঠকের কাজ সেগুলোকে পাশাপাশি রেখে তর্ক করা।
বাংলাবাজারের সাম্প্রতিক দুটি বইয়ের তাক তাই আমাকে বই নিষিদ্ধ করার চেয়ে আরেকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি এখনও বইয়ের ভেতরের বক্তব্য পড়ে তার বিপদ বিচার করছি, নাকি প্রচ্ছদ দেখে ঠিক করছি কোন ইতিহাস আমাদের পড়া উচিত?
দ্বিতীয়টি সহজ। কিন্তু সহজ ইতিহাসের সমস্যা হলো, শেষ পর্যন্ত সেটি আমাদের নিজেদের দেশটিকেই বোঝার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ড. লুবনা ফেরদৌসী: সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক। ই-মেইল: lferdowsi@yahoo.com
