৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু তালা ঝুলানো নয়

বইয়ের উত্তর দেওয়া উচিত আরেকটি গবেষণাধর্মী বই দিয়ে, পেশিশক্তি ব্যবহার করে নয়।

সাজ্জাদ সাব্বির সাজ্জাদ সাব্বির

Published : 30 Sep 2026, 08:19 AM

Updated : 30 Sep 2026, 08:19 AM

আলোচনার শুরুতেই একটি অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু মৌলিক আইনি সত্য স্পষ্ট করা জরুরি—‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কোনো নিষিদ্ধ বই নয়। অথচ গত ২৮ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে যা ঘটে গেল, তা এই সাধারণ সত্যটিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর চেষ্টা। ইউপিএলে গিয়ে কতিপয় ব্যক্তি বইটিকে নিষিদ্ধ দাবি করে এর বিক্রি বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়ার একপর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর তারা বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে ধরে নিয়ে যান পুলিশ ফাঁড়িতে। সেখানে পুলিশের মধ্যস্থতায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কোনো বই নিষিদ্ধ কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষের হাতে নেই। কোনো বই ভালো লাগছে না, বইটির বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর, কিংবা লেখকের প্রতি বিরাগ আছে—এসব কারণে সেই বইকে নিষিদ্ধ বই হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ কোনো সভ্য আইনভিত্তিক ব্যবস্থায় থাকতে পারে না।

ইউপিএলের বক্তব্যও এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, “আমরা প্রকাশক হিসেবে, এবং বিশেষত একাডেমিক প্রকাশক হিসেবে মনে করি, কোনো ফৌজদারি অপরাধের উস্কানি নেই, এমন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ করাটা জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির সার্বিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।”

ইউপিএলের বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, “আমরা মনে করি, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিক্রমায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই, বাংলাদেশ সৃষ্টির ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। ইউপিএল তার প্রতিটি বই দায়িত্ব নিয়েই প্রকাশ করে। এই বইটি কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথানিয়মে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল যথাবিহিত আইন অনুসারে কাজ করবে।”

কোনো বইয়ে সন্ত্রাসবাদে উস্কানি, সরাসরি অপরাধে প্ররোচনা ও আইনে নির্ধারিত গুরুতর ক্ষতির বিষয় থাকলে রাষ্ট্রের হাতে সেই বইয়ের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। ধর্মীয় অনুভূতি, জনশৃঙ্খলা এবং অন্য কোনো সাংবিধানিক সীমার প্রশ্ন উঠলেও সেটির বিচার হবে আইনের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো কারণেই কোনো বই নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই। কাজেই কতিপয় ব্যক্তির পছন্দ না হওয়ায় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ওপর সামাজিকভাবে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ বোধ করছি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, মানহানি, আদালত অবমাননা ও অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ কোনো একজন ব্যক্তির বা কতিপয় ব্যক্তির কোনো একটি বই নিয়ে আপত্তি থাকলে তাদের জন্য আইনের আশ্রয় চাওয়ার পথ খোলা আছে। কিন্তু কয়েকজন ইচ্ছে হলেই একটি প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়ে দিতে পারেন না।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ঘিরে যে বিতর্ক, তাকে কেবল মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ইতিহাসের ফ্রেমে বেঁধে দেখার সুযোগ নেই। মূলত এই বইটি শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী—তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক উপলব্ধি এবং তৎকালীন সময়কে তার নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুধাবন করার প্রামাণ্য দলিল। স্বাভাবিকভাবেই, যেকোনো আত্মজীবনীর মতো এখানেও পাঠকের চোখে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষপাত ধরা পড়তে পারে। আমিও বইটিকে ইতিহাসের শতভাগ নির্মোহ দলিল মনে করি না—এমনকি একটি আত্মজীবনীকে সম্পূর্ণ নির্মোহ হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও দেখি না। একটি আত্মজীবনী নির্মোহ হলো কি হলো না, সেই বিচার দিয়ে এর ঐতিহাসিক মূল্য উপেক্ষা করা যায় না।

ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানেন, একটি সময়কে বোঝার জন্য একই ঘটনার বহু বয়ান পড়তে হয়। একজন রাজনৈতিক নেতার আত্মজীবনী সেই নেতার নিজের চোখ দিয়ে সময়টিকে দেখার সুযোগ দেয়। সেই বয়ানকে অন্য বই, দলিল, সংবাদপত্র, গবেষণা ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে পড়াই ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক পদ্ধতি।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সেই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। বইটিতে দেশভাগের সময় থেকে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন, ভাষার প্রশ্ন, মুসলিম লীগ, যুক্তফ্রন্ট, সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানীসহ বহু রাজনৈতিক চরিত্র ও ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। বইটিকে বাঙালির ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ এবং পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ আত্মজীবনীমূলক উৎস হিসেবে মনে করা হয়।

আমার নিজের ইতিহাস পাঠেও বইটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা ও ভাসানীকে জানতে বইটি আমাকে সাহায্য করেছে। শেখ মুজিবুর রহমানকে তার নিজের রাজনৈতিক ভাষ্য থেকে বোঝার সুযোগও দিয়েছে এই বইটি। কোনো পাঠক বইটির সঙ্গে একমত হতে পারেন, দ্বিমত করতে পারেন, আবার বইটির অনেক বক্তব্যের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্নও তুলতে পারেন। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাঠকের আছে এবং থাকা দরকার। কিন্তু বইকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করার ক্ষমতা নয়।

বই নিষিদ্ধ করার প্রবণতার বড় বিপদ হচ্ছে—যদি একটি পক্ষের অপছন্দের বই বন্ধ করা হয়, তবে আগামীকাল অন্য একটি পক্ষ অন্য একটি বই নিষিদ্ধ করার আওয়াজ তুলতে পারে। তখন ইতিহাস আর অনুসন্ধানের বিষয় থাকবে না; ইতিহাস হয়ে উঠবে ক্ষমতাবান পক্ষের অনুমোদিত পাঠ।

সমাজ তখন ধীরে ধীরে বহু বইয়ের পাঠক থেকে সংকুচিত হয়ে নির্ধারিত কয়েকটি বইয়ের পাঠকে পরিণত হয়। এটি জ্ঞানচর্চার জন্য ভয়ংকর হতে পারে। বিশ্বের ইতিহাসে বই নিষিদ্ধ করার প্রবণতা নতুন নয়। নাৎসি জার্মানির বই পোড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে বই নিষিদ্ধ করার বহু ঘটনা আছে। এসব ঘটনার পেছনে একটি সাধারণ প্রবণতা কাজ করেছে—শাসকগোষ্ঠী যে বয়ানকে বিপজ্জনক মনে করেছে, সেটিকে পাঠকের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে বহুবাচনিক একটি দেশে আমাদের পথটি অন্য রকম হওয়া দরকার। এখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই থাকবে, শেখ মুজিবের আত্মজীবনী থাকবে, তার সমালোচকদের বই থাকবে, আওয়ামী লীগের ইতিহাস থাকবে, আওয়ামী লীগের সমালোচনাও থাকবে, পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন রাজনৈতিক বয়ান থাকবে, মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকবে, গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে বই থাকবে, এমনকি জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলোর বই থাকবে। সোজা কথায়—কুখ্যাত এবং বিখ্যাত, দুই ধরনের বই-ই থাকবে।

পাঠক পড়বে, তুলনা করবে, প্রশ্ন করবে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে তৈরি করবে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তার উত্তর হওয়া উচিত আরেকটি বই। কেউ বইটিতে ইতিহাসের কোনো ঘটনা একপেশেভাবে এসেছে মনে করলে, তিনি গবেষণা করে তার জবাব দিতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক চরিত্রকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে কারোর মনে হলে, তিনি দলিল দিয়ে সেটি দেখাতে পারেন। বইয়ের দোকানে তালা দিয়ে ইতিহাসের বিতর্কের সমাধান হবে না।

সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ইমেইল:sajjadsabbir24@gmail.com