হাফপ্যান্ট নাকি হাফ কনসার্ন?
পোশাকের স্বাধীনতা ও নীতি পুলিশির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সার্বজনীন হলেও নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গের অধিকারের প্রশ্নেও সমপরিমাণ সংবেদনশীলতা দেখানো জরুরি।
সম্প্রতি একজন দৌড়বিদকে শর্টস পরে মেট্রোরেলে উঠতে দেয়নি পুলিশ। এই নিয়ে ঢাকা শহরের পুরুষ সমাজের বড় অংশ এবং নারী সমাজেরও একাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন। ফেইসবুকে চোখ পাতলে দেখা যাচ্ছে দেড় হাজার লোক (নারী-পুরুষ-ট্রান্স নির্বিশেষে) আগ্রহ দেখিয়েছেন বা ‘ইন্টারেস্টেড’ বাটনে ক্লিক করেছেন এক প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশ নিতে। প্রতিবাদটি এরকম, একটি নির্দিষ্ট দিনে সকলে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে ভ্রমণ করবেন। দেখা যাক পুলিশ কয়জনকে আটকায়!
বেশ সুন্দর আইডিয়া! তবে আইডিয়া নতুন নয়।
এই ধরনের প্রতিবাদ এ দেশে আগেও হয়েছে। কিছুদিন আগে নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে জিন্স ও টপ পরা একটি মেয়েকে নিদারুণ হেনস্থা করেছিলেন একজন বোরকা পরা নারী এবং আরও কিছু লোক। এই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকার নারীবাদীদের একাংশ জিন্স ও টপ পরে নরসিংদী স্টেশনে গিয়েছিলেন এবং ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া সার্ক ফোয়ারার মোড়ে অবস্থিত বিলুপ্তপ্রায় পান্থকুঞ্জ পার্কের ওপর উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিবাদে অবস্থান ধর্মঘট করছিলেন কিছু মানুষ। সেখানে গিয়ে হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলে পোশাকের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন ঢাকার নারীবাদীরা।
সুতরাং বলা চলে, মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট পরে ভ্রমণ করার এই প্রতীকী প্রতিবাদ অভিনব কিছু নয়। নতুনত্ব বলতে এইটুকুই যে, এখন প্রতিবাদ করছেন প্রধানত পুরুষেরা। দুনিয়ার মোটামুটি সব জায়গায় পোশাক নিয়ে প্রতিবাদ করতে হয় নারীকেই। ইরানে মাশা আমিনীর স্কার্ফের পাশ দিয়ে চুল দেখা যাচ্ছে বলে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর ইরানের নারীরা নিজেদের মাথার লম্বা চুলের কিছু অংশ কেটে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। স্কার্ফ উড়িয়ে ছবি তুলেও ইরানের নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে দেখা গেছে বহু আগেই। সম্প্রতি আবার ফ্রান্সের নারীদের অমুসলিম হয়েও গলায় ও মাথায় স্কার্ফ পেঁচিয়ে মুসলিম নারীদের মাথা ঢেকে রাখার স্বাধীনতার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
নারীদের কাছে বিষয়টি কখনোই হিজাব বা জিন্স-টপ বা অন্য কিছু নয়। বিষয়টি ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে, মোরাল পুলিশিং নিয়ে, পোশাকের কারণে হেনস্তা হওয়ার বিরুদ্ধে। চুল কেটে, স্কার্ফ উড়িয়ে, জিন্স-টপ পরে, টিপ পরে প্রতিবাদ করাটা একটা প্রতীকী বিষয়। পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীরা কপালে টিপ পরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
অবশ্য আমাদের দেশে এহেন প্রতীককে ভুলভাবে ব্যবহার হতেই বেশি দেখা যায়। যেমন একাধিক আন্দোলনে দেখা গেছে প্রতিবাদী জনতা ক্ষমতাসীন কোনো দলের শিক্ষার্থী ভেক ধরা গুণ্ডাপাণ্ডাদের ঠেকাতে ব্যর্থ পুলিশকে চুড়ি-বালা উপহার দিয়েছে। যে কোনো সময়ই যে কোনো পুরুষ যথোচিত (পড়ুন পুরুষসুলভ) সাহসিকতা দেখাতে ব্যর্থ হলেই চুড়ি পরে থাকতে বলা হয় তাদের। যদিও আজকাল অনেক পুরুষই শখ করে হাতে চুড়ি, বালা, রুলি ইত্যাদি পরেন। ভারতে একটি জনগোষ্ঠীর পুরুষেরা তাদের পূর্বপুরুষের হত্যার প্রতিশোধ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাতে চুড়ি পরে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। তারা চুল-দাড়ি কাটেন না, সবসময় ছোট হলেও একটি ধারালো অস্ত্র সঙ্গে রাখেন এবং হাতে চুড়ি পরে থাকেন, বাচ্চা থেকে বুড়ো সব পুরুষ।
মানুষের সভ্যতায় প্রতীকের গুরুত্ব রয়েছে। হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠে পুরুষদের এই প্রতিবাদের প্রতি প্রয়োজনীয় সম্মান ও সংহতি জানাই। এই যে দেড় হাজার পুরুষ (এবং কয়েকজন অতিসাহসী নারী) হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে ভ্রমণ করতে চাইছেন, এদের মধ্যে দেড়শজনও কি নারীর পোশাক নিয়ে হেনস্তার প্রতিবাদে কোনো সমাবেশে যাবেন বা গেছেন? অনেক পুরুষই নারীস্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং নারীর অধিকারের অনেক সভা-সমাবেশে যান। কিন্তু তারা কয়জন? আমি এমন প্রচুর পুরুষকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং নির্দ্বিধায় বলতে পারি তারা ব্যতিক্রম, উদাহরণ নন; দৃষ্টান্তের মতোই বিরল তারা। আর বাকিরা? বলতে বাধ্য হচ্ছি, নারী বা ট্রান্সজেন্ডার কারও ক্ষেত্রে এই সংবেদনশীলতা তারা দেখাবেন না, বরং বিপরীত অবস্থানই নেবেন।
পুরুষকে নারীর তুলনায় অনেক কম ও সহজ পোশাক পরতে হয়। কোনো অন্তর্বাস ছাড়াই শুধু শার্ট বা টি-শার্ট এবং প্যান্ট বা লুঙ্গি পরে একজন পুরুষ ঘুরে বেড়াতে পারে। ঢাকা ক্লাব বা ডিপ্লোম্যাটিক জোন বা বিভিন্ন অভিজাত বার ছাড়া জুতো পরাও পুরুষের জন্য তেমন বাধ্যতামূলক নয়। কিছু কলোনিয়াল হ্যাংওভার তো থাকতেই পারে, যেমন স্যুট-টাই পরে অফিস করা ইত্যাদি। কিন্তু আদতে পুরুষের শরীর নিয়ে সামাজিক কোনো ট্যাবু নেই। অনেক পুরুষ মডেল বা অভিনেতা না হয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় খালি গায়ে সমুদ্রে বা ঝিরিতে স্নানের ছবি পোস্ট করেন।
এই যে পুরুষ ইচ্ছামতো শরীর খোলা রাখতে পারছেন, আর নারীকে আপাদমস্তক মুড়ে রেখেও ইরানে সামান্য চুল দেখা যাওয়ার ‘অপরাধে’ পুলিশের হাতে বা পাকিস্তানে জিন্স পরার কারণে সহোদর ভাইয়ের হাতে নির্যাতিত হয়ে মরে যেতে হচ্ছে মেয়েদের, এর কারণ একটাই। নারী শরীরকে মনে করা হয় যৌনতার আধার এবং পুরুষ শরীরকে দেখা হয় অযৌন বা অ্যাসেক্সুয়াল হিসেবে।
এই বিষয়টা পুরুষতন্ত্রের তৈরি করা, কিন্তু পুরুষের জন্যও এটা ভালো কিছু নয়। কেননা প্রকৃতির অমোঘ বিধান হচ্ছে নারী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি কামনা-বাসনা। এই কামনা দিয়েই মানুষের প্রজাতি রক্ষা হচ্ছে। অথচ পুরুষতন্ত্রের চোখরাঙানির ভয়ে পুরুষদেহকে অযৌন হিসেবে দেখতে বাধ্য হন নারী। নারীরও যে কামনা-বাসনা আছে, সে-ও যে পোশাকের ভাঁজ খুলে পুরুষদেহকে আবিষ্কার করতে চায় পরতে পরতে, ওই কথা এই পুরুষালি সভ্যতা স্বীকার করলে তো! নারীর কামনাকে অস্বীকার করে, দাবিয়ে রেখে নিজেদের অ্যাসেক্সুয়াল বানিয়ে নিজেরাই নারীর কাছে প্রেমিক না হয়ে ধর্ষক হয়ে গেছেন পুরুষেরা। তারা গরম লাগলেই শার্ট খুলে ফেলেন, প্রস্রাব পেলেই প্যান্টের জিপার খুলে এদিক-সেদিক দাঁড়িয়ে কাজ সেরে ফেলেন। তারা হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। অনেকেই হাফপ্যান্টের নামে এমন শর্টস পরেন যা টেনিস খেলোয়াড়দের পোশাক। চারপাশে কোনো নারী আছে কি না, তারা কামনার চোখে তাকাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে একটুও ভাবেন না তারা।
প্রকৃত প্রস্তাবে, নারীও এই স্বাধীনতাই চায়। প্রতিটি নারী চান তিনি তার পছন্দ অনুযায়ী বা সুবিধা অনুযায়ী পোশাকে সজ্জিত হয়ে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যাবেন। কে কোন চোখে দেখল, তা নিয়ে চিন্তিত হতে হবে না। কেউ দেখলে, কেউ মুগ্ধ হলে, কেউ কামাতুর হলে তার ওই কামনা-বাসনা তাদের নিজেদের কাছেই রাখবেন; তা নিয়ে কেউ কাউকে বিরক্ত করতে আসবে না। ব্যস, এইটুকুই তো চাওয়া। এতে এই সমাজ-সংসার একদম উল্টে যায় কেন? ভেঙে পড়ে কেন?
নারীবাদীরা সবসময় বলে আসছেন, নারী অধিকার আদতে মানবাধিকার। একজন নারী সমাজের কাছ থেকে যে সকল প্রতিবন্ধকতা প্রতি পদে ভোগ করতে বাধ্য হন, তার এক ক্ষুদ্রতম অংশও ভোগ করতে হলে পুরুষেরা কেমন ফুঁসে ওঠেন, তা দেখে ভালো লাগছে। আমি আশাবাদী হচ্ছি এই জন্য যে, বাংলাদেশের পুরুষেরা বুঝতে পারছেন নিজের সুবিধা, পছন্দ ও প্রয়োজনের পোশাক পরতে না পারলে, পোশাকের জন্য হেনস্তা হতে হলে কেমন অনুভূতি হয়! শরীরের কোনো অংশকে আপত্তিকর বিবেচনা করলে কেমন লাগে! শরীরের কোনো অংশ—সেটা মাথা হোক আর পা, ঢেকে রাখতে বাধ্য হলে কেমন লাগে!
আমি আশা করছি, প্রতিবাদে আগ্রহ ও সংহতি জানানো পুরুষেরা অন্যদেরর ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও, গণপরিবহনে অকারণে হেনস্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও সমান প্রতিবাদী হবেন এখন থেকে। তারা একচক্ষু হরিণের মতো নিজের বেলায় ষোলো আনা আর পরের বেলায় পিঠটানা হয়ে বসে থাকবেন না। তারা নিজেদের হাফপ্যান্টে আটকে থেকে হাফ কনসার্নড হয়ে জীবন কাটিয়ে দেবেন না। এই যারা বলেন মানুষের অধিকার রক্ষা হলেই যথেষ্ট, আলাদা করে নারীবাদের প্রয়োজন নেই; তারাও এখন থেকে সমাজনির্মিত নারী, পুরুষ ও অন্যদের ক্ষেত্রে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বৈত নৈতিকতার বিরুদ্ধাচরণ করবেন। সকলেই প্রকৃত অর্থে মানবিক হয়ে উঠলে নারীকেও আর আলাদা করে নারীবাদ চর্চা করতে হবে না নিশ্চয়ই।
উম্মে রায়হানা: কবি ও সাংবাদিক। ই-মেইল: ummedotrayhana@gmail.com
