Published : 07 Jul 2026, 07:38 AM
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কী স্বাধীন? জনপরিসরে এমন প্রশ্ন সচরাচর করা হয়ে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কখনও এই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। এই প্রশ্ন প্রবলভাবে সামনে আসে বিগত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে। একইভাবে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের অন্যতম জনপ্রিয় পরিভাষা ছিল—‘ঢাকা না দিল্লি; ঢাকা, ঢাকা’। এই পরিভাষাটি তৈরি হওয়ার পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ভারতকেন্দ্রিক’ পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রধান অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আওয়ামী লীগের পতনের পর সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে গঠিত ও ক্ষমতায়িত ‘কিংস পার্টি’ এবং সেটির নৈতিক ও প্রক্রিয়াশীল রাজনৈতিক অ্যালাইয়ের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘সিনা টান টান’ (স্ট্যান্ড টল) তত্ত্বের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতিকে ঢেলে সাজানো। এই জনতোষী ‘সিনা টান টান’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে এই নতুন রাজনৈতিক শক্তি যে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার সৃষ্টি করে, সেটির মেয়াদ ছিল তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আগ-পর্যন্ত। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর এই তত্ত্বের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস পালনকে কেন্দ্র করে সেই আলোচনা আবার সামনে এসেছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন ‘অক্ষ’ তৈরি হয়েছে। আর এই নতুন ‘পররাষ্ট্র অক্ষের’ সঙ্গে যুক্ত হতে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রে দেশ ও জাতির স্বার্থকে উপেক্ষা করতে হয়েছে।
এই নতুন অক্ষের আলোচনা আজ নয়; বরং এই লেখার মূল উদ্দেশ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী কী, সেটি বিশ্লেষণ করা। অর্থাৎ, কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনভাবে নিজের জাতির জন্য কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই সম্ভাবনা বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে? বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিবেচনায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হলো—‘দেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান’, ‘ক্রমবর্ধমান বিশাল অর্থনৈতিক বাজার’ ও ‘কাঠামোগত বিনিয়োগ’। অন্যান্য অনেক বিষয়সহ বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর মূলত এই তিনটি বিষয় নিয়েই বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। কারণ, সম্প্রতি এই তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয় বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কাছে আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত করেছে; যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য পররাষ্ট্রনীতির ‘শক্তি’ ও ‘দুর্বলতা’।
প্রথমত, ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর ও ভারত সাগরের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র অঞ্চলের একটি কৌশলগত প্রবেশপথ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ধরনের কৌশলগত রাষ্ট্র বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মিয়ানমার ও ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হতে হলে বৈশ্বিক শক্তির জন্য এই অঞ্চলে বাংলাদেশ একমাত্র ‘উপায়’। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশ হলো এমন একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিভাজিত রাজনীতির কারণে ক্ষমতা ও অর্থের ‘বুভুক্ষু’ জনগোষ্ঠীকে সহজেই ‘বশ’ করা যায়। দুর্বল রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট বিরাজমান থাকায় সম্প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আগ্রহও নজর কাড়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ, গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিযোগিতামূলক পররাষ্ট্রনীতি উল্লেখযোগ্য।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে লক্ষ্য করা যায়, পাকিস্তানের বাংলাদেশমুখী কূটনীতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়, হঠাৎ সেই বাংলাদেশের সমস্ত কিছুতে তাদের প্রবল আগ্রহ বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক রিয়ালিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পাকিস্তানের এই হঠাৎ পরিবর্তন আদর্শগত পরিবর্তনের চেয়ে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস বা ‘আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য’ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে হারানো কৌশলগত ক্ষতি পোষাতেই তাদের এই অতিব্যস্ততা। এই সময়ে ভারত কিছুটা স্থিতিশীল ও ‘সাবধানে চল’ নীতিতে চললেও, নতুন সরকারের সঙ্গে কথিত সমঝোতা ভারতের আগ্রহকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সর্বশেষ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী পুনঃআগমন। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা এবং বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা দেশটির ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর, ভারত সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন অন্যতম আগ্রহের কেন্দ্র।
দ্বিতীয়ত, বিশাল জনগোষ্ঠী ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা থাকায় বড় অর্থনীতির জন্য সহজলভ্য বাজার তৈরির একটি অমিত সম্ভাবনা আছে। এছাড়াও সস্তা শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে লাভজনক ব্যবসা করারও বিরাট সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রেও দেখা যায়, বৈশ্বিক অনেক শক্তি প্রবল আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের অনেক দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে এই ধরনের ব্যবসায় যুক্ত।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক অমিত সম্ভাবনা থাকলেও দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি সংকট রয়েছে। জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেহেতু একধরনের উন্নয়নের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তাই বিনিয়োগকারী দেশের জন্যও এটি একটি বিরাট সম্ভাবনার দেশ। তাই লক্ষ্য করা যায় যে, ধীরে ধীরে বাংলাদেশ কাঠামোগত বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই ক্ষেত্রে একসময় ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চাপা প্রতিযোগিতা বিরাজমান ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ চীনমুখী হয়ে পড়ে। কাঠামোগত উন্নয়নের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বর্তমানে এ খাতে চীনের একচ্ছত্র অধিপত্য।
সর্বোপরি বলা যায়, উপরোক্ত উপাদানগুলোই বাংলাদেশের কৌশলগত স্তম্ভ এবং এগুলোই দেশটির ভূরাজনৈতিক (জিওস্ট্রাটেজিক) অবস্থান ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কৌশলগত মূল্য (স্ট্রাটেজিক ভ্যালু) নির্ধারণ করে। এখন বাংলাদেশের এই কৌশলগত অবস্থানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কোন কোন বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায় একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনভাবে প্রণীত নাকি বহিরাগত শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন নাকি পরাধীন, সেটি পরিমাপের কোনো গাণিতিক সূত্র নেই। ফলে, দরকষাকষির সামর্থ্য ও সম্ভাবনাই ঠিক করে দেয় অপর পক্ষের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব। এবার ওপরের আলোচিত স্তম্ভগুলোর আলোকে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।
প্রথমত, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি সেই রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক লেভারেজ বাড়িয়ে তোলে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সহজ হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্র যদি বহুমুখী কূটনীতি বা কূটনৈতিক ভারসাম্যের মাধ্যমে সেই সক্ষমতা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে জাতিস্বার্থ রক্ষায় সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু দরকষাকষিতে সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে প্রয়োজন সক্ষমতা। শুধুমাত্র অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান থাকলেই হয় না, সক্ষমতা বিচার হয় গৃহের অবস্থার ভিত্তিতে। দেশে যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকে, জাতি হিসেবে যদি ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা থাকে এবং অন্য কোনো শক্তির প্রতি মুখাপেক্ষী না থাকা হয়; তাহলে সেই দেশের পক্ষে এই ভূ-কৌশলগত স্বার্থ বুঝে নেওয়া সহজ হয়। সেটি করা না গেলে উল্টো বাইরের শক্তির ক্রীড়নক হয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে নির্দিষ্ট ‘অক্ষকেন্দ্রিক’ ঝোঁক দেখা যাচ্ছে; সেটি বহুমুখী কূটনৈতিক সম্ভাবনাকে ম্রিয়মাণ করে নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর কূটনীতির বাজারে আপাত ‘বহুমুখী কূটনীতি’র কাঁচামাল জোগান দিলেও, এর আগের পররাষ্ট্র বিষয়ক কার্যক্রম সেই ‘স্বাধীনতাকে’ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর ভূরাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক দিক থেকে অধিকতর সফল একটি যাত্রা বলে উল্লেখ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ‘ক্রমবর্ধমান বিশাল অর্থনৈতিক বাজার’। আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রে নানান নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যের বাজার চাহিদা এবং স্বল্পমূল্যের জোগান বাংলাদেশকে অন্য অনেক রাষ্ট্রের কাছে অনেক আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলেছে। রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাজার। আবার আমদানির ক্ষেত্রে ভারত, চীন ও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম আগ্রহী দেশ। বিশাল জনগোষ্ঠী থাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সব ধরনের পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। এই অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারত বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তৈরির অন্যতম হাতিয়ার; কিন্তু বিশ্বশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের দুর্বল দরকষাকষির চিত্র সেই সম্ভাবনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অনেকগুলো অসম চুক্তি এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে। এছাড়াও চীন, ভারত ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ‘বাণিজ্য সমতা’ বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের সেই সক্ষমতাকে ভালো নম্বর দেওয়ার সুযোগ নেই।
তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চমাত্রার শিল্পায়ন ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশগ্রহণের জন্য অন্যতম শর্ত হলো আধুনিক অবকাঠামো। তাই বলা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, এটি একটি দেশকে ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ অতিমাত্রায় বিদেশি অর্থায়ন ও প্রযুক্তি-নির্ভর। বিশেষ করে বিগত এক দশকে চীনের ‘কাঠামোগত কূটনীতি’ বা সাম্রাজ্যবাদী বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোতে চীনের আধিপত্য বিশেষ লক্ষণীয়। ভারতের আঞ্চলিক ‘কানেক্টিভিটি’ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতের বিশেষ উপস্থিতি বিদ্যমান। এছাড়াও জাপান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বহুমুখী অবকাঠামোগত কূটনীতিকে আপাত সফলতা মনে হলেও, এই ধরনের প্রকল্পের ‘শর্তাদি’ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটা দুর্বল রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছে। ফলে, আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশকে অবকাঠামোগত কূটনীতিতে সফল মনে হলেও, এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা অনেকটা স্বপ্নের মতো।
সর্বোপরি বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতাকে সাধারণত কৌশলগত ও নীতিগত স্বায়ত্তশাসন বা নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ, একটি রাষ্ট্র নিজস্ব জাতিস্বার্থকে সামনে রেখে বহিরাগত চাপ, নির্ভরতা বা প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, সেটিই মূল প্রশ্ন। বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা একটি রাষ্ট্রের ‘আপেক্ষিক শক্তি’, ‘দরকষাকষির সামর্থ্য’ বা ‘প্রতিরোধ সক্ষমতা’র (ডেটারেন্ট ক্যাপাসিটি) ওপর নির্ভর করে। আবার নির্ভরতা তত্ত্ব (ডিপেন্ডেন্সি থিওরি) এবং উত্তর-ঔপনিবেশিকতা তত্ত্বের দৃষ্টিতে একটি দেশের আনুষ্ঠানিক সার্বভৌমত্ব থাকলেও, একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা নির্ভরতার কারণে কার্যত সীমিত সার্বভৌমত্ব বা কাঠামোগত নির্ভরতায় আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কি সেটিই ঘটে চলেছে?
এম. টি. ইসলাম শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: [email protected]