১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শিশু অপহরণের পর হত্যা: সহোদরসহ ৩ জনের প্রাণদণ্ড, ২ জনের যাবজ্জীবন

“এ ধরনের নৃশংস ও পাশবিক অপরাধ সমাজে আর কেউ যাতে করার সাহস না পায়, সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jul 2026, 03:31 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:36 PM

তের বছর আগে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে মাহফুজ নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যার দায়ে দুই ভাইসহ তিনজনকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে আদালত। এছাড়া দুজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। 

মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করে ঢাকার চতুর্থ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন।

হত্যার দায়ে জামাল শেখ, তার ভাই রঞ্জু শেখ ও শেখ শামীম আহমেদকে মৃত্যুদণ্ড এবং মাহমুদা খানম উষাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। উষাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।

তবে সাব্বির ওরফে রাজীবের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

শিশু মাহফুজকে অপহরণ ও অপহরণে সহায়তার দায়ে বিল্লাল শেখ, জামাল শেখ, রঞ্জু শেখ, শেখ শামীম আহমেদ ও উষাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।

তবে মিজানুর রহমান মিজান, কামনা বেগম, শেখ সোহরাব, তুহিন শেখ, শেখ সাকিব আহম্মেদ, রাকিব শেখ, সাব্বির আহম্মেদ, মিনারুল ইসলাম ও মঞ্জু শেখের বিরুদ্ধে অপহরণ ও এতে সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন বলেন, “আসামিরা পলাতক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।"

রায়ের আগে পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, “এটি কেবল একটি হত্যা মামলা নয়; বরং মানুষের রূপধারী কিছু অপরাধীর হিংস্রতার শিকার এক নিষ্পাপ শিশুর মর্মান্তিক পরিণতির দলিল। শবে বরাতের পবিত্র রাতে নামাজ পড়তে বের হওয়া আট বছরের মাহফুজকে অপহরণ করে মুক্তিপণের লোভে প্রায় দেড় মাস আটকে রাখা হয়। পরে অর্থ না পেয়ে নির্মমভাবে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ মেহগনি বাগানে ফেলে দেওয়া হয়।”

আদালত এও বলেছে, “এ ধরনের নৃশংস ও পাশবিক অপরাধ সমাজে আর কেউ যাতে করার সাহস না পায়, সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।”

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৫ জুলাই শবে বরাতের রাতে কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রামের বাড়ি থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় অপহরণের শিকার হয় ইতালিপ্রবাসী রেজাউল ইসলামের ৮ বছরের ছেলে মাহফুজ। পরদিন মাহফুজের পরিবারকে ফোন করে ৭০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। 

ওই দিনই মাহফুজের মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় একটি মামলা করেন। তদন্তে নেমে পুলিশ অপ্রাপ্ত বয়স্ক দুজনকে আটক করে আদালতে হাজির করলে তারা পারিবারিক শত্রুতার জেরে মাহফুজকে অপহরণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে। গলায় ফাঁস দিয়ে তারা মাহফুজকে হত্যা করে বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। দীর্ঘ ৪৫ দিন অপহরণের পর আটকে রেখে শিশুটিকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ২০ অগাস্ট ঈদের দিন রাতের বেলা শিশুটির লাশ বাড়ির পাশে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় ২১ অগাস্ট স্বপ্না বেগম সম্পূরক এজাহার দায়ের করেন।

মামলাটি তদন্ত শেষে একই বছরের ২০ নভেম্বর ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন কাশিয়ানী থানার এসআই নিজাম শিকদার। আর অপ্রাপ্ত বয়স্ক দুজনের বিরুদ্ধে দেয়া হয় দোষীপত্র।

মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার সিদ্ধান্তে মামলাটি ঢাকার চতুর্থ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মামলার অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনাল ২৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। আসামিদের পক্ষে ৮ জন সাফাই সাক্ষ্য দেন। মামলার আত্মপক্ষ শুনানি, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মঙ্গলবার রায় দেওয়া হল।