Published : 06 Jul 2026, 02:47 PM
বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে নেওয়া তিনটি গ্যাস প্রিপেইড মিটার প্রকল্প বাতিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে
দেশের গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার কথা বললেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “লাইনে গ্যাসই নেই, নতুন কোনো কুপ খনন বা গ্যাস উত্তোলন করা হয়নি, অথচ নতুন করে কোটি কোটি টাকা ঋণের বোঝা বাড়িয়ে প্রিপেইড মিটার লাগানো হচ্ছে—এ যেন ঘোড়া নাই, চাবুক কেনার মত অবস্থা।”
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) আয়োজনে এদিন ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে কথা বলছিলেন জ্বালানিমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিগত সরকারের আমলে জনস্বার্থে কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি, সবই ছিল ব্যক্তিগত লাভের জন্য। তারা দেশের জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করে গেছে। দেশের মানুষ অলরেডি ব্লিডিং করছে।
“প্রত্যেকের মাথার ওপর প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের দায় চেপে আছে। আমি আর নতুন কোনো ঋণের ফাঁদ তৈরি করতে চাই না। জনস্বার্থেই এই প্রজেক্ট সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।”
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও বিল সংক্রান্ত জনঅসন্তোষের বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মন্ত্রী বলেন, “জুন মাস থেকে বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। গরমের কারণে বেশি ব্যবহারের ফলে অনেকের স্ল্যাব পরিবর্তন হয়ে বিল বেশি এসেছে। কিন্তু মিডিয়া মাঠের প্রকৃত সত্য যাচাই না করেই রিপোর্ট করছে।”
তিনি বলেন, “সরকার তো আর বিদ্যুৎ এমনি পায় না, আমাদের কিনতে হয়। দায়িত্ব কেবল মন্ত্রী আর কমিটির নয়, দায়িত্ব সবার।”
‘ঐতিহাসিক অব্যবস্থাপনার’ উদাহরণ দিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “লেজার পদ্ধতির ভুলের কারণে একসময় আমার নিজের বাড়ির বিদ্যুৎ লাইনও কাটতে এসেছিল লোক। পরে অ্যাকাউন্টেন্ট গিয়ে বিলের কাগজ দেখানোর পর তারা ফিরে যায়।
“এই বিভাগে এই ঐতিহাসিক ঝামেলাগুলো রাতারাতি বা ওভারনাইট দূর করা সম্ভব নয়, তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
দেশের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “আমি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনোদিনও বেসরকারি খাতে দেওয়ার পক্ষে না। কারণ উৎপাদন সরকারের হাতে না থাকলে এর প্রাইসিং কন্ট্রোল করা যায় না। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তা ব্রেক-ইভেনে (লাভ-লস ছাড়া) চালাতে পারবে। তবে রিটেইল বিজনেস বা বিতরণ সরকারের কাজ নয়। এই ডিস্ট্রিবিউশন যদি প্রাইভেট করে দেওয়া যেত, তবে আমাদের ঘাটতি কম হত এবং ক্লোজ মনিটরিং নিশ্চিত করা যেত।”
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, সোলার সেক্টর সম্পূর্ণ প্রাইভেট হবে, সরকার কেবল সেই বিদ্যুৎ কিনবে।
“আমাদের লক্ষ্য আগামী ৫ বছরে হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, যা দেশের জ্বালানি আমদানির চাপ অনেক কমিয়ে আনবে।”
তিনি বলেন, “কেবল টিভির লোকেরা যেমন বাড়ি বাড়ি গিয়ে লাইন দিয়ে টাকা তোলে, বেসরকারি খাতকে রুফটপ সোলারের দায়িত্ব দিলে নেট মিটারের মাধ্যমে তারা সহজেই বাড়ির মালিকের কাছ থেকে বিল আনতে পারবে।”
সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৬ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কৃষি জমি সুরক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “কোনো অবস্থাতেই ফসলি জমি নষ্ট করে সোলার বা শিল্পাঞ্চল করা হবে না। সিরাজগঞ্জের ৫৯ মেগাওয়াটের সোলার পাওয়ার স্টেশনটি যমুনা নদী থেকে জমি পুনরুদ্ধার করে করা হয়েছে, যেখানে কোনো কৃষকের জমি নেওয়া হয়নি।
“উপরন্তু, সোলার প্যানেলের নিচেই এখন সফলভাবে শাকসবজি চাষ হচ্ছে। আমরা রেলওয়ে, রোডস বা ওয়াটার বোর্ডের অব্যবহৃত পতিত জমিগুলোকে সোলারের জন্য টার্গেট করছি।”
আলোচনা সভায় ‘জাতীয় জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
প্রবন্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির’ চিত্র তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে একে জনগণের উপযোগী করার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোটার্স বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সেরাজ, উন্নয়ন ও পরিবেশকর্মী বিশেষজ্ঞ আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।