Published : 07 Jul 2026, 05:36 PM
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে যেসব অংশ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কেবল সেগুলো বাতিল করে বাকি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এই আর্জি জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
শুনানিতে তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ ও জাহিদ বিন আমজাদ।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ।
এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেছে আদালত।
শুনানি শেষে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালতের বদলে সংসদে মীমাংসা হওয়ার ওপর জোর দিয়ে শিশির মনির বলেন, "রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি কি হবে? প্রস্তাবনায় কী থাকবে? অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ তে কী থাকবে? এবং ২৫ এর ২ এ কী থাকবে? এগুলো মূলত নীতি নির্ধারণী ব্যাপার।
“আমরা বলেছি নীতি নির্ধারণী ব্যাপারগুলো মূলত সংসদের দায়িত্ব। একটা প্রোপার বিতর্ক করে সাংবিধানিক বিলের মাধ্যমে কোনটা গ্রহণ করবে কোনটা করবে না— এই দায় দায়িত্ব পার্লামেন্টের।"
আদালতের এখতিয়ার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ (সেপারেশন অব পাওয়ার) তত্ত্বের কথা তুলে ধরে এ আইনজীবী বলেন, "আদালতের সেখানে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আদালত যদি সেই অংশে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সংসদের যে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আছে, তা খর্ব করা হয়।
“আমরা এটাও বলেছি যে আদালতের কখনো সুপার লেজিসলেটরের ভূমিকা পালন করা উচিত নয়। আদালত যদি কোনো নীতিকথা কিংবা কোনো রাজনৈতিক বিষয় সেটেল করতে যায়, তাহলে আদালতকে একটা বড় বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়।"
রাজনৈতিক বিষয়গুলো সংসদে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে এ শিশির মনির বলেন, "এই বিতর্কে জড়ানো আদালতের কাজ না। এই বিতর্কে কে জড়াবে? এই বিতর্কে জড়াবে সংসদ। সরকারপক্ষ ও বিরোধী দল বিতর্ক করে কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক এটা নির্ধারণ করবে।
“সেজন্য আমাদের সাবমিশন হল ফান্ডামেন্টাল প্রিন্সিপাল অব স্টেট পলিসি বা নীতিকথা বা মৌলিক বা প্রস্তাবনায় যে সমস্ত পরিবর্তনের সূচনা করা হয়েছিল, এগুলো যেন আদালতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সংসদ সেগুলো বিতর্ক করে জুলাই চার্টারের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।"
সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো আদালতের বাতিল করা উচিত মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, "যেমন ধরুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ করে দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি না থাকে, তাহলে ডেমোক্রেসি থাকে না। ডেমোক্রেসি না থাকলে সংবিধান, রাষ্ট্র, প্রতিযোগিতা সবকিছুই ব্যাহত হয়।
“এইজন্য আমরা বলেছি, যে সমস্ত বিষয় বেসিক স্ট্রাকচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলোর ব্যাপারে উচ্চ আদালত যেন তার রায় প্রদান করেন।"
আদালত সীমার বাইরে গেলে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ভারসাম্য নষ্ট হবে মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, "সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এই ধরনের কোনো ফাইন্ডিংস কিংবা এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আদালতের নেওয়া ঠিক হবে না। যদি আদালত এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটাকে বলবে এনক্রোচমেন্ট অব জুডিশিয়াল রিভিউ। অর্থাৎ বিচার বিভাগ আইনের বাইরে গিয়ে তার দায়িত্ব পালন করতে গেলে গণতন্ত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় সিস্টেমে তিন অর্গানের ব্যালেন্স বজায় রাখা সম্ভব হবে না।"
পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে—এমন প্রশ্নে বাকশাল ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টানেন শিশির মনির।
তিনি বলেন, "চ্যাপ্টার সিক্সের ‘এ’ যদি এখন বাতিল করে দেন, পুরোটা মিলে যদি আপিল বিভাগ বাতিল করে দেন, তাহলে আমরা অনিবার্যভাবে বাকশাল ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাব।
“তাহলে বাংলাদেশের ডেমোক্রেসি বলতে তো আর কিছু থাকবে না। এখন যদি আদালত বাদ করে দিয়ে বলেন 'ইয়েস, আমরা বাকশাল সিস্টেমে চলে গিয়েছি', আমরা বলছি ‘নো’। ইট ইজ নট দ্য ফাংশন অব দ্য কোর্ট। ইট ইজ দ্য ফাংশন অব দ্য পার্লামেন্ট।
“ডেমোক্রেসি যদি ঠিক না থাকে, সিক্সের ‘এ’ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? কীভাবে দেশ চলবে? ডেমোক্রেসি কিভাবে বিলীন থাকবে? এখন আমরা আর্গুমেন্ট যদি করি যে এ টু জেড যা কিছু আছে সব বাদ করে দেন, তাহলে তো এটাও বাদ হয়ে যাবে এবং বাতিলটা বাদ হয়ে যাবে।"
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মত নীতিগত বিষয়গুলো ‘আদালতের কাজের পরিধির বাইরে’ বলে দাবি করেন জামায়াতের আইনজীবী।
তিনি বলেন, "সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রে থাকবে কি থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত কি আদালত নেবে, নাকি এই সিদ্ধান্ত পার্লামেন্ট নেবে? এখন যদি আমরা বলি ইন ইটস এনটায়ারটি বাতিল করে দেন, তাহলে তো সেকুলারিজম বাতিল হয়ে যাবে, সোশালিজম বাতিল হয়ে যাবে।
“সেকুলারিজম, সোশালিজম যদি আদালত বাদ দেয়, এটি আদালতের ফাংশন না। কারণ এটি নীতিকথা। এটি হল রাষ্ট্রের গাইডিং প্রিন্সিপাল। এটাকে বলা হয় পোলস্টার। পোলস্টার আদালত ঠিক করে না, পোলস্টার ঠিক করে পার্লামেন্ট। অতীতে দেখেছেন, যখনই রাজনৈতিক বিতর্ক আদালত সেটেল করতে গিয়েছে, সে সমস্ত জায়গায় আদালত নিজেই বিতর্কিত হয়েছে।"
আদালতকে আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকার অনুরোধ জানিয়ে শিশির মনির বলেন, রাজনৈতিক বিতর্ক সংসদেই হওয়া উচিত।
“আমরা যদি আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে বসে, আদালতের বারান্দায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাই, তাহলে জনগণের মধ্যে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমাদের তা করা উচিত নয়।"
পঞ্চদশ সংশোধনীর কোন বিষয়গুলো আদালতের বাতিল করা উচিত এবং কোনগুলো সংসদের জন্য রেখে দেওয়া উচিত, তা স্পষ্ট করতে শুনানিতে একটি তালিকা জমা দেওয়ার কথা বলেন জামায়াতের আইনজীবী।
তিনি বলেন, সংশোধনীর বিষয়গুলোকে তারা আইনি বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুটি ভাগে বিভক্ত করে আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
এর মধ্যে প্রথম ভাগে থাকা নীতিগত বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়ে তিনি বলেন, "একভাগে আমরা দেখিয়েছি যেগুলো নীতি এবং পদ্ধতির কথা। যার সংখ্যা প্রায় ৪১টা। এই নীতি পদ্ধতিগুলো বাদ করা ঠিক হবে না, হাত দেওয়া ঠিক হবে না। এগুলো বাদ দেবে কি দেবে না, এটা ডিসাইড করবে পার্লামেন্ট।"
অন্যদিকে, দ্বিতীয় ভাগে থাকা বিষয়গুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সেগুলো আদালতকেই বাতিলের আর্জি জানান এই আইনজীবী, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল সংক্রান্ত কোনো আইনি জটিলতা বা সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়।
শিশির মনির বলেন, "আমাদের সর্বশেষ সাবমিশন হল, আদালতকে তার মর্যাদা ঠিক রাখতে হবে, ইনডিপেন্ডেন্স ঠিক রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিতর্কে ঢোকা ঠিক হবে না। পার্লামেন্টকে ডিসাইড করতে দিতে হবে নীতি পদ্ধতিগুলো। আর আদালত ডিসাইড করবে মৌলিক স্তম্ভগুলো। এটিই আমাদের সাবমিশন।"
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট মামলার নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাই কোর্ট।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয় হাই কোর্টের রায়ে।
হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো 'গণতন্ত্র' ও 'জনগণের সার্বভৌমত্ব'-কে ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয় ওই রায়ে।
৭ (ক) অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। আদালত একে অস্পষ্ট ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ৭ (খ) অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল।
হাই কোর্ট বলেছিল, এটি পরবর্তী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা খর্ব করেছে।
সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা ছিল। আর ৪৪ (২) অনুচ্ছেদে বলা ছিল “এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোন আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ঐ সকল বা উহার যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন। আদালত একে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে বাতিল করে দেয়।”
হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের কথা ছিল, যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪২ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বিবেচনায় তা বাতিল ঘোষণা করা হল এবং দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে।
ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রিট মামলার বাদীপক্ষ।
এখন সর্বোচ্চ আদালতে সেই আপিল শুনানি চলছে। মামলাটির চার পক্ষের মধ্যে বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেছেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। এরপর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিশির মনির। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।