Published : 07 Jul 2026, 05:57 PM
ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের পুরোনো স্বপ্নটাকে নতুন করে সামনে এনেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেট বক্তৃতায় তার মুখে স্বপ্নের কথা শোনা গেছে। তবে প্রস্তাবিত রেলপথটি নিয়ে আলোচনা কিন্তু নতুন নয়, শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষভাগে। এরপর পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, দেশের রাজনৈতিক পটে অনেক বার পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু প্রকল্পের ফাইল আলোর মুখ দেখেনি।
কর্ড লাইন মূলত একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত রেলপথ। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেনযাত্রার সময় বর্তমানের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থেকে একলাফে সাড়ে তিন ঘণ্টায় নেমে আসবে। যাতায়াতকারীদের জন্য নিঃসন্দেহে চমৎকার খবর। তবে বছরের পর বছর রেল খাতের খুঁটিনাটি যিনি পর্যবেক্ষণ করছেন, তার কাছে এই ঘোষণা একই সঙ্গে আশাজাগানিয়া এবং সতর্কবার্তাও।
বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনকে টঙ্গী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর আখাউড়া ঘুরে যেতে হয়। সড়কপথের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার হলেও রেলপথের দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার। অর্থাৎ ট্রেনকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। কর্ড লাইনের মূল পরিকল্পনাটি হলো নারায়ণগঞ্জ আর মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া হয়ে সরাসরি কুমিল্লার সঙ্গে নতুন লাইন জুড়ে দেওয়া। এতে করে বর্তমান ঘুরপথের অবসান ঘটবে।
ছয় দশকের পুরোনো এই পরিকল্পনা প্রথম দাপ্তরিক রূপ পায় ১৯৬৮-৬৯ সালে। তৎকালীন সরকার অর্থ বরাদ্দও করেছিল, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় ফাইলটি চাপা পড়ে যায়। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০১৫, ২০২১ এবং ২০২৩ সালেও বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া হয়েছে। কিন্তু কোনোবারই মাটিতে এক ইঞ্চি লাইন বসেনি। মাঝে ২০১৮ সালের দিকে এই পথেই উচ্চগতির বুলেট ট্রেনের বিশাল স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিপুল ব্যয়ের কারণে সেই ভাবনা বাদ দিয়ে আবার সাদামাটা কর্ড লাইনেই ভরসা রাখতে হচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর ঘোষণাকে তাই একটি পুরোনো ভাবনার নতুন পুনরুত্থান বলা চলে।
মানচিত্রে দাগ টানা সহজ হলেও মাটিতে নামলে গল্পটা পাল্টে যায়।
প্রস্তাবিত পথটি যাবে দেশের সবচেয়ে নরম পলিমাটির এলাকা নারায়ণগঞ্জ, গজারিয়া ও দাউদকান্দির ওপর দিয়ে। এখানকার মাটি যেমন নরম, তেমনই জলভাগের আধিক্য। সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মেঘনা নদী। মেঘনার মতো চওড়া ও খরস্রোতা নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ শুধু ইস্পাত আর কংক্রিটের কাজ নয়। নদীর তলদেশ প্রতিবছর সরে যায় বলে পাইলিং করতে হয় অনেক গভীরে। প্রকল্পের খরচের সিংহভাগই লুকিয়ে আছে এই নদী পারাপারের কঠিন লড়াইয়ে।
দ্বিতীয় বড় বাধা জমি। প্রস্তাবিত অঞ্চলটি যেমন ঘনবসতিপূর্ণ, তেমনই উর্বর কৃষিজমিতে ভরা। নতুন লাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণের অর্থ হলো বহু মানুষের ভিটেমাটি আর ফসলি জমির হাতবদল। দেশে বড় প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়া এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণই মূলত ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন জটিলতা। নকশা যতই নিখুঁত হোক, এই ধাপে আটকে গেলে বছরের পর বছর কেটে যায়।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় লাইনটি ডুয়েল গেজ করার এবং পরবর্তীতে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালনার ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রকৌশলগত দিক থেকে সিদ্ধান্তটি বুদ্ধিমানের কাজ। ভবিষ্যতে পুরো লাইন বদলানোর চেয়ে শুরুতেই দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো অনেক সাশ্রয়ী। বর্তমানে ডিজেলে চললেও ভবিষ্যতে বিদ্যুতে রূপান্তরের সময় যেন পুরো পথ নতুন করে খুঁড়তে না হয়, সেই প্রস্তুতি রাখাই শ্রেয়।
সাধারণ মানুষের কাছে প্রকল্পের মূল আকর্ষণ ‘সাড়ে তিন ঘণ্টায় চট্টগ্রাম’। অথচ পরিবহন পরিকল্পনার দিক থেকে আসল গুরুত্ব যাত্রী পরিবহনে নয়, পণ্য পরিবহনে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। সামনে যুক্ত হচ্ছে বে-টার্মিনাল আর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। এগুলো চালু হলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে পণ্য পরিবহনের চাপ আরও বাড়বে। বর্তমানে এসব পণ্য মূলত সড়কে, ট্রাকে পরিবাহিত হয়। ফলশ্রুতিতে মহাসড়কে লেগেই থাকে যানজট, দুর্ঘটনা, বাড়তি খরচ আর দূষণ।
কর্ড লাইন নির্মিত হলে বন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রেন সরাসরি প্রস্তাবিত ধীরাশ্রম আইসিডির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। অর্থাৎ তৈরি হবে সুনির্দিষ্ট পণ্য করিডোর। আধুনিক পরিবহন পরিকল্পনার মূল কথাই হলো: আলাদা আলাদা প্রকল্প নয়, বরং বন্দর, রেললাইন ও খালাস ডিপোকে এক সুতোয় গেঁথে একটি সমন্বিত ও গতিশীল শৃঙ্খল তৈরি করা।
কম আলোচিত আরেকটি সুবিধাও রয়েছে। কর্ড লাইন চালু হলে পুরোনো আখাউড়া-ভৈরব ঘুরপথের ওপর চাপ কমবে, ফলে পথটি তখন অন্য ট্রেনের জন্য উন্মুক্ত হবে। ফলশ্রুতিতে একই অবকাঠামোয় আরও বেশি ট্রেন চালানো যাবে। নতুন কিছু না বানিয়েও পুরোনো লাইন থেকে বাড়তি সুবিধা আদায় করা সম্ভব হবে।
ভালো লাইন বানালেই কি লাভ আসবে? রেলওয়ের নিজের হিসাবই কিন্তু অস্বস্তিকর।
পণ্য পরিবহন থেকে গত অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৭২ কোটি টাকা, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫ কোটিতে। অথচ লক্ষ্য ছিল ২২৭ কোটি টাকার বেশি। পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা এক বছরে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ওয়াগন পরিবহনের লক্ষ্য ছিল প্রায় দুই লাখ, হয়েছে মাত্র ৪৯ হাজার।
এই সংখ্যাগুলো একটা কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়। আমাদের সমস্যা শুধু লাইন ঘুরপথে যাওয়া নয়, সমস্যা ট্রেন চালানোর সক্ষমতা। রেলের কর্মকর্তারাই বলছেন, প্রতিদিন গড়ে ১৩টি ইঞ্জিন দরকার হলেও মেলে মাত্র তিন-চারটি। ইঞ্জিন নেই বলে পণ্য পড়ে থাকে, ব্যবসায়ী আস্থা হারিয়ে আবার সড়কে ফিরে যান।
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা এখানেই। কর্ড লাইন নতুন, সোজা আর দ্রুত একটা পথ দেবে। কিন্তু সেই পথে চালানোর মতো ইঞ্জিন আর ওয়াগন না থাকলে নতুন লাইনও খালি পড়ে থাকবে। বিপুল টাকা খরচ করে যদি ব্যবহারই কম হয়, অর্থনীতির ভাষায় তাকে বলে সাদা হাতি। তাই লাইন বসানোর কাজ আর ট্রেন চালানোর সংস্কার, দুটোকে একসঙ্গে এগোতে হবে। একটা ছাড়া আরেকটার দাম নেই।
বাজেটের দুটো ফাঁকা ঘর রয়ে গিয়েছে, পেশাদার চোখে এ দুটো বিষয় খচখচ করে।
প্রথমত, ঘোষণা এসেছে, কিন্তু আলাদা কোনো বরাদ্দ, সম্ভাব্য খরচ বা সময়সীমা বলা হয়নি। এটা ভাবার মতো। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, খরচ আর সময় ঠিক না করে দেওয়া অনেক প্রকল্প বছরের পর বছর সম্ভাব্যতা যাচাই আর নকশার ঘরেই ঘুরপাক খায়। শোনা যাচ্ছে, এই অর্থ বছরের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য আছে। সেটাই আসল পরীক্ষা। বক্তৃতা নয়, ডিপিপিই বলে দেবে সরকার কতটা যত্নবান।
দ্বিতীয়ত, পাশের মহাসড়কেই আবার ১০ লেনের এক্সপ্রেসওয়ের দাবি উঠছে। এখানে একটা প্রশ্ন স্পষ্ট হওয়া দরকার: আমরা রেল আর সড়ককে প্রতিযোগী বানাতে চাই, নাকি সহযোগী? দুটোতেই একসঙ্গে বিপুল টাকা ঢাললে দুটোই অর্ধেক ভরা থাকবে। ভালো হয় কাজ ভাগ করে দিলে। ভারী পণ্য আর কনটেইনার যাক রেলে, দ্রুত আর ছড়ানো পণ্য যাক সড়কে। নইলে দুটো ব্যয়বহুল ব্যবস্থা একে অন্যের পণ্য কেড়ে নেবে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এই প্রকল্পের পক্ষে, তবে চোখ খোলা রেখে।
কর্ড লাইন একটা যুক্তিসংগত প্রকল্প, অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। সময় বাঁচবে, পথ ছোট হবে, পুরোনো লাইন কিছুটা খালি হবে, বন্দরের পণ্য রেলে তোলার একটা পরিষ্কার রাস্তা তৈরি হবে। ট্রাকের বদলে ট্রেন মানে দূষণও কম।
তবে লাইন বসানো কাজের শেষ নয়, শুরু মাত্র। সাফল্যের জন্য তিনটি জিনিস দরকার। সবার আগে দরকার পরিচালন সংস্কার, কারণ ইঞ্জিন আর ওয়াগনের সংকট না মিটলে নতুন লাইন খালি পড়ে থাকবে। তারপর দরকার নিরপেক্ষ খরচ-সুবিধা যাচাই, যেখানে মেঘনা সেতু আর জমির খরচ ধরে প্রকল্পটি আদৌ লাভজনক কি না তা রাজনৈতিক উৎসাহে নয়, সংখ্যায় প্রমাণ হবে। আর দরকার জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন আগেভাগে গুছিয়ে রাখা, কারণ আমাদের প্রকল্প এখানেই সবচেয়ে বেশি আটকায়।
ছয় দশক আগে যে ফাইল খোলা হয়েছিল, এবার তা সত্যিই মাটিতে নামলে এটি হবে আমাদের পরিবহন ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায়। আর যদি আবার সুন্দর নকশা আর বক্তৃতায় আটকে থাকে, তবে এটি হবে পুরোনো এক স্বপ্নের আরেকটা নতুন মোড়ক। এবার অন্তত উত্তরটা থাকুক ডিপিপিতে, খরচের অঙ্কে, আর প্রথম দিন যে ইঞ্জিন পণ্যবাহী ট্রেন টেনে নেবে তার নিশ্চয়তায়।
মাহমুদ উজ জামান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক।বর্তমানে থাইল্যান্ডে পরিবহন প্রকৌশলে উচ্চতর পড়াশোনা করছেন। ই-মেইল: [email protected]