Published : 07 Jul 2026, 08:04 PM
আমি শিক্ষা নিয়ে আলোচনাটা একটু গোড়ার দিক থেকেই শুরু করতে চাইছি। শুরুটা করা যায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে। প্রথমে পাকিস্তান হলো, তারপরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলো। লক্ষ্যণীয় যে, এই যাত্রার প্রত্যেকটি পর্যায়েই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। আমরা যদি ৪৭-এর আগেও যাই, ব্রিটিশ আমলে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এ. কে. ফজলুল হক—তারা ব্রিটিশ আমলের শিক্ষাব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা বলতেন, ব্রিটিশ শাসকরা যে শিক্ষা আমাদের দিচ্ছে, তাতে আমাদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব বহাল রাখার উদ্দেশ্যকেই মূল করে আমাদের শিক্ষার কিছু সুযোগ দিচ্ছে। এই শিক্ষা পরিবর্তন করতে হবে; শিক্ষার বিষয় এবং শিক্ষাব্যবস্থা, সবটাই। এই কথাগুলো খুব জোরেশোরেই তারা বলেছিলেন।
পরবর্তীতে পাকিস্তান হওয়ার পরে শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করে নবায়িত করার কথা খুব বড় করে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ইংরেজরা যতই খারাপ হোক, তারা আমাদের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটাকে ততটা খারাপ রাখেনি; অনেকখানি শিক্ষার সুযোগ আমাদেরকে দিয়েছে। তারা আমাদের ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দিতে চেয়েছে। যদিও সেটাতে তাদের সাম্রাজ্যবাদী ইচ্ছা ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজের উচ্চশ্রেণির অনেক মানুষ ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে ইংরেজি ভাষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সমর্থন করেছিলেন।
কিন্তু তারপরেও যদি আমরা এই প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক এবং আরও উচ্চ পর্যায়ে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব যে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে ব্রিটিশ শাসকরা খুব বেশি কার্পণ্য করেনি। শিক্ষাদীক্ষা লাভ করে এই দেশের মানুষ উন্নত হোক এটা অনেকটাই তারা চেয়েছে। কাজেই ব্রিটিশ শাসনামলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা যারা কঠোর সমালোচনা করেছি, সেই সমালোচনাতে অত্যুক্তি ছিল।
আমাদের বাস্তব অবস্থান বিবেচনা করলে, এখন সামনের দিকে এগুতে হলে ব্রিটিশ শাসকেরা যে ব্যবস্থা ও যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে গিয়েছিল, সেটা একেবারে উল্টে দেব, পাল্টে দেব—এই চিন্তা করা সম্পূর্ণ ভুল হবে। বরং, ওটা রক্ষা করে আমাদের পরিবর্তনগুলো করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে পরিবর্তনের দিকে যেতে হবে। সেই সাথে আমাদের যে স্বাধীনতা, সে স্বাধীনতাকে আমাদের অর্থবহ করতে হবে। স্বাধীনতার মনোভাব, তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা, সমস্তকিছুর মধ্যে স্বাধীনতার মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তাচেতনা, স্বাধীন রাষ্ট্রে নাগরিকদের আত্মমর্যাদাবোধ—এসব বিকশিত করতে হবে।

তবে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনে আমি গুরুত্ব দিতে চাই শিক্ষাব্যবস্থার ভিতরে যারা আছেন তাদের ওপর। আমি মনে করি, তাদের চিন্তাভাবনা নবায়িত করা দরকার। আমি জানি, ব্যাপারগুলো পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু কঠিন মানে এই নয় যে, অসম্ভব। এই কঠিনতা যে শুধু আমাদের দেশে, আমাদের জাতির মধ্যে, তা নয়; এটা প্রাচ্য বলি, পাশ্চাত্য বলি—সব জাতির মধ্যেই এগুলো কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন সমস্যা সমাধান করে করেই তো মানবজাতি এবং বিভিন্ন জাতি উন্নতি করেছে।
আমাদেরকেও সেই কঠিন সমস্যা অতিক্রম করে চলতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। তবে একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, তা হলো—মানুষের স্বরূপ সম্পর্কে আমাদের জানবার, বুঝবার আরও বেশি প্রয়োজন আছে।
মানুষের কিছু স্বাভাবিক প্রবণতা আমরা সমাজ ও রাজনীতির নানা ক্ষেত্রেই দেখতে পাই। যেমন, ধরুন একটি এলাকায় একজন জাতীয় সংসদ সদস্য, একজন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বা অন্য কোনো জনপ্রতিনিধি আছেন। তারা কি সত্যিই চান যে নতুন আরেকজন মানুষ উঠে আসুক, জনপ্রিয় হয়ে তাদের পরাজিত করুক এবং তাদের জায়গা দখল করুক? বাস্তবে সাধারণত তা দেখা যায় না। মুখে সবাই সুষ্ঠু নির্বাচন ও নতুন নেতৃত্বের কথা বললেও সবার মনোভাব ইতিবাচক থাকে না। যে ব্যক্তি যেখানে কর্তৃত্বে আছেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেই কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চান। নতুন কেউ উঠে এসে তার অবস্থানকে দুর্বল করুক বা তার জায়গা নিয়ে নিক—এটি তিনি সহজে মেনে নিতে চান না।
এটি মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য, যা পৃথিবীর সর্বত্র কমবেশি দেখা যায়। কিন্তু যে জাতিগুলো নানাভাবে উন্নতি করেছে, তারা এই স্বাভাবিক প্রবণতার মধ্যেই নিজেদের আত্মসমালোচনা করার ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। তারা সমালোচনাকে গ্রহণ করেছে, বিচার-বিবেচনার চর্চা করেছে এবং শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, সবার কল্যাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই তারা উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পেরেছে। অনেকটা যে উন্নতি করে ফেলেছে তা না, আমি বলব কিছুটা পেরেছে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ যা চান, তারা তাদের অবস্থান অটুট রেখে, কর্তৃত্ব ধরে রেখে সকলের উন্নতি করবেন। আমি বলব, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে বরং এর মধ্যেই কীভাবে সর্বজনের কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়, কীভাবে সবার উন্নয়নের পথ তৈরি করা যায়, তা নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে। কিন্তু এইসব চিন্তাভাবনা তো আমাদের দেশে মোটেই বিকশিত হয়নি। যারা রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে লেখেন, তারা তো মানুষের মনের দিকটার দিকে একটুও নজর দেন না।
রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যতই আমরা চিন্তা করি, যারা সেই ব্যবস্থা প্রবর্তন করবেন, পরিবর্তন করবেন, উন্নত করবেন অথবা চালিয়ে নেবেন, তাদের নিজেদের সদিচ্ছা থাকতে হবে। অথচ তাদের এমন একটা মানসিকতা থাকে যে, নিজেদের সেই কর্তৃত্ব, নিজেদের সেই সুযোগ-সুবিধাটা রক্ষা করে শিক্ষাব্যবস্থাটাকে তারা অগ্রসর করতে চান। যতই স্যাক্রিফাইস করার কথা বলা হোক, সার্বজনীন কল্যাণের কথা বলা হোক, যে কমিটিগুলোর মাধ্যমে এসব প্রবর্তন করা হয়, সংসদে যারা এসব চিন্তা করে ঠিক করেন, তাদের মধ্যে নিজেদের কর্তৃত্বের, নিজেদের স্বার্থের একটা বোধবুদ্ধি কাজ করে। তারা মূলত নিজেদের স্বার্থচিন্তা বজায় রেখে সকলের কল্যাণের চিন্তা করেন।
আজকে যারা আওয়ামী লীগ করেন, বিএনপি করেন, জামায়াতে ইসলামী করেন, তাদের মধ্যে একটা স্বার্থগত পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটাই রাজনীতিতে নানাভাবে বিস্তৃত হয়। এই বাস্তবতা রাজনীতি ও মতাদর্শের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো জাতি যখন উন্নয়নের পথ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার মডেল নির্বাচন করে, তখন শুধু তত্ত্ব নয়; নেতৃত্বের মানসিকতা, ইতিহাসবোধ এবং বাস্তবতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও সেই সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
মার্কসবাদী চিন্তাধারার একটা অসাধারণ প্রভাব আছে গোটা পৃথিবীজুড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন যখন বিপ্লব করে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলাল, তখন গোটা পৃথিবীতে বিরাট আশা জেগেছিল যে, পৃথিবীর সর্বত্রই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গিয়ে প্রত্যেক জাতি এবং গোটা মানবজাতি অনেক উন্নতি করতে পারবে। এখন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার একেবারে সূত্রবদ্ধ কোনো ফর্মুলা নেই। প্রত্যেক জাতির ইতিহাস আলাদা, অতীত আলাদা। নানাভাবে জাতিগুলো বিকশিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসেছে এবং বর্তমান অবস্থায়ও এক জাতির সঙ্গে অন্য জাতির পার্থক্য আছে।
এই বাস্তবতার মধ্যে প্রত্যেক জাতিকে তার উন্নতির পথ নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের বুদ্ধিতে, নিজেদের সামর্থ্যের আলোকে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, এই বিষয়টি সব জাতির মধ্যে সকলে সমানভাবে—বিশেষত যারা নেতৃত্ব দেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেননি। আমাদের দেশে ব্যাপারটি এমন হলো যে, মস্কোতে যা হয়েছে, বাংলাদেশেও সেরকমই করতে হবে। অথবা চীনে যা হয়েছে, বাংলাদেশে সেরকমটাই করতে হবে। আমাদের যারা নেতা ছিলেন, তারা চীনপন্থী, রুশপন্থী বলে পরিচিত হলেন। কিন্তু ঢাকাপন্থী, বাংলাদেশপন্থী হলে না। এই এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে আমাদের উঠতে হবে—এই চিন্তাটা প্রায় অনুপস্থিত থেকে গেছে।
আমি বলব, যখন কোনো ভালো দৃষ্টান্ত সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, যারা নেতৃত্ব দেন, তাদের মধ্যেও সেটা অনুকরণ করার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। কিন্তু যেসব দেশে এই অনুকরণপ্রবণতা অন্ধভাবে দেখা দিয়েছে, সেইসব জাতি বিপ্লবও করতে পারেনি, উন্নতিও করতে পারেনি; গতানুগতিক ধারাতেই একরকম চলেছে। আর যেসব জাতি এই ব্যাপারটা বুঝেছে এবং নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য অবলম্বন করে বাইরের জগতের বা অন্য জায়গা থেকে পাওয়া ভালো কিছু গ্রহণ করতে চেষ্টা করেছে, তারা সাফল্যের সঙ্গে পরিবর্তন করতে পেরেছে। সাফল্য বলতে শতভাগ সাফল্য নয়; কিছুটা সাফল্য বা অনেকটা সাফল্য—এইরকম। কোনো সাফল্যই কি শতভাগ হয়? যাই হোক, আমরা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করছি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছি। শিক্ষার ক্ষেত্রেও এগুলো আমাদের বিবেচনা করতে হবে।
এই বিষয়গুলো বুঝলে আমরা যখন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কথাবার্তা বলব, তখন আমাদের ভাষা, বক্তব্য মার্জিত হবে। মনে রাখতে হবে, অনেক অন্যায় শুধুমাত্র সংগ্রাম করলেই দূর করা যাবে না। দূর করতে হলে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে পর্যায়ক্রমে বিষয়গুলো উন্নত হতে হতে একটা উন্নত অবস্থায় পৌঁছাবে। যাই হোক, আমরা এসব ব্যাপার নিয়ে যদি আরও চিন্তা করি, বিচার-বিবেচনা করি, তর্ক করি এবং ভুল থেকে শুদ্ধতার দিকে যেতে চাই, তবে অবশ্যই আমরা পারব। আমাদের দেশেও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।