Published : 07 Jul 2026, 01:45 PM
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে মামলার আপিল শুনানিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের সংশোধনীকে আইনি সুরক্ষায় রেখে পুরো আইনটি অসাংবিধানিক ঘোষণার আর্জি জানিয়েছেন রিটকারীদের একটি পক্ষ।
এছাড়া অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়ে আপিল বিভাগে অন্য একটি মামলা বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে আদালতকে রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে তিনি এই আর্জি জানান আইনজীবী শরীফ ভূইয়া। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান, রেদোয়ানুল করিম ও আসিফ ইকবাল।
এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার দিন রেখেছে সর্বোচ্চ আদালত।
শুনানি শেষে শরীফ ভূঁইয়া পঞ্চদশ সংশোধনীকে সংবিধানের ‘পুনর্লিখন’ আখ্যায়িত করে বলেন, “এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি সংবিধানের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।
“যেহেতু পার্লামেন্ট এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সংশোধনী পাস করেছে, তাই সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে তাদের জনগণের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের জনবিরোধী সংশোধনী আর না হয় এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করা না যায়, সেজন্য এটি বাতিল হওয়া প্রয়োজন। এই সংশোধনীর উদ্দেশ্যই ছিল সংবিধানকে ধ্বংস করা।”
পুরো আইন বাতিল না চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সুরক্ষা চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে এই আইনজীবী বলেন, “হাই কোর্ট বিভাগ পুরো আইনটি বাতিল করেননি। আপিল বিভাগে সাবমিশন রাখা হয়েছে যে, এটি পুরোটা বাতিল করা উচিত। তবে পুরোটা বাতিল করলে দুয়েকটি জায়গায় শূন্যতা বা সমস্যা তৈরি হতে পারে।
“এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, যার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পদাধিকারীদের অসদাচরণের অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।”
তিনি বলেন, সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশ হয়েছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করায় ওই বিধান অসাংবিধানিক হয়ে পড়েছিল। এরপর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
“এখন পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেলে বিচারকদের জবাবদিহির এই ব্যবস্থাটি আর থাকবে না। সংসদ পুনরায় এটি প্রবর্তন না করা পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের বিচারিক সুরক্ষায় শূন্যতা সৃষ্টি হবে।
“এ কারণেই পঞ্চদশ সংশোধনীর যে ধারার (৯৬ অনুচ্ছেদ) মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং মানবাধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টে রিট করার বিষয়ে ১০২ অনুচ্ছেদে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা সুরক্ষায় রেখে বাকি সবকিছু অসাংবিধানিক ঘোষণার আর্জি জানানো হয়েছে। তাহলে কোনো আইনি শূন্যতা তৈরি হবে না।”
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাই কোর্ট।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয় হাই কোর্টের রায়ে।
হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো 'গণতন্ত্র' ও 'জনগণের সার্বভৌমত্ব'-কে ধ্বংস করা হয়েছে।
এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয় ওই রায়ে।
৭ (ক) অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে দোষী করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। আদালত একে অস্পষ্ট ও ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
৭ (খ) অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। হাই কোর্ট জানায়, এটি পরবর্তী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা খর্ব করেছে।
সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা ছিল। আর ৪৪ (২) অনুচ্ছেদে বলা ছিল “এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটাইয়া সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তাহার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ঐ সকল বা উহার যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করিতে পারিবেন। আদালত একে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে বাতিল করে দেয়।”
হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের কথা ছিল, যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল করা হয়। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বিবেচনায় তা বাতিল ঘোষণা করা হল এবং দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে।
ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রিট মামলার বাদীপক্ষ।
এ মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও আলাদাভাবে আপিল করেন। সব মিলিয়ে তিনটি আপিলের শুনানি এখন একসঙ্গে চলছে।