Published : 09 Jul 2026, 10:24 AM
চলতি অর্থবছরের বাজেট পাসের পরদিন ১ জুলাই সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংসদে ক্ষমতাসীন দলের বাড়তি সুবিধা থাকে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, একজন মন্ত্রী ইচ্ছা করলেই ৩০০ বিধি ব্যবহার করে তার নিজের পছন্দমতো সময় নিয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন। অপরদিকে, বিরোধীদলের সদস্যদের সংসদে কথা বলতে গেলে কার্যপ্রণালি বিধি মেনে কথা বলতে হয় এবং প্রতি ক্ষেত্রেই স্পিকারের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হয়।
আমি নিজেই সেই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম এবং শফিকুর রহমানকে কয়েকটি প্রশ্নও করেছিলাম। সেই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তার দীর্ঘ বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য কথা হলো, সংসদে যদি গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার করা না হয়, তাহলে তারা জনগণের সংসদে চলে যাবেন—যেখানে কথা বলার জন্য স্পিকারের অনুমতি লাগে না।
জামায়াতের রাজনীতি কিংবা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ইত্যাদি বিষয় এই আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য নয়। মূল বিষয়টি হলো—সংসদে বিরোধীদল হিসেবে তারা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছেন এবং সেগুলোর কতটুকু ব্যবহার করতে পারছেন অথবা কতটুকু পারছেন না, সেগুলো নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা। এর পাশাপাশি প্রধান বিরোধীদল হিসেবে সংসদের বৈধ অধিকার কীভাবে জলাঞ্জলি দিয়েছে জামায়াত, সে সম্পর্কে একটি ঘটনা উল্লেখ করা—যা এখন পর্যন্ত কোনো সংবাদমাধ্যম অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার চোখে পড়েনি।
বৈধ অধিকার জলাঞ্জলি দেওয়ার বিষয়টি আলোচনার আগে পাঠকের সুবিধার জন্য বলা দরকার, সংসদে বিরোধীদল কতটুকু নিশ্চিত সুবিধা ভোগ করে। সংসদ পরিচালিত হয় সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে। যেহেতু সংসদীয় কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো সরকারকে অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করা, সেহেতু সংসদে মন্ত্রীরা বক্তব্য রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন, সেটি সত্য।
এর পাশাপাশি দলমত ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সব সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখার কিছু নিশ্চিত সুবিধা ভোগ করেন, যেখানে স্পিকারেরও কিছু করার থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর মতো বিরোধীদলীয় নেতার মাইক সবসময় খোলা থাকে। তিনি ইচ্ছা করলেই প্রায় সব ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন এবং সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। বর্তমান সংসদে যা শফিকুর রহমান বেশ ঘনঘনই করছেন এবং কখনো কখনো একটু বেশিই করছেন।
এছাড়া, সব সংসদ সদস্য (মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ব্যতিরেকে) প্রশ্নোত্তর পর্বে স্পিকারের অনুমতি সাপেক্ষে লিখিত ও মৌখিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি করার জন্য প্রশ্ন করতে পারেন। বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশ দিয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন। নোটিশ গৃহীত হলে স্পিকারের কোনো প্রকার অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেই সদস্য নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট সময় ধরে কথা বলতে পারেন।
কার্যপ্রণালি বিধির অন্যান্য বিধি অনুসারে যেকোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দেওয়া যায়। নোটিশ গৃহীত হলে তিনি নিশ্চিতভাবে বক্তব্য রাখতে পারেন। এখানে স্পিকার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো প্রকার অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। নোটিশ ছাড়াও ‘সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব’ নামক একটি বিধান রয়েছে কার্যপ্রণালি বিধিতে। এটি গৃহীত হলে জনস্বার্থে যেকোনো বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন একজন সদস্য। সেই আলোচনার সময় তিনি নিশ্চিতভাবে কথা বলতে পারেন এবং এখানেও স্পিকার তেমন হস্তক্ষেপ করেন না।
সংসদ সদস্যরা বছরের প্রথম অধিবেশনে হুইপদের বরাদ্দকৃত সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় সংসদীয় বিধি ও রীতি মেনে স্পিকারের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়াই বক্তব্য রাখতে পারেন। কোনো সদস্যকে ১০ মিনিট বরাদ্দ করা হলে, সেই ১০ মিনিট তিনি নিশ্চিতভাবে বক্তব্য রাখতে পারেন। এই সময়ে তিনি যেকোনো বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন, তবে সেটি সংসদীয় হতে হবে এবং বিধির মধ্যে হতে হবে। তিনি অসংসদীয় বক্তব্য দিলে স্পিকার হস্তক্ষেপ করে তাকে তা স্মরণ করিয়ে দেন।
অধিকন্তু, প্রতি বছর বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন করলে প্রত্যেক সদস্য বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। এখানেও স্পিকার অযৌক্তিকভাবে কোনো সংসদ সদস্যের বক্তব্য বন্ধ করতে পারেন না। সংসদ সদস্যরা সংসদীয় ভাষায় এবং আচরণের মধ্যে থেকে যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন। সেই অধিকার খর্ব করতে পারেন না কেউই।
স্পিকার যদি কোনো সদস্যের বরাদ্দকৃত সময়ের কয়েক সেকেন্ডও ব্যয় করেন, সে ক্ষেত্রে তিনি সেই কয়েক সেকেন্ড সেই সদস্যকে পুষিয়ে দেন। যেমন চলতি বাজেট অধিবেশনে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকারের কাছে সময় বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, তাকে বেশি সময় দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি রুমিনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যেহেতু তিনি রুমিন ফারহানার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কথা বলেছেন, সেহেতু তাকে এক মিনিট সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন।
চলতি অধিবেশনসহ প্রথম অধিবেশনে জামায়াত ও এনসিপিসহ প্রায় সব আগ্রহী সংসদ সদস্য এই অধিকারগুলো ভোগ করে কমবেশি তাদের সংসদীয় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন বলা যায়।
তবে বাজেট বক্তৃতার পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দের সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বাজেট অননুমোদন, মিতব্যয়িতা এবং প্রতীকী বাজেট কমানোর জন্য ছাঁটাই প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই ছাঁটাই প্রস্তাব বছরে একবারই হয় এবং সেগুলোর ওপর আলোচনার জন্য স্পিকার নির্ধারিত কিছু সংসদ সদস্যকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেন।
এই ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো গৃহীত হয় না, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ব্যর্থতা, সমস্যা, এমনকি মন্ত্রীদেরও সমালোচনা করতে পারেন।
সে ব্যাপারে মন্ত্রীরা একটু বেশি সময় ধরে তাদের বিরুদ্ধে আনীত আপত্তি নিয়ে জবাব দেন, সেটি সঠিক। ফলে এই আলোচনার মাধ্যমে জনগণ জানতে পারে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো জনগণের দেওয়া অর্থের বিপরীতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে কি না। বলা যায়, এই ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো সরকারের জবাবদিহিতার একটি কৌশল, যা বছরে একবারই আসে।
২০১৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির হাতে গোনা কয়েকজন সদস্য এবং আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টির সদস্যরাও ছাঁটাই প্রস্তাব আলোচনাকালে মন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়গুলোর বেশ কঠোর সমালোচনা করতেন। সে সময়কার উল্লেখযোগ্য এমপিরা ছিলেন বিএনপির হারুনুর রশীদ, রুমিন ফারহানা, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, এবং জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ অন্যান্যরা।
বর্তমান সংসদে ৩৮টি ছাঁটাই প্রস্তাব আলোচনার জন্য নির্ধারণ করেন স্পিকার, যা একটি রেকর্ড। এর আগে সর্বোচ্চ আটটি বা দশটি ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া হতো। এগুলোর ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত করতে পারলে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বর্তমান সংসদ, এমনকি বিরোধীদল জামায়াতও একটি ইতিহাস করতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া করে দিলেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
৩০ জুন ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা চলাকালে জামায়াতের সদস্যরা প্রথম দিকে বেশ আগ্রহের সঙ্গেই বক্তব্য রাখছিলেন এবং ছাঁটাই প্রস্তাবগুলোর ওপর দেওয়া ভোটে বেশ জোরেশোরে কণ্ঠভোটে অংশ নিচ্ছিলেন। কিন্তু যত সময় যাচ্ছিল, জামায়াতের সদস্যদের কণ্ঠস্বর ততই ক্ষীণ হয়ে আসছিল—যা আমি সাংবাদিক গ্যালারি থেকে প্রত্যক্ষ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, তারা বিষয়টির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এমনকি একপর্যায়ে তাদের অনেক সদস্য সংসদ কক্ষ ত্যাগ করছিলেন।
তেত্রিশ নম্বর ছাঁটাই প্রস্তাব পাসের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, তার দলের সদস্যরা এই সব ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং সেগুলো রেওয়াজের অংশ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এরপর বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তিনি সংসদের রেওয়াজের প্রতি সম্মান রেখেই বাকি ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করে নিতে চান এবং জানতে চান সেটি সম্ভব কি না। এই প্রস্তাবের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে স্পিকার সিদ্ধান্ত দেন যে, সেটি সম্ভব। এর ফলে বাকি প্রস্তাবগুলো নিয়ে আর আলোচনা হয়নি।
মুহূর্তেই সংসদে মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা বেশ কিছুক্ষণ ধরে টেবিল চাপড়ে তাদের সমর্থন প্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীন দল এক প্রকার ওয়াকওভার পেয়ে গেল। বাকি মন্ত্রণালয়গুলোর বরাদ্দ কেবল হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে কোনো আলোচনা-সমালোচনা ছাড়াই পাস হয়ে গেল। কোনো সমালোচনা সহ্য করতে হলো না সরকারকে। এর ফলে জনগণের জানার অধিকার খর্ব হলো।
এই ঘটনার মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান যে কৌশলগত ভুল করেছেন, সেটিকে তার অপরিপক্বতা বললে ভুল হবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য একটি বাজে নজির স্থাপন করে গেলেন তিনি। এরপর থেকে হয়তো নামেমাত্র দুই-একটি মন্ত্রণালয়ের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব আলোচনা করে বাকিগুলো কোনো প্রকার আলোচনা-সমালোচনা ছাড়াই পাস হয়ে যাবে।
বর্তমান সংসদ যেখানে একটি ইতিবাচক নজির স্থাপন করতে পারত, সেটি না করে বিরোধীদলীয় নেতা একটি নেতিবাচক নজির স্থাপন করে রাখলেন। এখানেই পার্থক্য একটি পরিপক্ব বিরোধীদল ও একজন বিরোধীদলীয় নেতা এবং একটি অপরিপক্ব বিরোধীদল ও একজন বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে।
শফিকুর রহমান কেন এমন প্রস্তাব করলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি সংসদের সংসদের উচ্চপদে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যের কাছে জানলাম ভিন্ন ঘটনা। তিনি বিষয়টি আমাকে যেভাবে বলেছেন, “তারা (জামায়াত) মনে করেন প্রস্তাব দিলে সেটি গ্রহণ করতে হবে। এটিই সমস্যা। সংসদে তাদের অনেক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে ক্ষমতাসীন দল। কিন্তু সব প্রস্তাব তো আর গৃহীত হবে না!”
তিনি সঠিকভাবেই বলেছেন, বিরোধীদলের সব প্রস্তাব গৃহীত হবে না—এটিই স্বাভাবিক। এতে আবেগী হওয়ার কিছু নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম মূল উপাদান হলো বিতর্ক ও খোলামেলা আলোচনা। এই বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি এবং তথ্য-পাল্টা তথ্যের মাধ্যমে জনগণ অবহিত হয়ে থাকেন এবং তারা ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদলগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। এর ভিত্তিতে জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। এটিই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। জামায়াতকে এই বিষয়টি বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সংসদে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে।
কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন দুই দশকেরও বেশি। ই-মেইল: [email protected]