Published : 08 Jul 2026, 07:17 PM
আবুল কাসেম ফজলুল হক তার শিক্ষকতা ও লেখালেখির জীবনে বাংলাদেশে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন ব্যক্তিত্ব। সবসময় একজন অহিংস, নির্লোভ, সমাজদরদী, অন্যের প্রতি সহমর্মী ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করেছেন তিনি। আর চিরতরুণের মত বুকে পুষেছেন সমাজ পরিবর্তনের আপসহীন স্বপ্ন। তার সমস্ত সাহিত্য সাধনা এই এক উদ্দেশ্যেই নিবেদিত ছিল। দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি তাকে সবসময় পীড়িত করেছে, তবে কখনো হতাশ করেনি। এক সুন্দর সংস্কৃতিবান যুক্তিবোধসম্পন্ন নৈতিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন আমৃত্যু তাকে তাড়া করেছে। আর এই স্বপ্ন পূরণে তিনি অনেক বেশি ভরসা করতেন তরুণ সমাজের ওপর।
স্যার যখন অপরাজেয় বাংলার উল্টো দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টারে থাকতেন তার বাসায় প্রায়ই যেতাম। দীর্ঘসময় ধরে তিনি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, কেন্দ্রীয় বিষয় অবশ্যই হতো রাজনীতি ও সমাজের গতিপ্রকৃতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ। কারো সম্পর্কে বিদ্বেষ ও বিষোদগার কখনই প্রকাশ পেত না। তবে কবি-লেখকদের সমালোচনা করতেন, সবচেয়ে বেশি আক্ষেপ করতেন ভালো মানের লেখার অভাব নিয়ে। যেসব লেখক আমাদের দেশে খ্যাতিমান ও আমরা যাদের অনেকের প্রতি মোহগ্রস্ত তাদের অনেকের ব্যাপারে তার কণ্ঠে হতাশা প্রকাশ পেত। যাদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তারা সত্যিকার অর্থেই আমাদের সাহিত্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখক, এমনকি কম আলোচিত হলেও।
তিনি যেমন ছিলেন অনেকের প্রতি উদাসীন, তেমনি কারো কারো প্রতি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। নবইয়ের দশকে রশীদ করীমের উপন্যাস আমাকে অনেক বেশি আচ্ছন্ন করেছিল। স্যারকে একদিন কথাটা বলতেই তিনি বললেন, তুমি রশীদ করীমকে নিয়ে একটা লেখা লিখ। স্যারের সম্পাদনায় তখন ‘লোকায়ত’ নামে একটি উঁচু মানের সাহিত্য পত্রিকা বের হতো। বললেন, তুমি লেখো, আমি ‘লোকায়ত’তে ছাপাব। বললাম, স্যার কত বড় হতে পারে লেখাটা। বললেন, কোনো সমস্যা নেই, যত বড় হয় হবে। প্রয়োজনে আমি কেবল রশীদ করীমকে নিয়ে তোমার একটা লেখা দিয়েই একটা সংখ্যা ছাপাব। তবে এ দায়িত্বটা পালনের মতো সক্ষমতা তখন আমার ছিল না, ফলে আর লেখা হয়ে ওঠেনি। কথাটা উল্লেখ করছি, স্যারের সাহিত্য সমালোচনা ও প্রীতি সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়ার জন্য।
বাংলা সাহিত্যের লেখকদের মধ্যে আবুল হুসেন ও কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিলো অপরিসীম। প্রায়ই তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা গোষ্ঠির কাজের উল্লেখ করতেন। বহু বছর পর এ বছরের ২০ জুন, অর্থাৎ তার মৃত্যুর পনের দিন পূর্বে, এ বিষয়ক একটি আলোচনাতেই স্যারের সঙ্গে আমার ও আমাদের ছোটকাগজ ‘বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি’র সদস্যদের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা। ‘বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি’র উদ্যোগে ওই দিন বিকালে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান রচিত জীবনধর্মী উপন্যাস ‘নিষুপ্ত জাগরণ’-এর প্রেক্ষাপট ও সমকালীন মূল্যায়ন শীর্ষক একটি বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপন্যাসটি মুসলিম সাহিত্য সমাজের ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের প্রধান সংগঠক আবুল হুসেনের জীবন ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে রচিত। উল্লেখ্য, উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে স্যারের ছেলে ফয়সাল আরেফিন দীপনের প্রকাশনা সংস্থা জাগৃতি থেকে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার বক্তৃতায় তিনি বলেন, “১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা গোষ্ঠি আন্তরিকতা নিয়ে প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে সত্য নির্মাণের জন্য চেষ্টা করতেন। প্রবীণরা এদের বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু নবীনদের মনোভাব ছিল তারা তাদের কথা বলুক। সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে কোথায় কতটা কমপ্রোমাইজ করতে হবে তা তারা জানতেন।”

আবার ঠিক আগের দিনই অর্থাৎ ১৯ জুন আরেকটি অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতি অম্লান স্মৃতি হয়ে আছে ও থাকবে। ঢাকার শ্যামলীতে ওই অনুষ্ঠানটি ছিল ‘৮ম শিক্ষালোক লেখক-শিল্পী সম্মিলন’ উপলক্ষে। যেখানে শিক্ষালোক সম্মাননা-২০২৬ প্রদান করা হয় শিক্ষাবিদ শহিদুল ইসলাম, কবি সৈকত হাবিব ও পাঠাগার সংগঠক আবদুস ছাত্তার খানকে। আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মাননা স্বরূপ তিনজন গুণী ব্যক্তির হাতে পদক তুলে দেন। ওই অনুষ্ঠানে স্যার শিক্ষা সম্পর্কে খুব সুচিন্তিত একটি মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন। যার পুরোটা ভিডিওরেকর্ডকৃত।
২০ জুনের আলোচনা অনুষ্ঠানে স্যার বলেছিলেন, “বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনজনের অবদান আছে, শেরে-বাংলা, ভাসানী ও শেখ মুজিবের।“ এছাড়াও বলেন, “কোন জাতির উন্নতির জন্য রাষ্ট্রকে সার্বজনীন করতে হয়। নানা জাতি গোষ্ঠি নিয়েই রাষ্ট্র হবে। সমাজে ধনী-গরিব আছে, এটা থাকবে তবে এটা কমিয়ে আনার আয়োজন দরকার। সমাজে অন্যায় অবিচার থাকে, তবে ন্যায় চর্চা করতে হবে।” শিখা গোষ্ঠি সম্পর্কে তিনি বলেন, “তারা একসাথে কাজ করেছেন। তারা সংখ্যায় কম ছিলেন, কিন্তু ছিলেন শক্তিমান।”
তার লেখালেখি ও চিন্তায় নীতিনৈতিকতার প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থিত। ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ বই নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানেও তিনি বলেন, “আমাদের রাজনীতিতে সৎ নেতৃত্ব দরকার।” এই ন্যায় চর্চার ও সৎ নেতৃত্বের কথা তিনি আগেও বহুবার উচ্চারণ করেছেন। আসলে আবুল কাসেম ফজলুল হকের লেখাসমূহের একটি অন্তর্লীন বক্তব্য হচ্ছে নৈতিকতা। আমাদের দেশের বর্তমান লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এটি তার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক।
এ প্রসঙ্গ উল্লেখ্য যে, আমরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে গত বছর অক্টোবরে নৈতিক দর্শন বিষয়ে ‘নী’ নামে একটা ছোটকাগজের প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করি । যেখানে আবুল কাসেম ফজলুল হকের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় নৈতিকতা বিষয়ে। সেখানে তিনি বলেছেন, “মানুষের আর্থিক উন্নতির সাথে সাথে মানুষের নৈতিক উন্নতি সমান গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা উচিত। নৈতিকতা নিয়ে পত্রপত্রিকাতে লেখায় আমার অনেক পরিচিতজনও আমাকে বলতেন, এটা নিয়ে আপনি কেন লিখছেন, এটা তো মোল্লা-মৌলভীদের ব্যাপার। আমি বলেছি—না, এটা কমিউনিস্টদেরও ব্যাপার, বামপন্থীদেরও ব্যাপার।” সাক্ষাৎকারটিতে তিনি আরও বলেন, “নৈতিক বিবেচনা এবং অর্থনৈতিক বিবেচনাকে এক সাথে ভাবতে হবে। সাইকেলেজিস্টরা মন নিয়ে কী বলেন। পারিপার্শ্বিকতা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কে যায়। এর মধ্য দিয়ে সে বিচার বিবেচনা করে। দুনিয়া বদলাচ্ছে। প্রকৃতি বদলাচ্ছে। মানুষের অভিজ্ঞতা বদলাচ্ছে। এর মধ্যে পরিবর্তনশীলতা দরকার। পরিবর্তনশীলতা প্রকৃতির নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে করতে হবে। জরবদস্তি করে ভালো কিছু প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মানুষের খাওয়াপরার পরই নৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা প্রয়োজন। নৈতিকতা একটা জীবনের ব্যাপার।”
নৈতিক দর্শন নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক কমবেশি ভাবনাচিন্তা করেছেন যা তার বিভিন্ন লেখায় ও আলোচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে তার আগ্রহ সমসাময়িক লেখক-বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, মাস দুয়েক আগে তিনি হঠাৎ ফোন করে বলছিলেন, “তোমাদের নৈতিক দর্শনের ছোটকাগজটা কিন্তু বন্ধ করবে না। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেছ। খুবই প্রয়োজনীয়। পরের সংখ্যাটা প্রকাশের উদ্যোগ নাও।” বলেছিলাম, “বন্ধ করব না, স্যার। অবশ্যই উদ্যোগ নেব।”
তার সাহিত্যবোধ ও মূল্যায়ন গতানুগতিক নয়, ছিল ব্যতিক্রমী ও অর্থবহ। প্রচলিত, চর্বিতচর্বণ, সাময়িক বিনোদনমূলক সাহিত্যচর্চা তাকে আকর্ষণ করত না। চাইতেন নতুন চিন্তার বিকাশ। ভালবাসতেন সাহিত্যে চিন্তাশীল সমালোচনা। নব্বইয়ের দশকে ‘লোকায়ত’ সাময়িকীতে নীরদচন্দ্র চৌধুরীকে তীব্র সমালোচনা করে আমার একটা লেখা বের হয়েছিল। স্যার বলেছিলেন, “তোমার লেখাটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকের মাঝে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তারা এটা পছন্দ করেনি। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, লেখাটা ভালো হয়েছে। সঠিক লিখেছ।”
মাঝে মাঝে স্যারের লেখারও সমালোচনা করেছি, ধৈর্য্য ধরে শুনেছেন। ধৈর্য্যের ক্ষেত্রে তিনি যে পর্বতসমান তার প্রমাণ দিয়েছেন পুত্র দীপনের মৃত্যুর পর। কারো কাছে বিচার প্রার্থনা না করে নিজে অটল থেকে কাঁপিয়েছিলেন দেশকে একটি ছোট্ট উক্তি দিয়ে: শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
শুভবুদ্ধির কি এখনো উদয় হয়েছে? কবে হবে কে জানে!
আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkha