Published : 11 Jul 2026, 08:39 AM
একসময় সরকারি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল সঞ্চয়পত্র। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিধবা নারী, ক্ষুদ্র সরকারি কর্মচারী কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু মানুষ জীবনের জমানো সঞ্চয় রাখতেন এখানেই। কারণ, তাদের বিশ্বাস ছিল রাষ্ট্রের কাছে রাখা টাকা যেমন নিরাপদ, তেমনি নিয়মিত একটি নির্ভরযোগ্য মুনাফাও মিলবে। বহু বছর ধরে এই আস্থার ওপর ভর করেই সরকার বাজেট ঘাটতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অর্থ জোগাড় করেছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার একটি নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হিসেবে সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিয়েছেন।
কিন্তু সেই সম্পর্কে এখন স্পষ্ট ফাটল ধরেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে টানা চার অর্থবছর সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক। ২০২২-২৩ সালে নিট বিক্রি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৩,২৯৫ কোটি টাকায়, ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ২১,১২৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়, ২০২৪-২৫ সালে কিছুটা কমে হয় ৬,০৬৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ এই নয় মাসেও নিট বিক্রি ঋণাত্মক ২,০৬৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ এ বছরও পুরো বছর ধরে ঋণাত্মক থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট। নিট বিক্রি ঋণাত্মক হওয়ার মানে সহজ, নতুন সঞ্চয়পত্র যত বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি টাকা পরিপক্ব সঞ্চয়পত্রের আসল হিসেবে মানুষকে ফেরত দিতে হচ্ছে। পুরনো বিনিয়োগ শেষ হয়ে যাচ্ছে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বেশি গতিতে।
সঞ্চয়পত্রের এই ধারাবাহিক পতন শুধু একটি আর্থিক পণ্যের জনপ্রিয়তা কমার গল্প নয়, এর পেছনে রয়েছে মানুষের সঞ্চয়ক্ষমতার অবনতি। গত দুই বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে অনেক পরিবারের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই চলে যাচ্ছে খাবারের পেছনে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। অনেক তরুণ এখনো স্থায়ী চাকরি পাননি, আবার কেউ কেউ নিয়মিত চাকরি হারিয়ে অনিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সংসারের নিয়মিত ব্যয় মেটানোর পর নতুন করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার সুযোগ খুব কম মানুষেরই থাকে। বরং প্রয়োজন মেটাতে অনেকেই পরিপক্ব হওয়ার আগেই পুরোনো সঞ্চয়পত্র ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সরকারের জন্যও এই খাত থেকে আগের মতো অর্থ সংগ্রহ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সঞ্চয়পত্রের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে সরকার স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকেছে ব্যাংক খাতের দিকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাতের অংশ ৮৫ শতাংশের বেশি, আর আগামী তিন অর্থবছরে এই নির্ভরতা গড়ে ৮৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এটাকেই অর্থনীতিতে বলা হয় ক্রাউডিং আউট। সরকার যত বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, উদ্যোক্তারা তত কম পান, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি শ্লথ হয়, রাজস্ব সংগ্রহ কমে, আর বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ে। একবার এই পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়। ব্যাংকগুলোর তরলতা কমে যায়, বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঠেলে যান অনানুষ্ঠানিক বাজারের দিকে যেখানে সুদের হার অনেক বেশি, আর সবমিলিয়ে পুরো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিই মন্থর হয়ে পড়ে।
শুধু নতুন আর্থিক পণ্য চালু করে এই সংকটের সমাধান হবে না যদি মানুষের সঞ্চয়শক্তি ক্ষয়ের মূল কারণ অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়ের অস্থিরতা নিয়ে কাজ করা না হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই সামনে এসেছে সুকুক। সুকুক হলো ইসলামী শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণকারী একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যা সুদের বদলে সম্পদ বা প্রকল্পের প্রকৃত আয় থেকে মুনাফা দেয়। ঐতিহ্যবাহী বন্ড সুদভিত্তিক হওয়ায় তা ইসলামে নিষিদ্ধ রিবা হিসেবে গণ্য হয়, ফলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এতদিন সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারত না। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম সার্বভৌম সুকুক চালু করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের অর্থায়নে। সেখান থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুন নাগাদ নবম সুকুক পর্যন্ত ইস্যু করা হয়েছে, মোট সংগৃহীত হয়েছে ৪২,৪০০ কোটি টাকা। আর এই জুনেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নয় মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি সুকুক ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অর্থায়নকে আরও নমনীয় করবে।
সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় এই পণ্যের প্রতি আগ্রহ কতটা। অষ্টম সুকুকে ৫,৯০০ কোটি টাকা ইস্যুর বিপরীতে বিড এসেছিল ৭২,৫৯৮ কোটি টাকার, অর্থাৎ ঘোষিত পরিমাণের ১২.৩০ গুণ বেশি। নবম সুকুকেও একই ধরনের চিত্র, ৫,৬০০ কোটি টাকার বিপরীতে বিড পড়েছে ৪৭,৪৯১ কোটি টাকার, প্রায় ৮.৫ গুণ বেশি। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই বিপুল চাহিদার রহস্য কী? কারণটা আসলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার গঠনেই লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের এবং এতদিন এই বিশাল তহবিল সুদভিত্তিক বিল-বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় কার্যত নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকত। সুকুক সেই দরজাটা খুলে দিয়েছে, আর তাই শরিয়াহ ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা প্রতিষ্ঠান সবাই একই নিলামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আর পাকিস্তান এই পথে অনেক আগেই এগিয়ে গেছে, মালয়েশিয়ার সুকুক বাজার তো এখন বিশ্বের বৃহত্তম। বাংলাদেশও সেই পথ ধরেই এগোচ্ছে এবং সরকার এখন আরও একধাপ এগিয়ে শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর কথা ভাবছে, যার মুনাফার হার নির্ধারণ করবে একটি কারিগরি কমিটি। এটা বাস্তবায়িত হলে ইসলামী অর্থায়ন প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে, যেটা একসময় সঞ্চয়পত্রের মূল শক্তি ছিল।
তবে এত সাফল্যের গল্পের মধ্যেও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়। অষ্টম সুকুকে যে ৭২ হাজার কোটি টাকার বিড জমা পড়েছিল তার বিপরীতে ইস্যু হয়েছে মাত্র ৫,৯০০ কোটি, মানে বিনিয়োগকারীদের ৯২ শতাংশের বেশি টাকা ফেরত গেছে। পুঁজিবাজারে যেমন বারবার আবেদন করে বরাদ্দ না পেলে একসময় মানুষ আবেদন করাই বন্ধ করে দেয়, সুকুকেও এই অপূর্ণ চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে একই হতাশা তৈরি করতে পারে। আর বরাদ্দের হিসাব দেখলে বোঝা যায় এই বাজারে এখনও কার আধিপত্য বেশি। শরিয়াহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মোট বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো ১০ শতাংশ, আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও প্রভিডেন্ট ফান্ড মিলে মাত্র ৫ শতাংশ। তাহলে সঞ্চয়পত্রের সেই চিরচেনা ক্রেতা, যে সাধারণ মানুষ, তিনি কোথায়? উত্তর হলো তিনি এই ৫ শতাংশের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত প্রচার, সহজ পদ্ধতি আর ব্যাংক শাখা পর্যায়ে সঠিক প্রশিক্ষণ।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা থেকে যায় শেষেই। সঞ্চয়পত্রের পতনের মূল কারণ মানুষের সঞ্চয়শক্তির ক্ষয়, সেই সমস্যার সমাধান সুকুক বা শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র একা দিতে পারবে না। যিনি একসময় নিয়মিত সঞ্চয়পত্র কিনতেন, মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে আর কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় তিনি নতুন পণ্য এলেই ফিরে আসবেন না। এভাবে চলতে থাকলে যা ঘটতে পারে তা হলো নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর টাকায় পুরনো সাধারণ বিনিয়োগকারীর দায় মেটানো, যা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো কোনো কাঠামো নয়।
তবে মানুষের আয় যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে শুধু নতুন আর্থিক পণ্য চালু করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। মানুষের সঞ্চয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আয় বাড়ানোর দিকেই আগে নজর দিতে হবে। এই ভিত্তি শক্তিশালী হলে সুকুকসহ যেকোনো নতুন আর্থিক উদ্যোগও কার্যকর হবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com