০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

মবের উল্লাস ও আইনের শাসন: শাঁখের করাতে পুলিশ

ক্ষমতার পালাবদলে দশকের পর দশক পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে। কিন্তু সেই প্রাতিষ্ঠানিক ভুলের নির্মম মাশুল আজ দিতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের সাধারণ সদস্যদের। আইনি সুরক্ষার অভাব আর গণক্ষোভের দোলাচলে পিষ্ট হয়ে বাহিনীটির নৈতিক মনোবল এখন তলানিতে।

মবের উল্লাস ও আইনের শাসন: শাঁখের করাতে পুলিশ
গুজবকে কেন্দ্র করে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় উগ্র জনতার অতর্কিত হামলায় আক্রান্ত পুলিশের এক সদস্য। ছবি: ভিডিও থেকে

ফজিলাতুন নেসা শাপলা ফজিলাতুন নেসা শাপলা

Published : 12 Jul 2026, 12:35 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:31 PM

“ভাই, আমি তো আপনাদেরই ঘরের সন্তান। আমার কী দোষ?”

উন্মত্ত জনতার লাঠিসোঁটার মুখে হাতজোড় করা রক্তাক্ত পুলিশ সদস্যের আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ৯ জুলাই রাত থেকে। দৃশ্যগুলো সাধারণ মানুষের মুঠোফোনে ঘুরছিল। তাৎক্ষণিকভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত জানা না গেলেও, ১০ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ) তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। বিবৃতির সূত্রে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায়।

থানায় পুলিশ হেফাজতে আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। হামলায় পুলিশসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। সংগঠনটি ঘটনাটিকে দেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতির’ বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৮ জুলাই সন্ধ্যায় আগৈলঝাড়া থানা-পুলিশ চুরির মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে (২৬) গ্রেপ্তার করে। রিয়াজ মাদকাসক্ত ছিলেন। থানাহাজতে থাকাকালে তিনি নিজের মাথায় আঘাত করে জখম হন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতে তাকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৯ জুলাই দুপুরে রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে দলবদ্ধ লোক আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালায়।

পুলিশ হেফাজতে আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। ঘটনাটিকে দেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতির’ বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ছবি: ভিডিও থেকে

পুলিশ হেফাজতে আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। ঘটনাটিকে দেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতির’ বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন

ভিডিওতে আমরা হামলার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখেছি। কনস্টেবলের হাতজোড় করা আকুতি উগ্র জনতার বধির কান শোনেনি, অন্ধ চোখ দেখতে পায়নি। বিকেলে পরিস্থিতি শান্ত হলে পিচঢালা রাস্তায় পড়ে রইল শুধু ভাঙা কাচ, পোড়া গাড়ির কঙ্কাল আর রক্তের দাগ।

পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ থাকতেই। ক্ষোভ থাকা কোনো অন্যায় নয়। বিগত দিনগুলোয় পুলিশের কর্মকাণ্ড মানুষ ভুলে যাবে কি না, সেই প্রশ্ন আসতেই পারে। কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের ধরন সমাজকে আদিম যুগে নিয়ে গেলে ক্ষতি সবার। পুলিশের মতো সশস্ত্র বাহিনীর ওপর এমন হামলার সময় তারা কেন চুপ থাকে, কেন নিজেদের বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় না, সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। এখানেই লুকিয়ে আছে নির্মম সত্য। আমাদের দেশের পুলিশ আসলে ভেতর থেকে ‘হাত-পা বাঁধা’ বাহিনী, যা আজকের সমাজ গোচরেই আনছে না।

দশকের পর দশক পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার করার চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনেরা পুলিশকে ব্যবহার করেছে প্রতিপক্ষ দমনে। শুধু গত সতেরো বছর নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করেছে এমন নয়, এ দেশে যখনই যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, পুলিশ তাদের অনুগত থেকেছে। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে তারা ‘নিরাপত্তা রক্ষাকারী’র চেয়ে ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।

ওপর মহলের নির্দেশ অমান্যের ক্ষমতা সাধারণ কনস্টেবল বা ওসির থাকে না। চাকরি বাঁচানো ও পরিবারের মুখে অন্ন জোগানোর তাগিদে আদেশ মানতে তারা বাধ্য হন। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় নীতিনির্ধারণি ভূমিকাহীন মাঠপর্যায়ের সাধারণ পুলিশ সদস্যদেরই পুরো বাহিনীর ভুলের মাশুল দিতে হয়। অথচ তারা শুধুই চাকরি করেন ও বিধির প্রতি অনুগত থাকেন। থানার কনস্টেবল কিংবা ট্রাফিক পুলিশ কত বেতন বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান, তা কেউ খতিয়ে দেখে না।

বিগত দিনগুলোর অতি-রাজনীতিকরণ এবং চব্বিশ-পরবর্তী ঢালাও সহিংসতা ও বিচারহীনতার কারণে পুলিশের নৈতিক মনোবল এখন তলানিতে। রাজনীতিকরণ এখনো বন্ধ হয়নি। পুলিশ বাহিনী ক্ষমতাসীন সরকারের হয়েই কাজ করছে, মাঝখান থেকে সদস্যরা ভুগছেন দ্বিমুখী সংকটে। একদিকে জনগণের তীব্র ক্ষোভ, অন্যদিকে আইনি সুরক্ষার অভাব।

সুযোগসন্ধানী মানুষ নিজেদের সুবিধা হাসিলে নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মব তৈরি করছে। পুলিশ মব ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ করলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে উল্টো কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। ভীতি পুলিশ সদস্যদের সিদ্ধান্তহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আত্মরক্ষা করবে নাকি মার খাবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।

পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কোনো সরকার আন্তরিকভাবে করেনি। রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে ওঠার মতো স্বাধীন আইনি কাঠামো তাদের দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রের কাছে আইনি হাত-পা বাঁধা থাকায় তারা স্বাধীনভাবে জনবান্ধব হতে পারেনি। জনগণের ক্ষোভের মুখে রাষ্ট্রও সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, পুলিশ রাজনৈতিক নির্দেশে গুলি চালালে দোষী, আবার মবের মার খেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও মানুষ বলে—তারা ঠুঁটো জগন্নাথ। বাহিনীর মনোবল ভয়ংকরভাবে ভেঙে পড়েছে।

পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট যেমন সত্যি, কর্মরত সবাই খারাপ বা অসৎ—এমন অতিসাধারণীকরণও সঠিক নয়। আস্থার সংকট জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে, যার আগুনে ঘি ঢেলেছে চব্বিশের আন্দোলন। আন্দোলনে পুলিশ জনগণের প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থের চেয়ে রাষ্ট্রীয় আদেশে দায়িত্ব পালন করেছে বেশি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও পুলিশ রাষ্ট্রীয় আদেশ পালন করতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার মতো কাজ করেছে। প্রমাণিত হয়, পুলিশকে সরকারের আদেশ মানতেই হয়।

অতীতে পুলিশ কী করেছে, সেই ক্ষোভের আগুনে প্রতিদিন থানা পুড়িয়ে দিলে সমাজ কোন দিকে যাবে, তা বিবেচ্য। সময়টা এখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নিয়মে চলছে। লাগাতার সহিংসতা সমাজকে গভীর সংকটে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ রাস্তায় নামতে ভয় পেলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীদের পোয়াবারো হবে।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ নয়, পুলিশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একদল ইচ্ছামতো অপরাধকে ‘মব জাস্টিস’ নামে জাস্টিফাই করছে। সভ্য দেশের পরিচয় বিচারব্যবস্থার ওপর। অপরাধী যত বড়ই হোক, বিচার হবে আদালতে, রাস্তায় পিটিয়ে নয়। মব জাস্টিস বা গণপিটুনিকে সমাজ স্বীকৃতি দিলে বুঝতে হবে মুমূর্ষু ‘আইনের শাসন’ মৃত।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনিরাপদ হলে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে, কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম ও বেকারত্ব বাড়ছে। ক্ষতি ঘুরেফিরে সাধারণ মানুষের পকেটেই জমছে। রাষ্ট্রকে এখন ঘন অন্ধকার জঙ্গলের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার সময় চলে এসেছে। কঠোর হস্তে মবের নামে বিশৃঙ্খলা দমন করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। অপরাধীর কোনো দল বা আদর্শ থাকতে পারে না। দলবদ্ধ অন্যায় রুখতেই চব্বিশের আন্দোলন হয়েছিল, আদর্শটি যেন উল্টো পথে হাঁটছে।

পুলিশকে রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির লক্ষ্যে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। রাতারাতি বদল সম্ভব নয়, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের জন্য জনমত তৈরির এখনই সময়। অন্যায় দিয়ে কখনো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পুলিশের অতীত ভুলের বিচার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিশোধ হিসেবে পুলিশকে পিটিয়ে মেরে ফেললে দেশ অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

পাহারাদার চোর হলে পাহারাদার বদলাতে হবে, পরিবর্তন ও সংশোধন দরকার। পাহারাদারের পদটাই বিলুপ্ত হয়ে গেলে পুরো বাড়ি ডাকাতের দখলে চলে যাবে। আমাদের বেছে নিতে হবে—পাহারাদারের সংস্কার চাই, নাকি বিনাশ চাই। আমরা নিয়মতান্ত্রিক সভ্য দেশ হব, নাকি অন্ধ আক্রোশের মব জাস্টিসের কাছে ভবিষ্যৎ বন্ধক দেব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

ফজিলাতুন নেসা শাপলা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nessa7421@gmail.com