Published : 30 Apr 2026, 05:28 PM
সকালটা বেশ ভালোই শুরু হয়। গোসল সেরে, মুখে হালকা ক্রিম মেখে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বেশ তরতাজা লাগে। চুল ঠিকঠাক, ত্বকে একটা উজ্জ্বল আভা। মনে হয় দিনটা ভালোই যাবে।
তবে দুপুরে একবার অফিসের ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার দিকে তাকালে চমকে উঠতে হয়। ত্বক কেমন শুষ্ক, টানটান। চুল এলিয়ে পড়েছে, তেলতেলে ভাব এসে গেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। মনে হয় সকালের সেই মানুষটা অন্য কেউ ছিলেন।
এই অভিজ্ঞতা এখন শুধু একজনের নয়। যারা দিনের বেশিরভাগ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে কাটান, তাদের প্রায় সবারই একই গল্প। কিন্তু কেন এমন হয়?
ঠাণ্ডা বাতাস, শুকনো ত্বক — সম্পর্কটা যেভাবে কাজ করে
এসির কাজটা আসলে বেশ সহজ — ঘরের বাতাস থেকে গরম আর আর্দ্রতা টেনে নিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ছেড়ে দেওয়া। ঠাণ্ডা বাতাস পেতে গেলে ঘরের আর্দ্রতা কমে যাবেই। আর সেই শুকনা বাতাস যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ত্বকের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন ত্বকের ভেতরে যে প্রাকৃতিক জলীয়ভাব আছে, সেটা আস্তে আস্তে শুকিয়ে যেতে থাকে।
এই ব্যাখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন আরও বলেন, “প্রথমে মনে হয় মুখটা একটু টানটান লাগছে। তারপর শুষ্কতা। বেলা বাড়লে ত্বক রুক্ষ হয়ে আসে।”
এখন মজার ব্যাপার হল, শরীর এই শুষ্কতা মেনে নেয় না। ত্বক যখন টের পায় যে আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে, তখন সে নিজে থেকেই তেল উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এটি শরীরের একটি প্রাকৃতিক রক্ষাব্যবস্থা।
ফলে একটা উল্টো ছবি তৈরি হয়। ভেতর থেকে ত্বক শুষ্ক, কিন্তু বাইরে থেকে তেলতেলে দেখাচ্ছে।
“এই দ্বৈত সমস্যায় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। মুখ তেলতেলে দেখে ভাবেন ময়েশ্চারাইজার দরকার নেই। তবে ভেতরে ত্বক তখনও পানির জন্য কাঁদছে”- বলেন ডা. নয়ন।
চুলের গল্পটা আরেকটু জটিল
ডা. নয়ন বলেন, “ত্বকের মতো চুলেরও নিজস্ব আর্দ্রতা বজায় রাখার ব্যবস্থা আছে। মাথার ত্বক থেকে নিঃসৃত প্রাকৃতিক তেল চুলকে মসৃণ ও সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু এসির শুকনো বাতাস মাথার ত্বককেও শুষ্ক করে দেয়।”
ফলাফল? ত্বকের মতোই একই প্রতিক্রিয়া — শরীর বেশি তেল বের করতে শুরু করে। দিনের মাঝামাঝি সময়ে চুল এলিয়ে পড়ে, গোড়া তেলতেলে হয়ে যায়, আর পুরো চুল নিষ্প্রাণ দেখায়।
আবার অনেকে বারবার চুলে হাত দেন। এতে হাতের তেল ও ময়লা সরাসরি চুলে মিশে যায়, সমস্যা আরও বাড়ে।
বদ্ধ ঘর, জমে থাকা ধুলো — যে সমস্যাটা চোখে পড়ে না
এসি চালু থাকলে স্বাভাবিকভাবেই জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে হয়। বাইরের সতেজ বাতাস ঢোকার পথ থাকে না। অফিসের ভেতরে ধুলা, অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী কণা, এমনকি এসির ফিল্টারে জমা পুরানো ময়লাও বাতাসে ভাসতে থাকে।
এই পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকলে ত্বক নিস্তেজ হয়ে যায়। চোখে জ্বালাপোড়া হয়। মুখে অস্বস্তি তৈরি হয়। দিন শেষে বাড়ি ফেরার পথে নিজেকে আর তরতাজা লাগে না।
কারণ ততক্ষণে ত্বক সত্যিই একটা কঠিন দিন পার করে এসেছে।
‘স্ক্রিন’ ও ‘স্ট্রেস’ — দুটো নীরব শত্রু
শুধু এসিই সব দোষী নয়। অফিস মানেই সারাদিন কম্পিউটার বা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকা। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের আলোয় চোখ শুকিয়ে যায়, চোখে চাপ পড়ে।
একটানা বসে থাকলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন কমে যায়, আর তার প্রভাব পড়ে সরাসরি ত্বকের উজ্জ্বলতায়।
আর কাজের চাপ, ডেডলাইনের টেনশন? সেটাও ছাড় দেয় না। মানসিক চাপ বাড়লে শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। সেই হরমোন ত্বকের তেল উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দেয়। ব্রণ দেখা দেয়, মুখ নিস্তেজ লাগে।
ডা. নয়ন বলেন, “সব মিলিয়ে এসি, বদ্ধ ঘর, স্ক্রিন আর স্ট্রেস — চারটি মিলে ত্বক ও চুলের ওপর একটা নীরব আক্রমণ চালাতে থাকে সারাদিন ধরে।”
সহজ কিছু অভ্যাসে অনেকটাই সামলানো যায়
এই চিকিৎসক বলছেন, “সমস্যাটা পুরোপুরি এড়ানো না গেলেও কিছু ছোট ছোট অভ্যাসে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।”
সবার আগে পানি। দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর ভেতর থেকে আর্দ্র থাকে, ত্বকের শুষ্কতা কমে। অনেকে অফিসে ব্যস্ততার কারণে পানি পান করতে ভুলে যান। এই একটা অভ্যাসই বদলে দিতে পারে অনেকটা।
অফিসে যাওয়ার আগে ভালো ময়েশ্চারাইজার মেখে বের হওয়া উচিত। দুপুরে প্রয়োজন হলে হালকা করে আরেকবার দিন। এতে ত্বক সারাদিন টানটান বা রুক্ষ লাগবে না।
কাজের ফাঁকে ছোট ছোট বিরতি নিন। পাঁচ মিনিট হাঁটুন, জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ান বা একটু বাইরে গিয়ে খোলা বাতাস নিন। এতে শুধু ত্বক নয়, মনও হালকা হয়।
চুলে বারবার হাত দেওয়ার অভ্যাস থাকলে এটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাদ দিতে হবে। একান্ত দরকার হলে হালকা ড্রাই শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে — চুলকে তাজা রাখতে এটা বেশ কাজের।
নিজের যত্নটা অফিসের কাজের মতোই জরুরি
অফিসের পরিবেশ পুরোপুরি বদলানো হয়তো নিজের হাতে নেই। তবে ছোট ছোট অভ্যাস বদলানো সম্ভব।
সকালে যে মুখটা দেখে বের হন, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পরও সেই মুখটা যদি একটু সতেজ রাখতে চান — তাহলে পানি পান, ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা, আর নিজেকে একটু সময় দিলেই যথেষ্ট।
ব্যস্ততার মাঝেও এটুকু যত্ন নেওয়া মোটেই কঠিন নয়।
আরও পড়ুন
সারাদিন এসিতে থাকলে বাড়তে পারে ওজন