শীতের আগমনী বার্তায় শুষ্কতা ছড়ানোর আগেই ত্বক সুরক্ষার কৌশল
শীত আসার আগেই ত্বকে টান ধরা, চামড়া ওঠা কিংবা ঠোঁট ফাটার সমস্যা শুরু হয়েছে কি? তাহলে জেনে নিন ত্বকের যত্নে ‘তিন মিনিট সূত্র’ ব্যবহারের নিয়ম।
শরতের মিঠে রোদ পেরিয়ে প্রকৃতিতে এখন হালকা ঠান্ডা হাওয়া ও কুয়াশার পরশ। ক্যালেন্ডারের পাতায় শীত পুরোপুরি জেঁকে না বসলেও, এই প্রাক-শীত বা ঋতু পরিবর্তনের সময় ত্বকে এক ধরনের নীরব পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়।
অনেকের গালে টান ধরা, নাকের কোণায় চামড়া ওঠা বা ঠোঁট ফাটতে শুরু করার মতো লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ঠান্ডা বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় ত্বক থেকে দ্রুত প্রাকৃতিক তেল ও পানি শুষে নেয়, যার ফলে ত্বকের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক স্তর বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই শীতের আগেই রূপচর্চার রুটিনে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি।
ফেইসওয়াশ ও ক্লিনজার পরিবর্তন
প্রাক-শীতের এই সময়ে ভুল হল গরমকালের তীব্র ফেনা যুক্ত ফেইসওয়াশ বা ক্ষারযুক্ত সাবান অনবরত ব্যবহার করা।
ইয়াহু শপিং-এর রূপচর্চা-বিষয়ক কলামে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মিশেল হেনরি বলেন, “অনেকে মুখ ধোয়ার পর চামড়া একদম কড়া বা টানটান হওয়াকে ভালো মনে করেন, যা এই ঋতুতে ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। এটি ত্বকের রক্ষাকবচ ভেঙে দেয়।”
পরামর্শ: ডা. হেনরির মতে, এই সময়ে ফোমিং জেলের বদলে ক্রিইমি এবং ‘সোপ-ফ্রি’ বা সাবানমুক্ত, আর্দ্রতা রক্ষাকারী ক্লিনজার বেছে নেওয়া উচিত।
ক্লিনজার কেনার সময় তাতে গ্লিসারিন, সেরামাইডস বা অ্যালোভেরার মতো উপাদান রয়েছে কি-না, তা লেবেল মিলিয়ে দেখে নেওয়া ভালো।
ময়েশ্চারাইজারের স্তর বিন্যাস: ‘থ্রি-মিনিট রুল’
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইলিনয় ডার্মাটোলজি স্পেশালিস্টস’-এর প্রকাশিত এক স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশিকায়, শীতকালীন শুষ্কতা বা ‘জেরোসিস’ রুখতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের নিয়ম জানানো হয়। যাকে বলা হয় ‘থ্রি-মিনিট রুল’ বা তিন মিনিটের সূত্র।
পরামর্শ: গোসল বা মুখ ধোয়ার ঠিক তিন মিনিটের মধ্যে, ত্বক যখন হালকা ভেজা থাকে, তখনই ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। এটি ত্বকের লোমকূপের ভেতরে পানিকে আটকে রাখতে সাহায্য করে।
এই সময়ে হালকা জেলের বদলে হাইলুরোনিক অ্যাসিড, শিয়া বাটার, স্কোয়ালেন বা সেরামাইডস যুক্ত ঘন ক্রিম ব্যবহার করা উচিত।
স্ক্রাব ও সক্রিয় উপাদান কমানো
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা কেন্দ্র ‘ইউডব্লিউ মেডিসিন’-এর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিকোল ওয়াই. লি এক সতর্কবার্তায় জানান, শীতের আগে ভুল হল অতিরিক্ত স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েশন করা এবং তীব্র রেটিনয়েড বা অ্যাসিড ব্যবহার করা।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: ডা. লি-র মতে, এই সময়ে ত্বক এমনিতেই সংবেদনশীল থাকে, তাই ‘স্ক্রাব’ বা দানাযুক্ত ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
সপ্তাহে সর্বোচ্চ একবার ‘ল্যাকটিক অ্যাসিড’ বা ‘পিএইচএ’ যুক্ত অত্যন্ত মৃদু কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, যা মরা কোষ দূর করে অন্যান্য ক্রিমের কার্যকারিতা বাড়াবে।
দেহের ভেতর ও বাইরের আর্দ্রতা ও মেডিটেরেনিয়ান খাদ্যাভ্যাস
জার্মানির ‘স্কিন-কনসালটেন্সি’ গ্রুপ ‘লুই উইডমার’-এর চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু বাইরে থেকে দামি ক্রিম মাখলেই শীতের শুষ্কতা দূর করা সম্ভব নয়, যদি না শরীরের ভেতরের পুষ্টি ঠিক থাকে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: চিকিৎসকেরা মস্তিস্ক ও ত্বকের লিপিড ব্যারিয়ার মজবুত রাখতে প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডস (যেমন সামুদ্রিক মাছ, তিসি বা চিয়া বীজ), অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভূমধ্যসাগরীয় বা মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট রাখার সুপারিশ করেছেন, যা প্রাকৃতিকভাবেই ত্বকের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি দৈনিক অন্তত ২ থেকে ২.৫ লিটার পানি পান করা আবশ্যক।
ঠোঁট ও হাতের বিশেষ যত্ন
যুক্তরাজ্যের ‘গ্রেটার ল্যাঙ্কাশায়ার হসপিটাল’-এর চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের অনুমোদিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, শীতের শুষ্ক বাতাস দ্রুত আঘাত করে হাতের চামড়া এবং ঠোঁটে। কারণ এই অংশের ত্বক অত্যন্ত পাতলা হয়।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: প্রতিবার হাত ধোয়ার পর ‘হ্যান্ড ক্রিম’ ব্যবহার করা এবং ব্যাগে সবসময় পেট্রোলিয়াম জেলি বা স্কোয়ালেন যুক্ত আর্দ্রতা রক্ষাকারী লিপবাম রাখা উচিত।
রাতে ঘুমানোর আগে হাত ও পায়ে ভ্যাসলিন বা ঘন মলম মেখে সুতির মোজা পরে ঘুমালে চামড়া ফাটার ঝুঁকি কমে।
ঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও গরম পানির ফাঁদ
ভারতের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়শ্রী শরদ, জীবনযাপন-বিষয়ক সাময়িকী ‘এল ইন্ডিয়া’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শীতের শুরুতে গোসলের পানির তাপমাত্রা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পরামর্শ: অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে দীর্ঘক্ষণ গোসল করলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে। তাই সবসময় কুসুম গরম বা হালকা গরম পানি ব্যবহার করা উচিত। আর গোসলের সময়সীমা ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ভালো।
এছাড়া শোবার ঘরে একটি ‘কুল-মিস্ট হিউমিডিফায়ার’ ব্যবহার করলে, ঘরের বাতাসের আর্দ্রতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে বজায় রাখে, যা রাতে ত্বককে শুষ্ক হতে দেয় না।
এছাড়া, মেঘলা আকাশ বা শীতের দিন হলেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সমানভাবে ত্বকের ক্ষতি করে। তাই ঘর থেকে বের হওয়ার আগে অবশ্যই ‘এসপিএফ ৩০+’ যুক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করার কথা কোনওভাবেই ভোলা যাবে না।
