বাদামি ডিম বনাম সাদা ডিম: কোনটি বেশি ভালো?
খোসার রং যাই হোক, ডিমের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে নানান বিষয়ের ওপর।
ডিমের খোসার রংয়ের ওপর ভিত্তি করে ক্রেতাদের মধ্যে নানান লৌকিক বিশ্বাস ও বিভ্রান্তি কাজ করে।
অনেকেই মনে করেন, বাদামি ডিম বেশি প্রাকৃতিক, খাঁটি এবং পুষ্টিকর। অন্য দিকে, কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে সাদা ডিম বেশি সুস্বাদু এবং এটি বাদামি ডিমের চেয়ে বেশি পরিচ্ছন্ন।
তবে পোল্ট্রি বায়োলজির গবেষণায় দেখা গেছে, খোসার এই বাহ্যিক রংয়ের তারতম্যের সঙ্গে ডিমের ভেতরের পুষ্টি বা স্বাদের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
ডিমের খোসার রংয়ের পার্থক্যের কারণ
ডিমের খোসার রং সম্পূর্ণভাবে মুরগির জাত বা জিনের ওপর নির্ভর করে। ডিমের খোসা মূলত ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে তৈরি, যা প্রাকৃতিকভাবে সাদাই হয়।
তবে ডিম পাড়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় মুরগির জরায়ুতে উৎপন্ন বিশেষ রঞ্জক পদার্থ বা পিগমেন্টের কারণে খোসার রং বদলে যায়।
বাদামি ডিমের কারণ: বাদামি রংয়ের ডিম পাড়া মুরগির শরীর থেকে ‘প্রোটোপোরফাইরিন নামক রঞ্জক নিঃসৃত হয়।
এটি রক্তে থাকা ‘হেম’ উপাদান থেকে তৈরি হয়, যা মূলত রক্তকে লাল রং দেয়।
নীল বা সবুজ ডিমের কারণ: কিছু বিশেষ জাতের মুরগি যেমন, ‘অ্যামেরাউকানা’, ‘আরাউকানা’, ‘লুশি’ ও ‘ডংজিয়াং’ প্রজাতির মুরগি নীল বা নীলচে-সবুজ রংয়ের ডিম পাড়ে।
এর মূল রঞ্জক পদার্থটিকে বলা হয় ‘বিলিভারডিন’, যা ‘হেম’-এর ভাঙন থেকে উৎপন্ন হয়।
একই জাতের মুরগির ডিমের রংও অনেক সময় সামান্য হালকা বা গাঢ় তারতম্য দেখা দিতে পারে। মুরগির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আকারে বড় এবং তুলনামূলক হালকা রংয়ের ডিম পাড়ে।
এছাড়া পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসও রঞ্জক নিঃসরণের মাত্রাকে কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে।
পুষ্টিগুণ ও স্বাদের বাস্তবতা
বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বাদামি ও সাদা ডিমের পুষ্টিগুণের মধ্যে চিকিৎসাগতভাবে কোনও বড় ধরনের পার্থক্য নেই। খোসার রং যা-ই হোক না কেন, একটি মাঝারি আকারের সাধারণ ডিমে প্রায় ৭০ কিলোক্যালরি শক্তি বা ক্যালোরি থাকে।
এটি উচ্চ মানের প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন, প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান এবং ভিটামিনের প্রাকৃতিক উৎস। ডিমের ভেতরের পুষ্টি এবং স্বাদ আসলে মুরগির বাসস্থান, পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে, খোসার রংয়ের ওপর নয়।
পরিবেশের প্রভাব: যে মুরগিগুলো খাঁচায় বন্দি না থেকে খোলা জায়গায় রোদে ঘুরে বেড়ায়, তাদের ডিমে খাঁচায় বন্দি মুরগির তুলনায় প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি ভিটামিন ডি থাকে।
খাবারের প্রভাব: যেসব মুরগিকে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস সমৃদ্ধ খাবার যেমন— তিসি বা বিশেষ সামুদ্রিক শৈবাল খাওয়ানো হয়, তাদের ডিমে ওমেগা-থিস-এর মাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই অনেক বেশি থাকে।
সতেজতা: ডিমের স্বাদের প্রধান শর্ত হল, এর সতেজতা এবং রান্নার ধরন।
খামারের ডিম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দূরপাল্লার পরিবহনের মধ্য দিয়ে আসে বলে কিছুটা বাসি হতে পারে। অন্য দিকে, বাড়ির আঙিনায় পালা মুরগির তাজা ডিম দ্রুত রান্নাঘরে পৌঁছায়, ফলে খেতে বেশি সুস্বাদু লাগে।
রেফ্রিজারেইটরে সঠিক ও স্থিতিশীল কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে ডিমের স্বাদ দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ণ থাকে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
