যেভাবে ডিম খেলে মিলবে সর্বোচ্চ পুষ্টিগুণ
সঠিক নিয়মে রান্না না করলে ডিমে সম্পর্ণ পুষ্টি নাও মিলতে পারে।
সুস্থ পেশি গঠন, হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা এবং শরীরের প্রতিটি কোষের সুরক্ষায় প্রোটিন অপরিহার্য উপাদান। আর সাশ্রয়ী মূল্যে প্রোটিনের সেরা উৎস হিসেবে ডিমের জুড়ি মেলা ভার।
তবে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডিম খেলেই শরীর পুরো প্রোটিন শোষণ করতে পারে না; এর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ডিম রান্নার বা খাওয়ার ‘সঠিক নিয়মের’ ওপর।
ভুল উপায়ে ডিম খেলে এর জরুরি অনেক পুষ্টি উপাদান শরীর গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়।
জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইটন রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, ডিম থেকে সর্বোচ্চ প্রোটিন পাওয়ার প্রথম শর্ত হল, এটি পুরোপুরি রান্না করে খাওয়া এবং কাঁচা ডিম খাওয়ার ভুল অভ্যাস বর্জন করা।
সর্বোচ্চ প্রোটিন শোষণের সূত্র
‘বডি বিল্ডার’ বা ক্রীড়াবিদদের মাঝে পেশি বৃদ্ধির জন্য সকালে কাঁচা ডিম বা কাঁচা ডিমের সাদা অংশ পানের একটি প্রবণতা দেখা যায়। তবে বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।।
প্রোটিন ভেঙে নেওয়া: যুক্তরাষ্ট্রের মেনোপজ ও স্পোর্টস ডায়েটিশিয়ান ডা. থেরেসা ডিলোরেনজো ব্যাখ্যা করেন, “ডিম যখন ভাজা, সেদ্ধ কিংবা স্ক্র্যাম্বল করে রান্না করা হয়, তখন উচ্চ তাপে এর প্রোটিনের জটিল গঠনটি ভেঙে যায়। এই ভাঙা প্রোটিন মানুষের পরিপাকতন্ত্র খুব সহজে এবং দ্রুত হজম বা শোষণ করতে পারে।”
অ্যাভিডিন ব্লকার দূর করা: মার্কিন পুষ্টিবিদ ভ্যাল ওয়ার্নার বলেন, “কাঁচা ডিমের সাদা অংশে ‘অ্যাভিডিন’ নামক একটি প্রোটিন থাকে যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ‘বায়োটিন’ (ভিটামিন বি৭) শোষণে সরাসরি বাধা দেয়।”
ডিম ভালোমতো রান্না করলে এই ক্ষতিকর বাধা দূর হয়ে যায়। তাই ডিম পোচ বা হাফ-বয়েল, যাই করা হোক না কেন, ডিমের সাদা অংশটি যেন কোনোভাবেই তরল বা কাঁচা না থাকে, তা শতভাগ শক্ত হওয়া জরুরি।
কুসুম বর্জনের ভুল ধারণা ও কোলেস্টেরল বিতর্ক
অনেকেই কেবল চর্বি বা কোলেস্টেরলের ভয়ে ডিমের কুসুম ফেলে শুধু সাদা অংশ খান। পুষ্টিবিদদের মতে, এটি ভুল সিদ্ধান্ত।
কুসুমের পুষ্টিগুণ: ডিমের কুসুমের ভেতরেই ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’, ‘ই’, ‘বি১২’, ‘সেলেনিয়াম’ এবং ‘কোলিন’ নামক জরুরি একটি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে, যা শরীরের প্রতিটি কোষের সুরক্ষায় এবং মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ সচল রাখতে কাজ করে।
কুসুমে ‘লুটেইন’ নামক শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা বার্ধক্যে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া রোধ করে।
কোলেস্টেরলের সত্যতা: ডা. ডিলোরেনজো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টিগ্রেটেড নিউট্রিশন’ সংস্থার পুষ্টিবিদ ভ্যানেসা ইমুস স্পষ্ট করেন যে, ডিমের প্রাকৃতিক কোলেস্টেরল, রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়ায় না, বরং খাবারে থাকা অতিরিক্ত স্যাচুরেইটেড ফ্যাট বা ডালডা এটি বাড়ায়।
তাই সুস্থ মানুষের জন্য কুসুমসহ দিনে ১ থেকে ২টা ডিম খাওয়া নিরাপদ।
তবে যাদের ইতিমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ রয়েছে, কুসুমে ১.৬ গ্রাম স্যাচুরেইটেড ফ্যাট থাকায় তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিমিত হওয়া উপকারী।
প্রোটিনের মাত্রা দ্বিগুণ করার ৩ উপায়
ডিমকে আরও বেশি প্রোটিন সমৃদ্ধ ও দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার মতো খাবারে রূপান্তর করতে পুষ্টিবিদেরা ৩টি পন্থার কথা উল্লেখ করেন।
টক দই বা পনির মেশানো: ডিম সেদ্ধ করে তার কুসুমের সঙ্গে সামান্য টক দই, গোলমরিচের গুঁড়া এবং লেবুর রস মিশিয়ে পুনরায় ডিমের ওপর ‘স্টাফিং’ করে খেলে প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়।
সবজি ও ওটসের অমলেট: ডিম স্ক্র্যাম্বল বা ওমলেট করার সময় পালংশাক, পেঁয়াজ, মিষ্টি আলু এবং ক্যাপসিকাম কুচি যোগ করলে প্রোটিনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আঁশও নিশ্চিত হয়।
চর্বিহীন মাংস বা ডাল: সকালের নাস্তায় ডিমের সঙ্গে সামান্য সেদ্ধ ডাল বা চর্বিহীন মুরগির বুকের মাংসের টুকরা রাখলে, তা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের কথা
ডিম হল প্রকৃতির সাশ্রয়ী, বহুমুখী এবং সহজে বহনযোগ্য একটি ‘সুপারফুড’।
তাই কোনো ভুল ‘ডায়েট প্ল্যান’ বা চটকদার ‘ফিটনেস মিথ’-এর ফাঁদে পড়ে কুসুম বর্জন বা কাঁচা ডিম পানের মতো অবৈজ্ঞানিক অভ্যাস ত্যাগ করে, সম্পূর্ণ সেদ্ধ বা ভাজা ডিম খাওয়া সুস্থ জীবনের জন্য উপকারী হবে।
আরও পড়ুন
