হাঁটাহাঁটি করার সময় হঠাৎ পায়ে তীব্র ব্যথা হওয়ার তিন কারণ
হাঁটার সময় ব্যথা শুরু হলে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ এটা হতে পারে জটিল রোগের লক্ষণ।
শরীরকে সচল ও রোগমুক্ত রাখতে নিয়মিত হাঁটার বিকল্প নেই।
তবে অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত অবস্থায় হাঁটা শুরু করার পর, গতি বাড়ালে বা কিছুক্ষণ চলার পরই পায়ে তীব্র ব্যথা, টান বা আড়ষ্টতা অনুভব করছেন; ফলে হাঁটা থামিয়ে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।
চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক সাময়িকী ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এর অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাতের ব্যথা বা পেশির টান থাকলে সাধারণত হাঁটার আগে থেকেই পায়ে ব্যথা থাকে। তবে হাঁটা শুরু করার পর নতুন করে তীব্র ব্যথা জাঁকিয়ে বসলে, সেটা পেশির কোনও সাধারণ সমস্যা নয়, বরং রক্ত সঞ্চালন বা স্নায়ুর কোনও গভীর সমস্যা হতে পারে।
‘হার্ভার্ড মেনস হেলথ ওয়াচ’-এর প্রাক্তন নির্বাহী সম্পাদক ও চিকিৎসা গবেষক ম্যাথিউ সোলান, এই ধরনের ব্যথার গতিপ্রকৃতি নিয়ে, হার্ভার্ডের চিকিৎসকদের মন্তব্য অনুসারে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁটার সময় পায়ে তীব্র ব্যথা হওয়ার প্রধান ৩টি কারণ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ বা পিএডি
হার্ভার্ড-অধিভুক্ত ‘ব্রিগ্যাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটাল’-এর রক্তনালী বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. মোহামাদ হুসাইন জানান, যখন পায়ের পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীগুলো চর্বি বা ‘প্লাক’ জমে সরু হয়ে যায়, তখন পেশি পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না।
ফলে হাঁটার সময় পায়ে তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং মন্থর বা স্থির হলে ব্যথা কমে যায়।
ডা. হুসাইনের মতে, “পায়ে রক্ত চলাচলের এই ব্লক ইঙ্গিত দেয় যে হৃদযন্ত্র বা মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত রক্তনালীতেও এমন ব্লক থাকতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়।”
এর চিকিৎসাগত সমাধান হল— ব্যথা হওয়ার পরও প্রতিদিন অল্প অল্প করে হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখা।
নিয়মিত হাঁটলে পায়ের ছোট ছোট রক্তনালীগুলো সক্রিয় হয় এবং ব্লকের চারপাশ দিয়ে বিকল্প রক্ত সঞ্চালনের প্রাকৃতিক চ্যানেল তৈরি করে পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি করে।
সায়াটিকা
মেরুদণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে নিতম্ব ও পায়ের নিচের অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত সায়াটিক স্নায়ু বা নার্ভে কোনও কারণে চাপ লাগলে বা প্রদাহ হলে তাকে সায়াটিকা বলা হয়।
এর প্রধান কারণ হল, মেরুদণ্ডের হাড়ের মধ্যবর্তী ‘ডিস্ক’ বা চাকতির স্থানচ্যুত হওয়া যাকে বলে ‘হার্নিয়েটেড ডিস্ক’।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অর্থোপেডিক সার্জারি ও মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. জেফরি এন. কাটজ এই বিষয়ে বলেন, “অনেকেই ব্যথার ভয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, যা রোগটিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সায়াটিকার তীব্রতা কমাতে এবং স্নায়ুর ওপর থেকে চাপ সরাতে স্টেশনারি সাইকেল চালানো, নিয়মিত পিঠের স্ট্রেচিং ব্যায়াম এবং উপযুক্ত যোগব্যায়াম করার মাধ্যমে মেরুদণ্ডের চারপাশের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করা কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।”
লাম্বার স্পাইনাল স্টেনোসিস
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের নিচের অংশের ‘লিগামেন্ট’ বা জোড়গুলোর ক্ষয়ের কারণে যখন ‘স্পাইনাল ক্যানাল’ বা মেরুদণ্ডের ভেতরের ফাঁপা অংশটি সংকুচিত হয়ে আসে, তখন ভেতরের স্নায়ুগুলোর ওপর তীব্র চাপ পড়ে।
এই সমস্যার প্রধান লক্ষণ হল, ব্যক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ভালো থাকলেও কেবল হাঁটতে গেলেই কোমর, নিতম্ব ও উরুর উপরিভাগে তীব্র আড়ষ্টতা ও ব্যথা শুরু হয়।
ডা. জেফরি কাটজের মতে, “এই ব্যথার রোগীরা একটু সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটলে বা বসার পর দ্রুত আরাম বোধ করেন। এই জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘কোর’ অর্থাৎ দেহের মধ্যবর্তী অংশের পেশি ও পায়ের শক্তি বজায় রাখার জন্য বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপি নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মৃদু ব্যায়াম করা বাধ্যতামূলক।”
