০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

গাড়ি চালানোর পর কোমর পিঠে ব্যথা, করা যাবে না হেলা

দীর্ঘসময় পথ পাড়ি দেওয়ার পর ঘাড়ে-কোমরে যে ব্যথাটা হয়, সেটা এড়িয়ে গেলে একসময় বড় সমস্যায় রূপ নেয়।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 May 2026, 04:35 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:38 PM

অফিসে যেতে প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালান। ফেরার পথেও ওই একই সময়। দিন শেষে ঘরে ঢুকে মনে হয় ঘাড়টা কেউ মুচড়ে দিয়েছে, কোমরে একটা চাপা ব্যথা থাকে সারাক্ষণ।

এই অনুভূতি কি চেনা লাগছে?

যারা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা গাড়ি চালান, তাদের মধ্যে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ আর কোমরের ব্যথা অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুতে হালকা লাগে, ভাবেন একটু ঘুমালেই সেরে যাবে। তবে দিনের পর দিন একই ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে থাকলে এই ব্যথা একসময় স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “সচেতনতা, সঠিক ভঙ্গি আর নিয়মিত ব্যায়াম— এই তিনটি জিনিসই পারে ঘাড় ও কোমর ব্যথা থেকে সুরক্ষা দিতে। আর ভালো খবর হল, এই অভ্যাসগুলো তৈরি করা খুব কঠিন কিছু নয়।”

 সিটটা ঠিকমতো ‘সেট’ করছেন তো

গাড়িতে উঠে বেশির ভাগ মানুষ সিট একবার ঠিক করে নেন, তারপর আর ভাবেন না। তবে এই একটা কাজই ঘাড় আর কোমরের ব্যথার বড় কারণ হতে পারে।

সিট খুব পেছনে হলে সামনে ঝুঁকে স্টিয়ারিং ধরতে হয়, কোমরে চাপ পড়ে। আবার খুব সামনে হলে হাঁটু ভাঁজ হয়ে পেশিতে টান লাগে।

সঠিক অবস্থান হল — মেরুদণ্ড সোজা থাকবে, হাঁটু সামান্য বাঁকা থাকবে এবং পা অনায়াসে প্যাডেলে পৌঁছাতে পারবে।

ডা. নয়ন পরামর্শ দেন, “কোমরের পেছনে একটা ছোট লাম্বার সাপোর্ট বা নরম কুশন রাখুন। সিটের যে জায়গাটায় পিঠ লাগে সেটা সমতল হলে কোমর ভাসমান থাকে, চাপ সামলাতে পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কুশনটুকু সেই ফাঁকটা পূরণ করে, কোমল সাপোর্ট দেয়।”

গাড়ি চালানোর সময় কোমর, কাঁধ ও হাতে ব্যথা হওয়ার সমস্যাকে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘রেপিটেটিভ ড্রাইভিং ইনজুরি’। ভুল বসার ভঙ্গি এবং একটানা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোই এই ব্যথার প্রধান কারণ।

এই ব্যথা থেকে দূরে থাকার কয়েকটি উপায় উল্লেখ করা হয় স্পেনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিবেরা হেল্থ গ্রুপ’য়ের ওয়েবসাইটে।

বসার সঠিক ভঙ্গি: সিটের একদম শেষ প্রান্তে নিতম্ব ঠেকিয়ে সোজা হয়ে বসতে হবে। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে সিটের ব্যাকরেস্টটি ১০০ থেকে ১১০ ডিগ্রি কোণে সামান্য হেলিয়ে রাখতে হবে, যা মেরুদণ্ডে ওপর চাপ কমায়।

লাম্বার সাপোর্ট: গাড়ির সিটে বিল্ট-ইন ‘লাম্বার সাপোর্ট’ বা কুশন না থাকলে কোমরের পেছনে একটি ছোট কুশন বা রোল করা তোয়ালে ব্যবহার করা উপকারী। এটি কোমরের প্রাকৃতিক বাঁক বজায় রাখে।

হাঁটু ও পায়ের অবস্থান: সিট এমন দূরত্বে আনতে হবে যেন পা দিয়ে প্যাডেল পুরোপুরি চাপার পরও হাঁটু ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি বাঁকা থাকে। হাঁটু কখনই একদম সোজা বা টানটান করা যাবে না।

কাঁধ ও হাতের চাপ কমাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরার নিয়ম: ঘড়ির ছোট ও বড় কাঁটা একসাথে যেভানে ৯টা ও ৩টার ঘরে থাকে, অর্থাৎ সোয়া নয়টা বাজলে যেমন হয় সেই অবস্থানে হাত রেখে স্টিয়ারিং হুইল ধরতে হবে। এতে হাতের কনুই সামান্য বাঁকা (প্রায় ১২০ ডিগ্রি) থাকবে এবং কাঁধ শিথিল থাকবে।

দূরত্ব বজায় রাখা: স্টিয়ারিং হুইল থেকে বুকের দূরত্ব অন্তত ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি হওয়া উচিত। বেশি দূরে হাত বাড়িয়ে স্টিয়ারিং ধরলে কাঁধ ও ঘাড়ের পেশিতে তীব্র টান পড়ে।

ঘাড় এবং মাথার অবস্থান বা হেডরেস্টের উচ্চতা: গাড়ির হেডরেস্টের ওপরের অংশটি মাথার ওপরের ভাগের সমান্তরালে রাখতে হবে। মাথা থেকে হেডরেস্টের দূরত্ব যেন ২.৭৫ ইঞ্চির (৭ সেমি) বেশি না হয়।

আয়না সমন্বয়: বসার ভঙ্গি ঠিক করার পর গাড়ির সব ‘লুকিং মিরর’ বা আয়না এমনভাবে সেট করতে হবে যেন শুধু চোখ ঘুরিয়েই সবকিছু দেখা যায়, বারবার ঘাড় বাঁকাতে না হয়।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

বিরতি: জনস হপকিন্স মেডিসিন-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটানা এক-দুই ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর অবশ্যই গাড়ি থামিয়ে অন্তত পাঁচ মিনিটের একটি ‘ব্রেক’ বা বিরতি নেওয়া উচিত। এসময় গাড়ি থেকে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করা, ঘাড় ও পিঠের হালকা স্ট্রেচিং করা উচিত।

পকেট খালি রাখা: গাড়ি চালানোর সময় পেছনের পকেটে মানিব্যাগ বা ভারী কোনো জিনিস রাখা যাবে না। এটি বসার ভারসাম্য নষ্ট করে এবং মেরুদণ্ডকে একদিকে বাঁকিয়ে দেয়, যা কোমর ব্যথার অন্যতম বড় কারণ।

পেশি শক্তিশালী করা: চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত ‘কোর মাসল’, মানে পেট ও পিঠের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করলে দীর্ঘসময় গাড়ি চালালেও সহজে ক্লান্তি বা ব্যথা আসে না।

সতর্কতা

ডা. নয়ন বলেন, “যদি এই নিয়মগুলো মানার পরও ব্যথা না কমে এবং ব্যথা কোমর থেকে পায়ের দিকে বা কাঁধ থেকে হাতের দিকে নামতে থাকে, তবে দ্রুত একজন ‘ফিজিওথেরাপি’ বিশেষজ্ঞ বা ‘নিউরো-স্পাইন’ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।”

আরও পড়ুন

প্রতিদিনের যে ভুলে বাড়ছে পায়ে ব্যথা

যেসব অভ্যাসে কমবে শরীরের ব্যথা

মাথায় নয়, মনের গভীরে লুকিয়ে আছে ব্যথার সমাধান