২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতিদিনের যে ভুলে বাড়ছে পায়ে ব্যথা

হাঁটলেই পা ব্যথা করে বলে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন। তবে কিছু অভ্যাস বদলালে অনেকটা মিটতে পারে সমস্যা।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 May 2026, 02:18 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:34 PM

অফিসে সারাদিন চেয়ারে বসে কাজ। বিকালে উঠে একটু হাঁটতে গেলেন। মিনিট বিশেক পর পায়ে ব্যথা শুরু। বাসায় ফিরে একটু শুয়ে পড়লেন, কমল। পরদিন আবার হাঁটতে গেলেন, আবার ব্যথা।

এই ছবিটা এখন খুব চেনা। পায়ে ব্যথা মানেই অনেকে ভাবেন বড় কোনো অসুখ, বা বয়সের ছাপ।

তবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলছেন, “অনেক ক্ষেত্রেই পায়ের ব্যথার পেছনে থাকে দৈনন্দিন কিছু ভুল অভ্যাস। যেগুলো বদলালে ব্যথা অনেকটাই কমে আসে।”

সারাদিন বসে থেকে হঠাৎ হাঁটতে বের হওয়া — এটাই সবচেয়ে বড় ভুল

অফিসে সাত-আট ঘণ্টা বসে থেকে বিকেলে হঠাৎ পার্কে গিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করেন? এটা পায়ে ব্যথার একটি কারণ হতে পারে।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ের পেশি শিথিল হয়ে যায়, রক্ত চলাচল কমে। হঠাৎ সেই পেশিকে কাজে লাগালে সে চাপ নিতে পারে না। পেশিতে টান পড়ে, গোড়ালিতে বা পায়ের পাতায় ব্যথা হয়।

“সমাধান সহজ- হাঁটার আগে পাঁচ মিনিট ‘ওয়ার্ম আপ’ করুন। ধীরে হাঁটুন, পা ঘোরান, হালকা স্ট্রেচ করুন। পেশি গরম হলে তারপর জোরে হাঁটুন। এই ছোট অভ্যাসটাই অনেক ব্যথা ঠেকিয়ে দেয়” বলেন এই চিকিৎসক।

সপ্তাহে একদিন অনেকটা হাঁটা— ভাবছেন ভালো করছেন, আসলে ক্ষতি হচ্ছে

‘সারা সপ্তাহ সময় পাইনি, আজকে অনেকটা হেঁটে আসি’- এই ভাবনাটা অনেকের আছে। তবে পায়ের পেশির জন্য এটা ভালো নয়।

“শরীর ধীরে ধীরে চাপে অভ্যস্ত হয়। হঠাৎ একদিনে বেশি হাঁটলে পেশি, লিগামেন্ট ও জয়েন্ট অপ্রস্তুত থাকে। প্লান্টার ফ্যাসাইটিস — পায়ের পাতার নিচে প্রদাহ — এই ধরনের অনিয়মিত অতিরিক্ত পরিশ্রমে বেশি হয়”- বলেন ডা. নয়ন।

প্রতিদিন অল্প হাঁটা, সপ্তাহে একদিন অনেক হাঁটার চেয়ে অনেক ভালো। দশ মিনিট করে প্রতিদিন হাঁটা যেতে পারে। এতে পায়ের পেশি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে, ব্যথাও কমবে।

বছরের পর বছর ধরা একই জুতা — এটাও পায়ের বড় শত্রু

জুতার কথা এলে অনেকে ভাবেন ছেঁড়াফাটা না হলে বদলানোর দরকার নেই। তবে জুতার ভেতরের কুশন আগেই শেষ হয়ে যায়।

চামড়াজাত পণ্য ও জুতা প্রতিষ্ঠান 'অরোরা'র স্বত্বাধিকারী আশরাফ উদ্দিন বলেন, “এক থেকে দুই বছর বেশি ব্যবহার করলে জুতার সোলের কুশনিং নষ্ট হয়। বাইরে থেকে দেখতে ঠিকঠাক লাগলেও ভেতরে সাপোর্ট থাকে না। তখন প্রতিটা কদমে পায়ের পাতা, গোড়ালি ও হাঁটুতে সরাসরি ধাক্কা লাগে।”

আরামদায়ক হাঁটার জুতা নিয়মিত বদলাতে হবে। পুরানো জুতায় ‘ইনসোল’ পাল্টেও কিছুটা সাহায্য হয়। তবে জুতাটাই খুব পুরানো হলে বদলানোই ভালো।

দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলেও পায়ে চাপ পড়ে

শুধু হাঁটা নয়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও পা ব্যথার কারণ হতে পারে। বাজারে, দোকানে, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রান্না করা বা কাজে দাঁড়িয়ে থাকা— এই সময়ে পায়ের পেশি ও হাড়ের জোড়ে একটানা চাপ পড়তে থাকে।

ডা. নয়ন পরামর্শ দেন, “মাঝে মাঝে বসুন, অন্তত কয়েক মিনিটের জন্য। দাঁড়ানো জায়গায় রাবারের ম্যাট ব্যবহার করলে শক্ত মাটি থেকে পায়ের কিছুটা সুরক্ষা হয়। এক পায়ে বেশিক্ষণ ভর না দিয়ে মাঝে মাঝে পা পরিবর্তন করুন।”

 ওজন বাড়লে পায়ে যে চাপ পড়ে — সেটার হিসাবটা জানলে চমকে যাবেন

শরীরের বাড়তি ওজন পায়ের ওপর সরাসরি চাপ ফেলে।

‘আর্থ্রাইটিস কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটি’র গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটার সময় হাঁটুতে শরীরের ওজনের তিন থেকে চার গুণ চাপ পড়ে।

মানে পাঁচ কেজি ওজন বাড়লে হাঁটার সময় হাঁটুতে ১৫ থেকে ২০ কেজি বাড়তি চাপ পড়ছে।

এই কারণেই ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ে ব্যথা বাড়ে। সায়াটিকা থেকে অস্টিওআর্থ্রাইটিস— পায়ের বেশিরভাগ সমস্যাই অতিরিক্ত ওজনে আরও খারাপ হয়।

তাই পায়ের ব্যথার চিকিৎসার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ওজন নিয়ন্ত্রণ।

বরফ সেঁক, স্ট্রেচিংয়ে অনেক ব্যথাই সামলানো যায়

পায়ে ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার ওষুধ না খেয়ে বরফ সেঁক দিন। পনেরো থেকে বিশ মিনিট, দিনে দুই থেকে তিনবার।

বরফ সরাসরি ত্বকে না লাগিয়ে কাপড়ে মুড়িয়ে দিন। এটা প্রদাহ কমায়, দ্রুত আরাম দেয়।

‘স্ট্রেচিং’ নিয়মিত করলে পেশি নমনীয় থাকে, ব্যথার প্রবণতা কমে। সকালে উঠে পায়ের পাতা ওপর-নিচ করুন, গোলাকারে ঘোরান। বিকেলে হাঁটার আগে ‘কাফ মাসলে’র স্ট্রেচ করুন।

দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় বা ব্যথা বেশি তীব্র হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ‘আলট্রাসাউন্ড’ থেরাপি বা শকওয়েভ থেরাপির মতো চিকিৎসাও আছে- জানান ডা. নয়ন।

ছোট ছোট অভ্যাস বদলালে বড় ব্যথা এড়ানো যায়

হাঁটলে পায়ে ব্যথা হওয়াটাকে ‘বয়স হয়েছে, এমনই হয়’ বলে মেনে নেওয়ার কারণ নেই।

‘ওয়ার্ম আপ’ করা, নিয়মিত হাঁটা, সঠিক জুতা পরা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, বরফ সেঁক আর স্ট্রেচিং— এই কয়েকটা অভ্যাস গড়তে পারলে পায়ের ব্যথা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন

পায়ের আঙুলে ব্যথা হওয়ার কারণ ও করণীয়

রাতে পা ব্যথা হওয়ার কারণ ও করণীয়

আরামদায়ক জুতা বেছে নেওয়ার পন্থা

পায়ে যে অনুভূতি হতে পারে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ