২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

জার্মান রাজনীতিতে অতিডান ও অতিবামের উত্থান: ইউরোপের জন্য কি সতর্কবার্তা?

এক অঞ্চলে অতিবাম আর অন্য অঞ্চলে অতিডানের এমন উত্থান কি জার্মানি ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে?

জার্মান রাজনীতিতে অতিডান ও অতিবামের উত্থান: ইউরোপের জন্য কি সতর্কবার্তা?

ডানপন্থি দল এএফডির দলীয় সম্মেলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড: ‘নাৎসি ছাড়া সবার জন্য উৎসব’। ছবি: রয়টার্স

মঞ্জুরে খোদা মঞ্জুরে খোদা

Published : 22 Sep 2026, 06:40 PM

Updated : 22 Sep 2026, 06:40 PM

বার্লিন নির্বাচন কি জার্মানির পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে যাওয়ার সংকেত? গত ২০ সেপ্টেম্বরের দুই রাজ্য নির্বাচন অন্তত সেই আলামতই দিচ্ছে। ভোটের ফল দেশটির রাজনীতিতে এমন বৈপরীত্যের উন্মোচন ঘটিয়েছে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রাজধানী বার্লিনে বামপন্থি ‘ডি লিঙ্কে’ সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়াতে ‘অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড’ (এএফডি) সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ একই দিনে জার্মানির এক অঞ্চলে বাম, অন্য অঞ্চলে ডানদের উত্থান প্রচলিত রাজনৈতিক ধারাকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে।

জার্মানির সাধারণ ভোটাররা দেশের ঐতিহ্যবাহী মূলধারার দলগুলোর প্রতি চরম আস্থার সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে জার্মানির ক্ষমতার কেন্দ্রে যে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি একে অপরের বিকল্প হিসেবে দেশ শাসন করে এসেছে—মধ্য-ডানপন্থি ‘ডি ইউনিয়ন’ অর্থাৎ সিডিইউ/সিএসইউ (ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন এবং তাদের বাভারিয়াভিত্তিক শরিক ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন) এবং কেন্দ্র-বামপন্থি এসপিডি (সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি)—জনগণ এখন তাদের ওপর থেকেই সবচেয়ে বেশি আস্থা হারিয়েছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতায় থাকা ব্যবসায়ীবান্ধব এফডিপি (ফ্রি ডেমোক্রেটিক পার্টি) ও পরিবেশবাদী গ্রিনস—কোনো ঐতিহ্যবাহী দলই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব সংকট মোকাবিলায় সফল হতে পারেনি।

অনিয়ন্ত্রিত বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, তীব্র আবাসনসংকট, ঢিলেঢালা সামাজিক নিরাপত্তা, অভিবাসন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো নিত্যদিনের মৌলিক সমস্যাগুলোতে এসব পুরোনো শাসকদল সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই পুঞ্জীভূত নাগরিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে মূলধারার দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে রাজনীতির চরম দুই মেরুর দিকে ভোটারদের ঝুঁকতে থাকার মধ্য দিয়ে।

Image

বার্লিনে এএফডিকে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করার পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন ডি লিঙ্কের প্রধান প্রার্থী, তুর্কি অভিবাসীর কন্যা এলিফ এরাল্প। ছবি: রয়টার্স

বার্লিনের নির্বাচনে ডি লিঙ্কে প্রায় ২৫.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে। দলটির প্রধান নির্বাচনি ইস্যু ছিল আবাসন। স্থানীয় জরিপে ৩৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, সাশ্রয়ী আবাসনের প্রশ্নে ডি লিঙ্কে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য দল।

ডি লিঙ্কেকে এতদিন পূর্ব বার্লিনের বয়স্ক মানুষের দল হিসেবে দেখা হতো। এবার সেই ধারণা বদলে গেছে। ২৫–৩৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পছন্দের ‘দ্বিতীয়’ ভোটটি ডি লিঙ্কেকে দিয়েছে; ১৬–২৪ বছর বয়সীদের মধ্যেও দলটি সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এখানেই বার্লিনের রাজনীতির বড় পরিবর্তন—যে ক্রয়ৎসবের্গ দীর্ঘদিন গ্রিন পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, এবার তারা ডি লিঙ্কের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে বার্লিনের পুরোনো রাজনৈতিক মানচিত্রও বদলে গেছে।

উত্তর-পূর্ব জার্মানির মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়াতে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে এএফডি প্রায় ৩৭–৩৮ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে; সিডিইউ-এর ফলও অত্যন্ত দুর্বল। প্রশ্ন হলো, কেন একই দেশে একদিকে তরুণ শহুরে ভোটাররা বামপন্থি ডি লিঙ্কের দিকে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের বড় একটি অংশ এএফডিকে সমর্থন করছে?

পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে আয়ের ব্যবধান অনেক কমলেও সম্পদের ব্যবধান এখনও বেশ বড়। ২০২৩ সালে পূর্ব জার্মানিতে পরিবারের গড় নিট সম্পদ ছিল প্রায় ১,২৫,৫০০ ইউরো, যেখানে পশ্চিমে তা ছিল প্রায় ২, ৫৭, ১০০ ইউরো। অর্থাৎ পূর্বাঞ্চলের গড় সম্পদ পশ্চিমের প্রায় অর্ধেক। তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনও পূর্বাঞ্চলের জনসংখ্যাগত সমস্যাকে বাড়িয়েছে।

ডি লিঙ্কের ক্ষেত্রে বার্লিনে আবাসন, বাড়িভাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় ইস্যু হয়েছে। অন্যদিকে এএফডির ক্ষেত্রে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, রাষ্ট্রের প্রতি অসন্তোষ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে দুই দলের উত্থানের মধ্যে একটি অভিন্নতা রয়েছে, আর তা হলো চলমান রাজনৈতিক কেন্দ্রের প্রতি অসন্তোষ।

বার্লিনে এসপিডির ভোট নেমে ১২ শতাংশে এসে ঠেকেছে। শ্রমিকদের মধ্যেও এসপিডি মাত্র ৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে, যেখানে এএফডি ৩০ শতাংশ এবং ডি লিঙ্কে ২৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এটি জার্মানির পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। একসময় ‘শ্রমিক মানেই এসপিডি’—এই রাজনৈতিক সমীকরণ এখন আর আগের মতো কাজ করছে না। পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যে দুর্বল হয়ে পড়ছে, এর মাধ্যমে তা স্পষ্ট।

একসময় মনে করা হতো, বার্লিনের ক্রয়ৎসবের্গ গ্রিনদের ঘাঁটি, ডি লিঙ্কে মূলত বয়স্ক পূর্ব বার্লিনবাসীর দল, এসপিডি শ্রমিকদের ঠিকানা, আর বার্লিনের রাজনৈতিক বিভাজন মূলত পূর্ব ও পশ্চিমের। কিন্তু নির্বাচনের এই ফল সেই সব ধারণা পাল্টে দিয়েছে।

জার্মান রাজনীতি এখন আর শুধু সিডিইউ/সিএসইউ, এসপিডি ও গ্রিন পার্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের একাংশ সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বাম দিকে যাচ্ছে, অন্য অংশ অভিবাসন, পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে ডান দিকে যাচ্ছে। তার মানে কি দেশটি এখন ‘চরম প্রগতিশীল বনাম চরম রক্ষণশীল’—এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে? এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কারণ জার্মান ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো বিভিন্ন মধ্যপন্থি দলের সমর্থক।

মানুষ কি সস্তায় বাড়ি পাচ্ছে? জীবনযাত্রার ব্যয় কি কমছে? অর্থনীতি কি নিরাপত্তা দিচ্ছে? অভিবাসন কীভাবে পরিচালিত হবে? পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্য কীভাবে কমবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কীভাবে ফিরবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি মূলধারার দলগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে দিতে না পারে, তাহলে বাম ও ডান—এই দুই প্রান্তের দলই আরও শক্তিশালী হবে।

সুতরাং বার্লিনের নির্বাচন শুধু ডি লিঙ্কের বিজয় নয়, আর মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়া শুধু এএফডির সাফল্যও নয়। নতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোনো দলগুলো নিজেদের বদলাতে ও তাল মেলাতে পারবে কিনা, তার ওপর নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ।

জার্মানির রাজ্য নির্বাচনে ডানপন্থার এই জয় ইউরোপের জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা? জার্মানি ইউরোপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি। তাই জার্মানির রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না; এর প্রভাব ইউরোপের অভিবাসননীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতেও পড়তে পারে।

Image

স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের পর এএফডির প্রধান প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ট। ছবি: রয়টার্স

এএফডির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জার্মান পররাষ্ট্রনীতির অসঙ্গতি স্পষ্ট। এএফডি জার্মানির নেটো ও ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে। তারা ইউক্রেইনকে সহায়তা বন্ধ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও তাদের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য পুনরায় চালুর পক্ষে।

এএফডির রাজনৈতিক প্রভাব যদি আরও বাড়ে এবং ভবিষ্যতে তারা জাতীয় সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে ইউক্রেইন নীতি, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে জার্মানির অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এটি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বর্তমান বাস্তবতা নয়। রাজ্য নির্বাচনের পরও এএফডি সরকার গঠনের অবস্থানে নেই, কেননা অন্যান্য দল এখনো তাদের সঙ্গে জোটে যেতে আগ্রহী নয়।

এএফডির প্রধান রাজনৈতিক বিষয় হলো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার এবং জাতীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে কঠোর নীতি। নির্বাচনে অভিবাসন ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—জার্মানি কি ইউরোপের অভিন্ন অভিবাসননীতি থেকে সরে যাবে? সেটা হলে অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে থাকা ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া ও অন্যান্য দেশের ডানপন্থি দলগুলোর সঙ্গে এদের সমন্বয় আরও বাড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি শুধু এএফডির বিষয় নয়। বার্লিনে ডি লিঙ্কে ও মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নে এএফডির জয় এ কথাই বলছে যে, জার্মানির রাজনৈতিক মেরুকরণ দুই বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছে। মূলধারার সিডিইউ ও এসপিডি উভয় দলই প্রবল চাপের মধ্যে পড়েছে।

জার্মানির মূল রাজনৈতিক দল সিডিইউ, এসপিডি ও গ্রিন পার্টি—তারা সবাই এএফডির সঙ্গে সরকার গঠনে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে এএফডি ভোটে প্রথম হলেও সরকার গঠন করতে পারছে না। মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নেও অন্যান্য দল এএফডির সঙ্গে জোট করবে না। ফলে জার্মান রাজনীতিতে ত্রিদলীয় জটিল জোট হতে পারে। এর ফলশ্রুতিতে জার্মানির রাজনৈতিক কাঠামো অতিডান ও অতিবামের চাপে দুর্বল ও খণ্ডিত হয়ে পড়তে পারে।

মূল সংকটটি আসলে ইউরোপের তিনটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেগুলো একসঙ্গে ঘটছে—অর্থনৈতিক অসন্তোষ, অভিবাসন ও পরিচয়-রাজনীতি, এবং প্রচলিত দলগুলোর প্রতি অনাস্থা। এই প্রবণতাগুলো ইউরোপের জন্য উদ্বেগের; তা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com